• সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

স্কুল ছেড়ে কিভাবে থাকবো ভেবে পাচ্ছি না: সত্যজিৎ

প্রকাশ:  ১০ অক্টোবর ২০২১, ২১:৪৪
যশোর প্রতিনিধি

৩৫ বছর আগে ১৯৮৬ সালে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মনিরামপুরের সত্যজিৎ বিশ্বাস। চাকরির শুরুতে প্রতিজ্ঞা ছিল কোনোদিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকবেন না। কর্মস্থলে পৌঁছাবেন নির্ধারিত সময়ের আগে। সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছেন সত্যজিৎ। শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত একদিনের জন্যও তার প্রতিজ্ঞা ভাঙেনি।

গত শনিবার (৯ অক্টোবর) ছিল সত্যজিৎ বিশ্বাসের শেষ কর্মদিবস। রোববার (১০ অক্টোবর) দুপুরে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেয়। গুণী এই মানুষটির বিদায় নিয়ে কোনো অনাড়ম্বর আয়োজন চোখে পড়েনি। বিদায় অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি বিশেষ কোনো অতিথিকে। তবে বিদায় যেভাবে হোক তা নিয়ে কোনো দুঃখ নেই সত্যজিৎ বিশ্বাসের। স্কুলের শেষদিন পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পেরেছেন এটাই তার কাছে বড় অর্জন। এই খুশির পাশাপাশি বিষণ্ণতা ছুঁয়েছে সত্যজিৎ বিশ্বাসকে। আর স্কুলে যেতে পারবেন না। প্রিয় শিক্ষার্থীদের সাথে আর সময় দিতে পারবেন না এমনটি ভাবতে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন তিনি।

স্কুল ছেড়ে থাকতে কেমন লাগবে জানতে চাইলে সত্যজিৎ বিশ্বাস বলেন, ছাত্রজীবন কেটেছে বইখাতা নিয়ে। এরপর কর্মজীবনে পুরোটা সময় স্বপ্ন, সবছিল ছাত্রছাত্রীদের ঘিরে। এখন তাদের ছেড়ে থাকতে খারাপ লাগবে। কচিকাঁচা মুখগুলোর অভাববোধ হবে সবসময়। তিনি বলেন, ‘ওনারা আমাকে মাঝেমধ্যে স্কুলে যেতে বলেছেন। আগামী ২১ তারিখ স্কুল খোলবে। আমি যাব। স্কুল ছেড়ে কিভাবে থাকব ভেবে পাচ্ছি না।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘মনিরামপুরের হরিদাসকাটির কুচলিয়া গ্রামে আমার বাড়ি। উপজেলার অন্য এলাকা দূরের কথা গ্রামের মানুষও ঠিকভাবে আমাকে চেনেন না। কারো সাথে মিশতে পারব না। একাকী থাকতে হবে।’

এদিকে, প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ে চোখের পানি ঝরেছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া খাতুন বলে, ‘স্যার আমাদের গণিত পড়াতেন। কোনো কিছু না বুঝলে বারবার বুঝিয়ে দিতেন। আমাদের সন্তানের মতো দেখতেন। কোনো সময় আমাদের উপর রাগ করেননি। তাঁকে পেয়ে আমরা গর্বিত। সত্যজিৎ স্যার আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আমরা আর তাঁর ক্লাস করতে পারব না, এটা ভাবতেই চোখ ভিজে যাচ্ছে।’

ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা ও ব্যস্ততার কারণে বেশি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়ভাবে কয়েকজনকে নিয়ে সহকর্মী সত্যজিৎ বিশ্বাসকে বিদায় জানাতে হয়েছে।’

আরো পড়ুন: ৩৫ বছরে অনুপস্থিত ছিলেন না একদিনও, সেই সত্যজিৎ স্যার অবসরে

সত্যজিৎ বিশ্বাসের বাড়ি যশোরের মনিরাপুরের কুচলিয়া গ্রামে। ১৯৮৪ সালে বিএসসি পাস করার পর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৮৬ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাশের অভয়নগরের ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগদেন তিনি। এরপর থেকে নবম ও দশম শ্রেণির গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতেন। কর্মজীবনের শুরুতে এই মানুষটি সঠিক সময়ে নিয়মিত কর্মস্থলে হাজির হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। ভাবতেন তিনি প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষার্থীদের গণিত আর বিজ্ঞান পড়াবেন কে! সেই ভাবনা থেকে ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেননি। বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে স্কুলে হাজির হতে একদিনও দেরি হয়নি তাঁর। এমনকি বাবার মৃত্যু এবং বিয়েরদিনও তিনি স্কুলে হাজির হয়েছেন।

২০১৫ সালে একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান হিসেবে যোগ দেন তিনি। বেড়ে যায় ব্যস্ততা। তারপরও কোনোদিন ক্লাস নেওয়া ছেড়ে দেননি এই শিক্ষক। এই গুনের কারণে বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন সত্যজিৎ বিশ্বাস। দেশজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়েছে তার।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

যশোর,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close