• বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

মারধরে না থেকেও 'প্রধান আসামি' নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান

প্রকাশ:  ২৫ নভেম্বর ২০২১, ২১:৪০
ধামরাই প্রতিনিধি

ঢাকার ধামরাইয়ে যুবককে হাত-পা বেঁধে মারধরের ঘটনাস্থলে না থেকেও প্রধান আসামি হয়ে কারান্তরিন হয়েছেন নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান।

সম্প্রতি ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানায়, যেসময় মারধরের ঘটনা ঘটছিলো তখন মুজিবুর রহমান ছিলেন গাওতারা-বনেরচর সড়ক মাপার কাজে। তার সঙ্গে থাকা ধামরাই থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. খাইরুল ইসলাম ও এলজিইডির সাব–অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার দুপুর ১ টার দিকে সূত্রাপুরে বহিস্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল গণির বিরোধপূর্ণ কথিত বন্ধ থাকা 'টর্চারসেল' খুলতে যান বালিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক আউয়াল হোসেনের ছোট ভাই ইসরাফিল হোসেনসহ ৪ জন। এসময় এলাকাবাসী তাদেরকে আটক করে। এক পর্যায়ে সেখানে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে ইসরাফিল হোসেন ও আরেকজনকে মারধর শুরু করে এলাকাবাসী। এসময় তাদেরকে রেখে বাকি দুইজন পাশের দুনিগ্রামে পালিয়ে গিয়ে খবর দেয় ইসরাফিলকে মারধর করা হচ্ছে। পরে ওই দুইজনকে উদ্ধারে দুনিগ্রামে মাইকিং করে সবাইকে সূত্রাপুরে আসার আহ্বান জানানো হয়। এ নিয়ে ভীতি ছড়ায় সূত্রাপুরে। পরে শান্তি কমিটির পক্ষে মাইকিং করা হয় সেখানেও। এরপরে সূত্রাপুরের স্থানীয়রাই ইসরাফিলকে উদ্ধার করে সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে ও পুলিশে খবর দেয়। এসময় পুলিশ এসে মারধরে যুক্ত কয়েকজনকে আটক করে।

ঘটনার দিন চেয়ারম্যান মুজিবুরের সঙ্গে ছিলেন তার ভাতিজা সিয়াম আহমেদ। তিনি বলেন, দুপুর ১টা ৪৫ এর দিকে গাওতারা-বনেরচর সড়ক মাপার কাজে থাকতে সূত্রাপুর শান্তি কমিটির সভাপতি মুজিবুর রহমান নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানকে ফোন করে জানান ওই এলাকায় ঝামেলা হচ্ছে, পুলিশ সবাইকে আটক করছে। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলের দিকে আসতে থাকলে রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখতে পেয়ে জানতে চান তাদেরকে কেন ধরা হয়েছে। পুলিশ কোন জবাব না দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যেতে থাকে। সঙ্গে আমরাও নিজেদের গাড়িতে থানায় যাই। সেখানে আমাদেরকে ওসি সাহেবের কক্ষে বসতে দেয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে চেয়ারম্যান সাহেবকে গারদে ঢোকানো হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে মামলা দিয়ে তাকেই প্রধান আসামি করা হয়।

ঘটনার সময় পাশেই দোকানে ছিলেন চিকিৎসক নজরুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুপুর ১টার দিকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে শান্তি কমিটির লোকজন ইসরাফিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ওই সময় চেয়ারম্যান মুজিবুর সেখানে ছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনি তো এই এলাকায়ই আসে নাই।

একই কথা বলেন স্থানীয় আনিসুর রহমানও। তিনি বলেন, মারধর করার সময় অনেকেই এসে বাঁধা দেয়। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে লোকজনকে আটক করে। কিন্তু চেয়ারম্যান তো তখন এই এলাকায় ছিলেন না।

দুপুর ১২টা থেকে ২টার আগ পর্যন্ত চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন ধামরাই থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. খাইরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঘটনায় সময় আমি, থানা আওয়ামী লীগের সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল বাসেদ, চেয়ারম্যান মজিবর রহমানসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী এলজিইডির সাব–অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে ছিলাম। আমরা গাঁওতারা ব্রিজ থেকে বাস্তা বাজার ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের কাজ পর্যবেক্ষণে গিয়েছিলাম। ওই সময় মজিবরের মুঠোফোনে একটি কল আসে। মজিবর তখন আমাদের জানান সূত্রাপুরে ঝামেলা হয়েছে, তাই তাঁকে যেতে হবে। পরে তিনি চলে যান।’

খাইরুল ইসলাম বলেন, 'থানায় গিয়ে মুজিবুর জানায় ইসরাফিলের সঙ্গে সুত্রাপুরের কয়েকজনের সমস্যা হয়েছে। ছেলেটাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সে বিষয়টা নিয়ে কি হবে সে বিষয়ে জানতে থানায় গিয়েছে। রাতে শুনি তাকে গারদে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে তাকে মামলার আসামিও করা হয়। অথচ সে মারধর ও ওই ছেলেকেও (ইসরাফিল) দেখেনি।

জানতে চাইলে ধামরাই উপজেলা এলজিইডির সাব–অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'চেয়ারম্যান মুজিবুর দুপুরের দিকে আমার সঙ্গে দেখা করে। পরে এমপি সাহেবের সঙ্গেও কথা বলিয়ে দেয়। ওখানে ছিলেনও তিনি। পরে আমাকে বলে চলে যান।'

মারধরের ঘটনাস্থলে চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ছিলেন কি না এমন প্রশ্নে মামলার বাদী ইসরাফিলের ভাই আব্দুল আউয়াল কোন উত্তর দেননি। তিনি বলেন, চেয়াম্যানের কারণেই মারা হয়েছে আমার ভাইকে।' চেয়ারম্যান মুজিবুর মেরেছেন কি না এমন প্রশ্নও এড়িয়ে যান তিনি। ইসরাফিলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, তার অবস্থা ভালো না। আজকে মনে হয় অন্য হাসপাতালে নিয়েছে। তবে তার ভাইকে কোন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে সেই হাসপাতালের নাম বলতে পারেননি ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সাবেক এই নেতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধামরাই থানার কাওয়ালী পাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) রাসেল মোল্লা বলেন, আমি তো তাকে ধরিনি। আমি অসুস্থ হাসপাতালে ভর্তি। এই বিষয়ে জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

মারধরের সময় চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না ও মারধরে অংশ নিয়েছেন কি না প্রশ্নে ধামরাই থানার কাওয়ালী পাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, 'তাকে ওই এলাকা থেকেই আটক করা হয়েছে। মারধরের ভিড়ে তো সবাই মারে না। আর পুরাটা তো আমি আপনাকে এভাবে বলতে পারবো না। আর আপনি ওসি স্যারের সাথে কথা বলেন।'

তবে এ বিষয়ে জানতে ধামরাই থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) ওয়াহিদ পারভেজকে কল দেয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ঘটনার দিন তিনি বলেছিলেন, ওই এলাকায় ঝামেলা হলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার (২২ নভেম্বর) উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের সুত্রাপুর এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে বালিয়া ইউনিয়নের পূর্বসূত্রাপুর এলাকার ইসরাফিল হোসেন (৩২) নামে এক যুবককে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়। পরে সেদিনই চেয়ারম্যানসহ ১১ জনকে আটক করা হয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এআই

ধামরাই
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close