• রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮
  • ||

ফেসবুকের কল্যাণে ৭০ বছর পর হারানো পরিবার ফিরে পেলেন বৃদ্ধ

প্রকাশ:  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:১১
রাজশাহী প্রতিনিধি

প্রায় সাত দশক। সময়টা কম নয়। অশীতিপর আবদুল কুদ্দুস মুন্সি ধরেই নিয়েছিলেন আর দেখা পাবেন না পরিবার-পরিজনের। জীবন সায়াহ্নে এসে এই যন্ত্রণা পোড়াচ্ছিল তাকে। কিন্তু সেই যন্ত্রণা ঘুচল তার। আগামীকাল শনিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) শতবর্ষী মা মঙ্গলেমা বিবির সঙ্গে দেখা করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বাড্ডা এলাকার গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে দীর্ঘদিন পর তিনি খুঁজে পেয়েছেন হারানো স্বজনদের। ১০ বছর বয়সে হারিয়ে যান আবদুল কুদ্দুস মুন্সি। তার ঠাঁই হয় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে। সেখানেই থিতু হয়েছেন তিনি। পেতেছেন সংসার।

সম্পর্কিত খবর

    ৩ ছেলে ও ৫ মেয়ের জনক হয়েছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। তিন ছেলের মধ্যে দুজনকে বিদেশেও পাঠিয়েছেন। এক কথায় স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি নিয়ে তার সংসার এখন চাঁদের হাট। কিন্তু বুকে চাপা ছিল স্বজন হারানোর বেদনা। সেই বেদনা এবার ঘুচল।

    বৃদ্ধ আবদুল কুদ্দুস মুন্সির স্বজনদের খুঁজে পাওয়া আকুতি ফেসবুকে পোস্ট করেন একই এলাকার বাসিন্দা আইয়ুব আলী। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার এই বৃদ্ধ আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে হারিয়ে গিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বারুইপাড়া মোড়ের চায়ের দোকানে বসে এই গল্প করছিলেন আবদুল কুদ্দুস মুন্সি। তিনি তার বাবার নাম কালু মুন্সি এবং মায়ের নাম মঙ্গলেমা বিবি বলতে পারেন। ঠিকানা জানাতে পারেননি পুরোটা। সেটিই ভিডিও করে গত ১২ এপ্রিল ফেসবুকে প্রকাশ করি। এরপর দেশ-বিদেশের বহু মানুষ সেটি শেয়ার করেন। এক কথায় সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। ফেসবুকের কল্যাণে স্বজনদের খুঁজে পান আবদুল কুদ্দুস মুন্সি।

    এদিকে ভাইরাল ভিডিওর সূত্র ধরে আবদুল কুদ্দুস মুন্সির ভাগনেসহ চার স্বজন গত ২১ সেপ্টেম্বর পৌঁছান বাগমারায়। আবদুল কুদ্দুস মুন্সির চাচাতো ভাইয়ের নাতি শফিকুল ইসলাম ছিলেন ওই দলে।

    তিনি জানান, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি একপর্যায়ে তার নজরে পড়ে। এরপর ভিডিওটি প্রকাশকারী আইয়ুব আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা আবদুল কুদ্দুস মুন্সির সন্ধান পান। এরপরই তারা বাগমারায় পৌঁছে যান। নানাকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। শনিবার মায়ের সঙ্গে দেখা হবে তার।

    এদিকে মায়ের সঙ্গে এরই মধ্যে ভিডিও কলে কথা বলেছেন আবদুল কুদ্দুস মুন্সি। ১১০ বছর বয়সী মঙ্গলেমা বিবি প্রথম দর্শনেই চিনতে পেরেছেন নাড়ি ছেঁড়া ধনকে। তিনিও চিনতে পেরেছেন মাকে।

    এতো বছর পরও মা তাকে কীভাবে চিনলেন- জানতে চাইলে আবদুল কুদ্দুস মুন্সি জানান, ভিডিও কলে কথা বলার সময় মা তাকে বলেন- তুই আমার হারিয়ে যাওয়া আবদুল কুদ্দুস। ছোট বেলায় তোর হাত কেটে গিয়েছিল। মায়ের মুখে এ কথা শুনে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন- কোন হাত কেটেছিল? মা জানান- বাম হাতের বুড়ো আঙুল। তখনই তিনি অবাক হয়ে যান। এতো বছর পর মাকে ফিরে পেয়ে আপ্লুত তিনি।

    হারিয়ে যাওয়ার সময় আবদুল কুদ্দুস মুন্সির বয়স ছিল আট-দশ বছর। সেদিনের কথাও দিব্যি মনে আছে তার। তিনি জানান, পুলিশের দারোগা চাচার সঙ্গে রাজশাহীর বাগমারা থানায় বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। সেখানে ছিলেন তিনদিন। থানায় বন্দি থাকতে তার ভালো লাগছিল না। কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যান। এরপর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান আত্রাই উপজেলার সিংসাড়া এলাকায়। তখন ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। পথ হারিয়ে ফেলেন তিনি। ওই সময় খৈমুন নামে এক বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়। ভিক্ষা করে ঘরে ফিরছিলেন তিনি।

    আবদুল কুদ্দুস মুন্সি বলেন, আমি তার বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি অসহায় ছিলেন। শেষে নিয়ে যান তার এলাকার সাদেকের বাড়িতে। নিঃসন্তান সাদেক আমাকে সন্তানের মতই আশ্রয় দেন। সেখানেই আমার শৈশব-কৈশোর কাটে। ১৫ বছর বয়সে চৌউড়বাড়ি এক আত্মীয়ের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন পালিত বাবা।

    কয়েক বছর পর ঝিকরা বারুইপাড়া এলাকার নিঃসন্তান সুন্দর বেগম ও তার বোন কপিজানের বাড়িতে ঠাঁয় হয় আমার। সুন্দর বেগম আমার নামে ১২ বিঘা জমিও লিখে দেন। সেখানেই কেটেছে যায় বাকি জীবন।

    স্বজনরা জানান, আবদুল কুদ্দুস মুন্সি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনরা সন্দেহ করেছিলেন- সম্পত্তির লোভে চাচা হয়তো তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এই অভিযোগ মাথায় নিয়ে তার চাচাও ঘটনার পর থেকে গ্রামে ফেরেননি। কিন্তু সাত দশক পর সেই সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণ হলো।

    পিপি/জেআর

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

    সারাদেশ

    অনুসন্ধান করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close