• শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
  • ||

এক শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে শিক্ষক ৩ জন

প্রকাশ:  ১৯ মে ২০২২, ১৯:৩০ | আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ১৯:৩৮
শেখ নাদীর শাহ্: খুলনা প্রতিনিধি

খুুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ময়নাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী মাত্র একজন। বিদ্যালয়টিতে নেই কচি-কাঁচার কলকাকলি। ক্লাস শেষে ঘন্টা বাজলেও শ্রেণিকক্ষে বিরাজ করে শুনশান নিরবতা। ছাত্র-ছাত্রীদের মতো স্কুলটিরও এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। টিনের চালেও ধরেছে মরিচা। উঁকির মুহুূর্ত গুনছে টিনের দৃশ্যমান ছিদ্রগুলো।

আর দশটি স্কুলের মতো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক চিত্র হওয়ার কথা ছিল, স্কুল শুরুর সময়ে অ্যাসেম্বলিতে বিভিন্ন শ্রেণির ভিন্ন ভিন্ন বয়সীদের সারি সারি দাঁড়ানো। এরপর জাতীয় সংগীত শেষে যার যার শ্রেণিকক্ষের গন্তব্য অনুসরণ। ক্লাস শুরুতে রোলকল। শুরু হবে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের পড়ার শব্দ, ক্লাশ শেষ ও ছুটির ঘন্টা বাজলেই বাড়ির গন্তব্যে শ্রেণিকক্ষ ছাড়ার চিরচেনা কলরব। অথচ ময়নাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

বিদ্যাপীঠটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক স্বপ্না রানী বলেন, সব আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি সকল সিস্টেম অনুসরণ করেই চলে তাদের স্কুলটি তবে, ভিন্নতা কেবল একজন মাত্র শিক্ষার্থীকে ঘিরে। তাকে নিয়েই একটি স্কুলের যত আয়োজন। দ্বিতীয় শ্রেণির এ ছাত্রকে শ্রেণিকক্ষে ছেড়ে দেননা তারা। পাশে বসিয়ে পরম মাতৃস্নেহে গড়ে তোলা হচ্ছে তাকে। যদিও একমাত্র শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলটিতে আলাদা একটি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির তিনটি বিষয়ের বাংলা, গণিত ও ইংরেজী আলাদা আলাদাভাবে পাঠদান করেন তারা।

তিনি বলেন, একটি স্কুলের জন্য একজন মাত্র ছাত্র। সার্বক্ষণিক নানা শূন্যতা গিলে খাচ্ছে আমাদের। মনের দিক থেকে সবকিছু স্বাভাবিক বলে মানতেও ইচ্ছা করেনা। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তিযোগ্য আরো চারজন শিশু রয়েছে। তবে জন্ম নিবন্ধন সনদপত্র না থাকায় স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি তাদের। ভর্তি না হলেও নিয়মিত স্কুলে আসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এ প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরুতে পাশের গ্রাম দুটি থেকে ইসলাম ধর্মালম্বী শিশুরাও আসতো ময়নাপুর স্কুলে। যদিও তখন শিক্ষার্থীদের মাঝে গম দেওয়ার প্রচলন ছিল। পরে বন্ধ হয়ে যায় গম বিতরণ প্রথা। এছাড়া অনেক পরিবার জীবিকার তাগিদে শিশু সন্তানসহ অন্যত্র চলে যাওয়া শিক্ষার্থী হ্রাসের জন্য দায়ী। স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের দিকে ক্যাচমেন্ট এলাকা ব্যবস্থা চালু হয়। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের কোনো অবস্থাতেই ভর্তির সুযোগ নেই।

তবে স্কুলটির এমন অবস্থার অন্তরালের রহস্য অনুসন্ধানে ফুটে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন কারণ। গত কয়েক বছর ধরে গ্রামটিতে শিশু জন্মহার মারাত্নকভাবে হ্রাস পাওয়ায় স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা কমার জন্য দায়ী।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৯১ সালে ময়নাপুর গ্রামের বাসিন্দা তাপস কুমার মলের দান করা ৩৭ শতক জমির ওপর স্কুলটি প্রতিষ্ঠা পায়। তখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনিই দায়িত্বরত ছিলেন। এরপর ২০১৩ সালে স্কুলটি সরকারীকরণ হয়। চারিদিকে পানি বেষ্ঠিত হাওড় এলাকায় খানিকটা দ্বীপাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত ময়নাপুর গ্রাম। সনাতন ধর্মালম্বীদের মাত্র ৪৬টি পরিবারের বসতি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রাম ময়নাপুর। এক সময় ৬০ জনের মত শিক্ষার্থী ছিল স্কুলটিতে, যাদের সবাই ক্রমশ চলে গেছে মাধ্যমিকে। এরপর গত ৪ বছরে গ্রামটিতে মাত্র পাঁচটি নতুন শিশুর জন্ম হয়েছে। যাদের কেউই এখনো স্কুলে ভর্তিযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এছাড়া গত কয়েক বছরে সেখানকার অন্তত ১৮টি পরিবার নানা কারণে পাড়ি জমিয়েছেন ভারতে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোতে জন্মহারও কম।

ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান বলেন, তার কর্মজীবনে এরকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিনি দ্বিতীয়টা দেখেননি। একজন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিরল।

তিনি আরও জানান, উপজেলার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত এলাকাটি সত্যিই দুর্গম। একটি রাস্তার মাধ্যম পার্শ্ববর্তী এলাকার সংযোগ তৈরী করা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এলাকাটি যশোরের কেশবপুরের সীমান্তবর্তী হওয়ায় তারা স্কুলটি বন্ধ করে সেখানকার কোনো স্কুলে শিক্ষকসহ শিক্ষার্থী সমন্বয়ের প্রস্তাবনা করেছেন। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে প্রক্রিয়া অনুযায়ী বাস্তবায়ন হবে।

স্কুলের জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার মল বলেন, স্কুলটি বন্ধ করে অন্যত্র সমন্বয় হলে পার্শ্ববর্তী কেশবপুরের সবচেয়ে নিকটবর্তী স্কুলটিরও ন্যুনতম দুরত্ব হবে ২ কিলোমিটার। যা ভবিষ্যতে স্থানীয়দের পড়ালেখায় অন্তরায় হয়ে দেখা দিতে পারে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএনএস/এনজে

এক শিক্ষার্থীর,বিদ্যালয়ে,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close