• বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮
  • ||

ঝড়ে পড়া শিশুদের শিক্ষালয় শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়

প্রকাশ:  ২৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:২৬
গাইবান্ধা প্রতিনিধি

ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের খোঁজে ছুটা। শিশু হলেও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে দিনের বেশির ভাগ সময়টা তাদের ব্যয় হয় কোন না কোন আয় মূলক কাজ করে। কেউ ওয়েল্ডিং কারখানায়, কেউ চা দোকানি, কেউ অন্যের বাড়ির গৃহকর্মী, কেউ পান দোকানী, কেউ বুট-বাদাম ওয়ালা। সারাদিনে যা জোটে তাই দিয়ে বাবা-মায়ের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তাদের। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি অদম্য স্পৃহা সারাদিন কাজের পরও তাদের কাছে গুরুত্বের। তাই প্রতিদিন বিকেলে বই খাতা নিয়ে স্কুলে আসা। অন্য শিশুরা যখন স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরে। তখনই কিছু শিশু পরিবারের প্রয়োজনের কাজ সেরে প্রবেশ করে স্কুলের গন্ডিতে। কেউ তাদের জোর করে নয় বরং নিজের ইচ্ছায় তারা সময় মতো স্কুলে আসে। ঝড়েপড়া শিশুদের জন্য এমনি একটি শিক্ষালয় গাইবান্ধার শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়।

গাইবান্ধা শহরের সরকার পাড়ায় ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ স্কুলের প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যন্ত ৫টি শ্রেণিতে বর্তমানে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১২৪ জন। যার মধ্যে মেয়ে শিশু ৬৬ জন। তাদের পড়ানোর জন্য রয়েছেন ৪জন শিক্ষক।

সম্পর্কিত খবর

    বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইনুল ইসলাম জানান, সমাজের ঝড়েপড়া শিশুদের শিক্ষার স্বাভাবিক স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকটি কক্ষ নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সরকারি স্কুল বিকেলে ছুটির পর শুরু করা হয় শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি স্কুলের মতো উপবৃত্তি পায়। পাশাপাশি দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও রয়েছে। বৃত্তির পরিমাণ প্রতিমাসে ৭০০ টাকা করে। একবার বৃত্তি পেলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দেওয়া হয় সে বৃত্তির টাকা। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুমা খাতুন জানান, শুরু থেকেই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশানুরূপ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বৃত্তি পেয়েছে ৩২ জন। এর মধ্যে চলতি বছরেই বৃত্তি পেয়েছে ৮ জন।

    বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পৌর পার্কে বাবার পান দোকানে সারাদিন কাজ করে এমন একজন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুজন জানায়, সারাদিন কাজ করার পর স্কুলোত আসিয়া নেকাপড়া (লেখাপড়া) শেকোম (শিখি)। ভালোয় নাগে। একন মুই (আমি) দোকানোত বসি হিসাব কোরবার পারোম (পারি)। পরবারো (পড়তে) পারোম। মুই নেকাও (লেখা) শিকচোম।

    চায়ের দোকানে কাজ করে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আসিফ জানায়, সংসারের অভাবের কারণে কাজ করা নাগে। পরিবারের সবাই কাজ করি সংসার চালাই। ইলেক্ট্রিক দোকানের কর্মচারী চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সজিব জানায়, মোর পরিবারের আর্তিক (আর্থিক) অবস্থা খুবই খারাপ। বাড়িত খাবার দিবার পারেনা। তাই ইলেক্ট্রি (ইলেক্ট্রিক) দোকানোত সারাদিন কাজ করি আর নেকাপড়া শিকি (শিখি)।

    এই স্কুলের সাবেক বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রী বর্তমানে শহরের আসাদুজ্জামান গার্লস হাইস্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মণিষা জানায়, বাবা নেশায় আক্রান্ত, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সংসারের সদস্য সংখ্যাও অনেক। তাই অতিকষ্টে মায়ের উপার্জনে তাদের সংসার চলে। মায়ের অসুস্থ্যতায় মাঝে মধ্যে তাকেও অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয়। অভিভাবক রবি বিশ্বাস জানান, তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। তার স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে। ফলে তার মেয়েও মায়ের সাথে অন্যের বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি শিশু কল্যাণ স্কুলে লেখাপড়া করে। উপবৃত্তিও পায়।

    বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরও জানান, নিজস্ব কোন জায়গা ও ভবন না থাকায় বিদ্যালয়টির কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি সরকারিভাবে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

    সারাদেশ

    অনুসন্ধান করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close