• শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

খাস জমির মালিকানা দাবি করে মামলা, আকসির নগরকে হয়রানি

প্রকাশ:  ২৮ আগস্ট ২০২১, ১৮:৩৯
সাভার প্রতিনিধি

ঢাকার ধামরাইয়ে আকসির নগর নামে একটি আবাসন কোম্পানির নামে থানায় একরাতে ৫ মামলা ও পরে আরেকদিনে আরও ৫ মামলার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তাড়াহুড়া করে দায়ের করা সব মামলায় আসামী করা হয়েছে ওই কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তাসহ মোট ১১ জনকে। প্রতিষ্ঠানটি জমি দখল চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাদীরা।

দুই মামলার জমির স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, 'মালিকানা দাবি করে দায়ের করা মামলার জমি আসলে বংশী নদীর সরকারি খাস জমি। সেই জমি আকসির নগর দখল করেছে এমন অভিযোগে মানববন্ধন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেছেন বাদীপক্ষ। তবে জমিটি আকসির নগর প্রকল্পের বাইরে প্রায় ১ মাইল দূরে।

গত ৪ আগস্ট ধামরাই থানায় আকসির নগর নামে ওই কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তাসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন ঢাকার ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের মাখুলিয়া গ্রামের বৃদ্ধা সামদাসী। আর একদিন পরেই (৫ আগস্ট) আরেকটি লিখিত অভিযোগ দেন তার ছেলে ভজন রায়। দুইটি ঘটনায়ই মামলা (নং- ৯ ও ১৪) রুজু করে ধামরাই থানা পুলিশ। এছাড়াও একই নদীর জমির মালিকানা দাবি করে মাখুলিয়া গ্রামের রহমত আলীর পুত্র হজরত আলী আরেকটি মামলা (নং-২৬) করেন কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

লিখিত অভিযোগে সামদাসী লিখেন, আমি ও আমার ছেলে ভজন রায় ওয়ারিশ সূত্রে ধামরাই থানাধীন গোয়ালদী (মাখুলিয়া) মৌজায় ৬০ শতাংশ জমি ভোগ দখল করে আসছি। কিন্তু আমরা নিরীহ, সংখ্যালঘু হওয়ায় আসামীরা আমাদের জমি দখল চেষ্টা করে।

তবে অভিযোগে তিনি জমির কোন তথ্য উল্লেখ করেননি তিনি। অভিযোগে উল্লেখিত মৌজার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, 'ধামরাই থানা এলাকায় গোয়ালদী নামে ওই মৌজায় কোন ব্যক্তি মালিকানা জমি নেই। সাভারের ওই মৌজার শেষ অংশ বংশী নদী। এরপরেই শুরু ধামরাই ভূমি এলাকা।'

অপরদিকে ভজন রায় লিখেন, ধামরাই থানাধীন গোয়ালদি (মাখুলিয়া) মৌজায় ওয়ারিশ সূত্রে ১, ২ ও ৩ নং দাগে ২৬৬ শতাংশ জমির মালিক হই আমি। সেখানেই ফসলাদি চাষ করে খেতাম আমি। কিন্তু আসামীরা আমার জমিতে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে দখলের চেষ্টা করে।

অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি ভূমি অফিস থেকে ওই জমির খতিয়ান, পর্চা ও আর এস ম্যাপ সহ সকল কাগজপত্র উত্তোলন করা হয়। গোয়ালদী মৌজার ১ নং খতিয়ানে ১,২,৩ নং দাগের জমির মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ডিপুটি কমিশনারের। জমির আর এস ম্যাপে দেখা মিলে একই তথ্যের। সেখানে ওই জমির মালিক ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের ডিপুটি কমিশনার।

গোয়ালদী মৌজার ১, ২ ও ৩ নং নামে যে জমি রয়েছে তা বংশী নদীর স্রোতের নিচে। এরমধ্যে ১ নং দাগটি মাখুলিয়া ঘাট সংলগ্ন নদীর জেগে থাকা পার। যেটি আকসির নগর প্রকল্পের মূল ফটক থেকে প্রায় ১ মাইল দূরে এবং জমিতে বালু ভরাটের কোন আলামত পাওয়া যায়নি।

'এছাড়া ৩ এবং ৯ নং আর এস খতিয়ানে বংশী নদী যা সাধারণের ব্যবহার্য নৌকা ইত্যাদি চলাচলের জন্য উল্লেখ করে একই দাগ নং রেকর্ডভুক্ত হওয়ার আগে রেকর্ডে সবশেষ মালিক ছিলেন আছিয়া খাতুন ও বেগম সুফিয়া খাতুন নামে দুই নারী। এই কাগজপত্রেও সামদাসী ও ভজনরায়ের দাবীকৃত মালিকানার সাথে কোন মিল নেই।'

জানা যায়, কৃষি কাজ করলেও ভজন রায় মূলত বদু ওরফে খাস বদুর কর্মী। সম্প্রতি আকসির নগরের কাছ থেকে বালু ব্যবসা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে দুই ধাপে দশ মামলায় পুরনো সেই জমির বিষয় নিয়ে মা ছেলেকে প্রভাবিত করে অভিযোগ দেয়ায় বদু ও সাইদুর গং। এর আগেও তাদের নির্দেশে কোম্পানির লোকদের জমিতে ঢুকতে না দিতে কর্মকর্তাদের ওপর দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালানোর ঘটনায় টোটা (দেশীয় অস্ত্র) দিয়ে হামলা চালায় ভজন রায়। সেসময় পাল্টা প্রতিরোধে ভজনের এক পা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই ভাঙ্গা পা'কে পূঁজি করেই ঘটনার প্রায় ৬ মাস পর তাকে আর তার মাকে দিয়ে মামলা দায়ের করানো হয়।

বড়কুশিয়ারা, বাড়ীগাঁও, সাছনা, সীতি, মাখুলিয়া ও মামুরা গ্রাম নিয়ে গঠিত উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসির হোসেন বলেন, খাস বদুর নেতৃত্বে ভজন রায়, সাইদুর, নজরুল, মনসুর ও পলানসহ আরও আটদশজনের একটি চিহ্নিত চাঁদাবাজচক্র আকসির নগর প্রকল্পের বালু ভরাটের কাজ নেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন যাবৎ চাপ প্রয়োগ করে আসছিল কিন্তু কোম্পানি স্থানীয় চারশত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি করে বালুর ব্যবসা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন সময় হামলা করে এবং এলাকার কিছু মানুষকে সাজিয়ে এনে কোম্পানির নামে মিথ্যা মামলা করাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন বলেন, বৃদ্ধা সাম দাসীর মিথ্যা অভিযোগ করার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তার ছেলে ভজন রায় খাস বদুকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন খাস জমি দখল করে মাটি বিক্রি করে। এ বিষয় কেউ কথা বললে ভজন রায় দলবল নিয়ে হামলা চালায়। প্রশাসনের কেউ আসলেই বৃদ্ধ মাকে দিয়ে কান্নাকাটির অভিনয় করিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়।

এ বিষয়ে প্রকল্প ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম সোহাগ বলেন, সরকারি বংশী নদীর জমি মালিকানা দেখিয়ে একসাথে তিনটি মামলা রজু হওয়ার হাস্যকর ঘটনায় আমরা বিস্মিত এবং হতবাক হয়েছি। ওই জমি আমাদের প্রকল্পের ১ কিলোমিটার দূরে। এমনকি সেখানে কোন বালুও ফেলা হয়নি। কিছু স্বার্থান্বেষী মহলকে বালু ব্যবসা না দেওয়ায় সিন্ডিকেট করে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার সাহেবকে ভুল বুঝিয়ে তড়িঘড়ি করে মামলাগুলো হয়েছে। সাজানো মিথ্যা অভিযোগের বিষয়ে আমরা তাকে জানিয়েছি। আশাকরি খুব শীঘ্রই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।

এদিকে নদীর পাড়ের ওই জমিতে কোন বালু ফেলা হয়নি তবে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে জানান বৃদ্ধা সাম দাসির ছেলে ভজন রায়। তিনি বলেন, আমার জমি নদীর পাড়েই। তারা এখনো জমিতে বালু ফেলে নাই। কিন্তু ওইটা দখলের ব্যবস্থা করে রাখছে।

জমিটি খাস কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা জানি ওইটা খাস জমি। আমরা তিন পুরুষ ধরে ওই জমি ভোগ করে আসছি।

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, 'মামলা যে কেউই করতে পারে, তার মানে সারকারি জমি তার হয়ে যাবে না। তবে জমির বিষয়টি আমি জানি না। রেকর্ড দেখে বলতে পারবো।'

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ সরদার বলেন, 'ওই বৃদ্ধাসহ বেশ কিছু লোকজন আমার কার্যালয়ে এসেছিল। তাদের কান্নাকাটি দেখলে আপনারও চোখে পানি আসবে। আর জমিটি ওই বৃদ্ধার কি না সেটি গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বললেও জানতে পাবেন। থানায় যে কেউই মামলা করতে পারেন। পুলিশের কাজ সেসব তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া। আমরা সেটাই করবো।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এআই

আকসির নগর,খাস জমি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close