• শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২, ৫ ভাদ্র ১৪২৯
  • ||

ভেনামি চিংড়ি প্রকল্প স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাণিজ্যিক উৎপাদনের

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০২২, ২০:০৪
শেখ নাদীর শাহ্

‘বিশ্ব বাজার ধরতে বাগদার পাশে ভেনামি চাই, ভেনামির সমৃদ্ধি রপ্তানির প্রবৃদ্ধি’, শ্লোগানকে সামনে রেখে চরম সংকটের মুখে থাকা সম্ভাবনাময় চিংড়ি শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকিয়ে রাখতে বাগদার বিকল্প হিসেবে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ভেনামির পাইলট প্রকল্প।

মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং চাষ প্রবর্তনে ২য় বারের মত খুলনার পাইকগাছার লোনা পানি গবেষণা কেন্দ্রের ৬টি পুকুরে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হয়েছে। প্রকল্পের ধারাবাহিক সফলতা ফুটে উঠেছে শুক্রবার (৫ আগস্ট) ভেনামি চিংড়ি আহরণ-২২’এ। সফলতায় রীতিমত তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন, মৎস্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি ভেনামীর সাথে সংশ্লিষ্টরা।

আহরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মাহাবুবুল হক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বি.এফ.আর.আই’র মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল, পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম, বিএফএফইএ’র মিঃ হুমায়ূন কবির, পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের ইনচার্জ ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.লতিফুল ইসলাম, উপজেলা সিরিয়র মৎস্য কর্মকর্তা, এমইউসি ফুডস্’র কর্মকর্তাসহ অন্যান্যরা।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এর আগে পোনা অবমুক্তির মাধ্যমে শুরু পাইলট প্রকল্পের পুকুর সমূহে নমুনয়ন ও পরিদর্শনেও ফুটে উঠে ধারাবাহিক সফলতার চিত্র।

প্রকল্প সূত্রে জানাযায়, খুলনার পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্র বি.এফ.আর.আই’র ৬টি পুকুরে ২.৮ হেক্টর বা ৬.৯ একরের ২.৪ হেক্টও আয়তনের পুকুর সমূহে গড়ে তোলা হয়েছে এ পাইলট প্রকল্প। যেখানে পিএল মজুদ থেকে ১ বছর পর্যন্ত প্রকল্পের স্থায়ী কাল ধরা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, বহুবিধ সংকট ও প্রতিবন্ধকতায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে বিশ্ব বাজারে বর্তমানে প্রায় ৭২ শতাংশ ভেনামী চিংড়ির দখলে। বাকি ২৮ শতাংশ নিয়ে অন্যান্যদের সাথে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হয়। বাংলাদেশে ভেনামির বানিজ্যিক চাষ শুরু না হলেও কেবল পরীক্ষামূলক শুরু হয়েছে। বাগদা ও গলদার উৎপাদন খরচ ভেনামির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কম মূল্যের ভেনামির সাথে আমাদের প্রতি মূহুর্তে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এছাড়া ভেনামি চিংড়ির মূল্যেই লোকসান দিয়ে রপ্তানি করতে হয় বাগদা ও গলদা। দেশীয় প্রজাতির বাগদা ও গলদার উৎপাদন ক্রমশ নিম্নমুখি হওয়ায় রপ্তানির পরিমাণও নিম্নমুখি । চিংড়ি রপ্তানি শিল্পের প্রধান সমস্যা হলো কাঁচামালের স্বল্পতা। বর্তমান সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন একর প্রতি সর্বোচ্চ ১,৫০০ কেজি। অথচ ভেনামীর উৎপাদন একর প্রতি সর্বনিম্ন ৫,০০০ কেজি। সুতরাং ভেনামির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশের চিংড়ি উৎপাদন প্রায় ৫ গুণ বেশি হবে।

তাছাড়া বিশ্বে প্রতিমূহুর্তে ভেনামির উৎপাদন, চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র এশিয়াতে ২০১৯ সালে ভেনামি উৎপাদিত হয় ৩১,১২,১৭০ কেজি যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শূণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের চিংড়ি উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাতকৃত রপ্তাসিকারক কারখানার সংখ্যা বেশি। ফলে এ খাতের কারখানাসমূহ তাদেও সক্ষমতার ১২-১৫% এর বেশি কখনো ব্যবহার করতে পারেনি। কারখানাগুলোর কাঁচামালের সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে দেশীয় বাগদার পাশাপাশি অধিক উৎপাদনশীল ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই।

সূত্র জানায়, দেশের রপ্তানির স্বার্থে বিএফএফইএ-এর সদস্যভূক্ত প্রতিষ্ঠান এম.ইউ সি ফুডস্ লি: যশোর ২০-২১ অর্থবছরে বিএফআরআই’র লোনা পানি কেন্দ্র পাইকগাছায় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম পাইলট প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা পাইকগাছা লোনা পানি কেন্দ্রের নির্বাচিত পুকুরে ৩১ মার্চ ২১’ ভেনামীর পোনা অবমুক্ত ও ১ জুলাই ২১’ আহরণ (হারভেষ্ট) করা হয়। সেখানে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়, ৮,৬২০ কেজি। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে যা খুবই সন্তোষজনক। এরপর সর্বশেষ ৫ আগস্ট ২২’ আহরণ (হারভেষ্ট) হয়েছে যেখানে গত বারের তুলনায় উৎপাদন বেশি হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী রপ্তানিকারকদের দাবির মুখে সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর সর্ব প্রথম থাইল্যান্ড থেকে ভেনামি প্রজাতির চিংড়ির পোনা আমদানি করে খুলনাঞ্চলের আটটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমতি দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, এমইউসি ফুডস, ফাহিম সি ফুডস, গ্রোটেক অ্যাকোয়াকালচার লিমিটেড, রেডিয়েন্ট শ্রিম্প কালচার, আইয়ান শ্রিম্প কালচার, ইএফজি অ্যাকোয়া ফার্মিং, জেবিএস ফুড প্রডাক্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও প্রান্তি অ্যাকোয়া কালচার লিমিটেড। এছাড়াও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে সাতক্ষীরার দেবহাটার আলহেরা মৎস্য প্রকল্প, খুলনার রূপসার ফ্রেস ফুডস লিমিটেড, জেমিনি সি ফুডস লিমিটেড এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের নলতা আহসানিয়া ফিস লিমিটেড। তাদের অবকাঠামো সংস্কার হলে দ্রুত তাদেরকেও ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এছাড়াও কক্সবাজারের আরো চারটি প্রতিষ্ঠানকে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারাও খুব শীঘ্রই ভেনামির আবাদ শুরু করবে বলে বিএফএফইএ সূত্র জানায়।

এর আগে ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের সাথে আলোচনার পর গত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চ ফলনশীল ভেনামি জাতের চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষের অনুমতি দেয়া হয় কক্সবাজারের অ্যাগ্রি বিজনেস এবং সাতক্ষীরার এনজিও সুশীলনকে। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের অ্যাগ্রি বিজনেস ব্যর্থ হলেও সুশীলন প্রকল্প বাস্তবায়নে সাথে নেয় যশোর বিসিক শিল্পনগরীর এম ইউ সি ফুডসকে। ওই বছরের ৩১ মার্চ থাইল্যান্ড থেকে তারা ভেনামি চিংড়ির আট লাখ রেনু আমদানি করে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনস্থ লোনা পানি কেন্দ্রের চারটি পুকুরে অবমুক্ত করে এর পাইলট প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। শুরুটা আলোর মুখ দেখায় ২০-২১ অর্থ বছরের ১০ মে রাতে একই পদ্ধতিতে তারা আরো ১২ লাখ পোনা আমদানি করে পরীক্ষামূলক প্রকল্প অব্যাহত রাখে।

সর্বশেষ চলতি ২১-২২ অর্থ বছরে চিংড়ির নিয়মিত গ্রোথ এবং রোগবালাই অনুসন্ধানে নমুনা পরীক্ষায় মনে করা হয়, ভেনামীর রোগ প্রতিরোধ এবং জীবন ধারণ ক্ষমতা বাগদার তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোনা ছাড়ার পর থেকে সাত সপ্তাহ পর্যন্ত চিংড়িতে রোগবালাই সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ বিপজ্জনক সময় অতিক্রমের পুকুরের পরিবেশ, ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগবালাই প্রতিরোধব্যবস্থা পরিদর্শন এবং চিংড়ির ফিজিক্যাল গ্রোথ পরিমাপে নমুনা পরীক্ষা করেন একটি বিষেশজ্ঞ টিম। তাদের মতে, ভেনামির পোনা ছাড়ার পরের ৬৮ দিনে গ্রোথ ও ফার্টিলিটি রেট খুবই আশাব্যঞ্জক। প্রতিটির ওজন ৮ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। গড় ওজন পাওয়া গেছে ৮.৭৫ গ্রাম। ভেনামি চিংড়ির উৎপাদনকাল ১২০ দিন। প্রথম ৬০ দিনে এদের যে গ্রোথ হয়, পরবর্তী ৬০ দিনে তার তিন গুণেরও বেশি হয়। সে হিসেবে চিংড়ি আহরণকালে (হারভেষ্ট) প্রতিটির গড় ওজন পাওয়া যায় প্রায় ২৫ গ্রাম।

ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, কাঁচামাল হিসেবে চিংড়ির অভাবে মাছ কোম্পানিগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। দেশে উৎপাদিত চিংড়িতে যে কয়টি কোম্পানি চালু আছে সেগুলোর সক্ষমতা ও ধারণ ক্ষমতার মাত্র ১৮-২০ শতাংশ চাহিদা মিটছে। ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচও বেশি হচ্ছে। তবে ভেনামি চাষে আশার কথা হলো, প্রতি হেক্টরে যেখানে বাগদার উৎপাদন পাওয়া যায়, ৩০০০ থেকে ৪০০০ কেজি। সেখানে একই পদ্ধতিতে ভেনামির উৎপাদন হেক্টর প্রতি উৎপাদন ১০,০০০ কেজি থেকে ২০,০০০ কেজি পর্যন্ত সম্ভব। এক্ষত্রে প্রতি স্কয়ার মিটারে যেখানে বাগদার ১৫-২৫ টির বেশি পোনা অবমুক্ত করা যায়না,সেখানে ভেনামি প্রতি স্কয়ার মিটাওে ৪০-১৫০ টি পর্যন্ত অবমুক্ত করা যায়। তবে দেশেই ভেনামির এসপিএফ পোনা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলেও জানায় সূত্রগুলি।

চিংড়ি শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নানা সংকটে ক্রমশ উৎপাদন হ্রাস পাওয়া দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়ি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতার মুখে সুবিধা করতে পারছে। পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক বাজার চলে যাচ্ছে ভেনামি উৎপাদনকারী চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দখলে। অবস্থার উত্তরণে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে ভেনামি চাষের বিকল্প নেই।

এমন পরিস্থিতিতে প্রান্তিক পর্যায়ে ভেনামির বাণিজ্যিক উৎপাদনে দেশীয় চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঁচামালের চাহিদা পুষিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চিংড়ি শিল্পে ফিরে আসবে তার হারানো যৌবন। এমনটাই প্রত্যাশা চিংড়ি শিল্প সংশ্লিষ্টদের।

পূর্বপশ্চিম- এনই

ভেনামি,খুলনা,চিংড়ি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close