• শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭
  • ||

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের দৌরাত্ম্য

‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন’

‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন। কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাবেন।’ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীকে কথাগুলো বলছিলেন এক দালাল।

প্রকাশ:  ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:৩৫
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

‘এখানে চিকিৎসা নাই, প্রাইভেট ক্লিনিকে চলেন। কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাবেন।’ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীকে কথাগুলো বলছিলেন এক দালাল।

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয় ও দালালের দৌরাত্ম‌্যে নাজেহাল রোগী ও স্বজনরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরকে নানা কৌশলে প্রাইভেট ক্লিনিকে বাগিয়ে নিচ্ছে দালালচক্র। অন্যদিকে ওয়ার্ডবয় ও নার্সদের দুর্ব‌্যবহারে অতিষ্ঠ রোগীরা।

সরেজমিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগ, স্বাস্থ কর্মকর্তার কক্ষ ও মূল গেটের সামনে দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জটলা। মাস্ক ও গ্লাভস পরে দাঁড়িয়ে থাকা দালালরা হাসপাতালে আসা রোগীদের বাগিয়ে নিচ্ছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে।

জরুরি বিভাগের ভেতরে দেখা গেছে ৪-৫ জন যুবককে। জরুরি বিভাগে রোগী ও স্বজনরা যাওয়া মাত্রই এই যুবকদের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। রোগীর স্বজনদের পেছনে ঘুরতে থাকেন তারা। তারা কী রোগ, কী করবে—তা জানার পরপরই সুযোগ বুঝে স্বজনদের বাগিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। স্বজনদের বলেন, ‘ক্লিনিকে ভালো চিকিৎসা হবে। স্যার ভালো করে দেখবেন। এখানে চিকিৎসা হয় না।’

শিশু সন্তানকে চিকিৎসার জন‌্য তাসলিমা নামের একজন নারী জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখেন ডাক্তার নেই। এসম দু’জন ব্যক্তি এসে রোগী সম্পর্কে জানার পর তাকে বারবার প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার রোগী নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আর রোগী অন‌্য হাসপাতালে ভর্তি করাতে ডাক্তারের জন‌্য ৪০০ ও নিজের জন‌্য ৫০ টাকা দাবি করেন। তবে, তাসলিমা এই দালালের কথায় রাজি হননি। এতে ক্ষেপে যান ওই দালাল। তিনি তাসলিমাকে আর জরুরি বিভাগের রিসিপশনেও যেতে দেননি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, রোগী ভর্তি করার পর পরীক্ষা ও অপারেশনের জন‌্য ড্রেসিং করতে প্রতিবার সিজার অপারেশন করালেই ওয়ার্ডবয়কে দিতে হয় টাকা। এক্ষেত্রে সিজার অপরেশন করালেই ২’শ থেকে ৫’শ দিতে হয়।

এই হাসপাতালের ১০০ মিটারের সামনেই রয়েছে ৪টি প্রাইভেট হাসপাতাল। তার ২০০ মিটার দূরেই রয়েছে আরো তিনটি হাসপাতাল। জরুরি বিভাগের সামনে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা না থাকা ও অভিযোগ পেলেও দালালের তৎপরতা বন্ধের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও বা হাসপাতাল থেকে অন‌্য ক্লিনিকে নিয়ে গেলেও তারা নির্বিকার থাকছেন। ‘ডাক্তারদের ম্যানেজ’ করেই দালালরা হাসপাতালে নিজেদের তৎপরতা চালান বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা চরবংশী ইউপির খাসেরহাট গ্রামের সোলায়মান বলেন, মারামারির ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়েছেন। কেবিনে ভর্তি আছি। ডাক্তার ঠিকমতো আসেন না। হাসপাতালের প্রায় সব বিভাগের সবার আচরণই খারাপ। কাউকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করে ঠিকমতো উত্তর পাওয়া যায় না। নার্সদের ব্যবহার আরও খারাপ। স্যালাইন বা ব্যাগের রক্ত শেষ হয়ে গেলে খুলে দিতে বা রোগীর প্রয়োজনে তাদের ডেকেও পাওয়া যায় না। আবার বার বার ডাকতে গেলে তারা দুর্ব্যবহার করেন।

নার্সদের সম্পর্কে একই কথা জানিয়েছেন চরপাতা ইউপির বোর্ডারবাজার এলাকার রোগীর স্বজন । তিনি বলেন, গত ৬ দিন আগে আমার স্ত্রীর সন্তান জন্মদানে সিজার অপারেশনের জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এক নার্সের সঙ্গে বহুবার বাকবিতণ্ডা হয়েছে। সেজন্য তাকে একসঙ্গে না লিখে হাসপাতাল গেইটের সামনের এক ফার্মেসি থেকে ৬ বার ওষুধ আনিয়ে হয়রানির স্বীকারও হতে হয়েছে।

পশ্চিম আলোনিয়া গ্রাম থেকে-আসা রোগীর স্বজন আলম বলেন, আমার বাবাকে গত ৬ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করি। ওয়ার্ডবয়দের প্রতিবার স্ট্রেচারের জন্য ওয়ার্ডবয়রা টাকা দাবি করেন। তারা টাকা ছাড়া স্ট্রেচারে হাত দেন না। আমার বাবাকে ড্রেসিং করানোর জন‌্য স্ট্রেচারের প্রয়োজন। এতে ওয়ার্ডবয় ২০০ টাকা দাবি করেন।

কেরোয়া ইউপির সামছুল আলম বলেন, আমার ভাই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসে অপারেশন করাতে হয়। প্রায় ১৫ দিন ভাইয়ের সঙ্গে হাসপাতালে আছি। ওয়ার্ডবয় ও নার্সদের জন‌্য পৃথক পৃথক টাকা দিয়েছি। এছাড়া, হায়দরগঞ্জ থেকে আসা রোগীর স্বজন ও সোনাপুর গ্রাম থেকে আসা রোগীর জন্য ওয়ার্ডবয়দের সম্পর্কে একই তথ্য দিয়েছেন।

দালালের দৌরাত্ম‌্য বিষয়ে ইউএনও সাবরীন চৌধুরী সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

রোগীর স্বজনের সঙ্গে নার্সের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ স্বীকার করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার জাকির হোসেন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটে। উপজেলা আইনশৃংখলা সভায়ও দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ইতোপূর্বে নার্সদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেন তারা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে ‍দুর্ব‌্যবহার না করেন। হাসপাতালের ভিতরে ওষুধ কোম্পানির লোকদের নিষেধ করা হয়েছে।-কিন্তু সেটি হচ্ছে না। শুধু সরকারি হাসপাতাল নয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও একই অবস্থা। এটা দুঃখজনক। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন আবদুল গাফ্ফার জানান, রায়পুরসহ জেলার সকল সরকারি হাসপাতাল থেকে দালাল নির্মূলে জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। রোগীদের সাথে ওয়ার্ডবয় ও নার্সরা অসৌজন্যমূলক আচরণ যেন না করতে পারে সে জন্য ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ৩ টাকার পরিবর্তে কেন ৫ টাকা নেয়া হচ্ছে সে বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। ওষুধ বিক্রয় কর্মীদের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

লক্ষ্মীপুর,রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close