• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

৪০ বছরেও চালুু হয়নি বাউল সম্রাটের নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত সংগীতালয়

প্রকাশ:  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:০২ | আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৪৫
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

‘সখি কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’, কিংবা ‘কোন মেস্তরী নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূর পঙ্খী নাও।’ এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের জনক বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। এ গুণী সাধক পুরুষের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। একুশে পদকপ্রাপ্ত শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত নানা নিদর্শন, স্মারক, পদক ও বিভিন্ন সম্মাননা সংরক্ষণের জন্য হয়েছে শাহ আব্দুল করিম জাদুঘর, হয়েছে সমাধিও। তবে তার নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয় ৪০ বছরেও চালুু করা যায়নি। বহু আশ্বাসের পরও এখনো হচ্ছে না কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজ। দ্রুত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সংগীতালয় চালু করার দাবি জানিয়েছেন বাউল ভক্তরা।

এদিকে বাউল সম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকীতে এবার নেই কোনো কর্মসূচি। তবে উদীচী দিরাই উপজেলা শাখার আয়োজনে ১২ সেপ্টেম্বর রাতে গানে গানে ফেসবুক লাইভে তাকে স্মরণ করা হবে। অনেকটা নীরবে কাটছে বাউল সম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকী।

প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেয়া এ বাউল সম্রাট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষকে আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতির কথা গানে গানে জানিয়ে গেছেন। নির্লোভ-নিরহংকার কিংবদন্তিতুল্য এ বাউল শিল্পী ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর সর্বস্তরে বিশেষ করে সাধারণের কাছে আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এ মরমী সাধক। শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তার অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে চলে যান ইহলোক থেকে। জীবদ্দশায় তিনি রচনা করেন আফতাব সংগীত, গণসংগীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে ও শাহ আব্দুল করিম রচনা সমগ্র নামে জনপ্রিয় সব গানের বই।

তার হাজারো কালজয়ী গানে যেমন আনন্দ, প্রেম ছিল, তেমনি ছিল দেশপ্রেম ও জীবন সংগ্রামের প্রেরণা। তিনি গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউলা গানে মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়, প্রেম, বিরহ, স্রষ্টার সৃষ্টি দর্শন নিয়ে গান গাইতে গাইতে পুরো ভাটি অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ভাটি অঞ্চল থেকে এ সময় চিনেছে বাংলাভাষী এপার ওপার দুই বাংলার মানুষ। এরপর তার গানে মুগ্ধ হয়ে বাউলরা তাকে বাউল সম্রাটের উপাধি দেন। তিনি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় গণসংগীত গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তি এক শিল্পী। বাংলা মাটির মমতায় তার বাণী ছিল পুষ্ট। তিনি দেশজ লোক সংস্কৃৃতি ও সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধ করেছেন। গেয়েছেন দেশপ্রেম, দেহতত্ত্ব, মারফতিসহ নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অসংখ্য গান। তিনি অসাম্প্রদায়িকতার গান গাওয়ার জন্য ধর্মান্ধদের হাতে নির্যাতিত ও ঘর ছাড়া হলেও কিংবদন্তিতুল্য মানুষটি অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান প্রচার করে গেছেন আমৃত্যু।

বাউল শিল্পী আশিক মিয়া বলেন, বাউল শিল্পীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে বসার জায়গা পান না। গান চর্চা করার জন্য নেই সংগীতালয়। বাউল শিল্পী ও ভক্তরা এবং তরুণ প্রজন্মের গান চর্চার জন্য শাহ আব্দুল করিমের হাতে প্রতিষ্ঠিত সংগীতালয়টি তিনি দ্রুত চালু করার দাবি জানান।

শাহ আব্দুল করিম পরিষদ দিরাই শাখার সভাপতি আপেল মাহমুদ বলেন, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্বপ্ন ছিল তার নিজের হাতে তৈরি করা সংগীতালয়ে বাউলরা গান চর্চা করবেন কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়ন হয়নি। শাহ আব্দুল করিমের জাদুঘর হয়েছে, সমাধিও হয়েছে। কিন্তু সংগীতালয়টি হয়নি। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাব, দ্রুত যেন সংগীতালয়টি চালু করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। তাহলে বাউলরা শাহ আব্দুল করিমের গানের ওপরে চর্চা ও গবেষণা করতে পারবেন এবং নতুন প্রজন্মও শাহ আব্দুল করিমকে জানতে পারবেন।

শাহ আব্দুল করিমের একমাত্র সন্তান শাহ নূর জালাল জানান, এবার করোনা পস্থিতিতির কারণে শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে কোনো কর্মসূচি নেই। তবে তার নিজ বসতভিটা উজানধলে শাহ আব্দুল করিমের বাড়িতে পারিবারিক পরিমণ্ডলে কিছু আয়োজন (মিলাদ-মাহফিল ও করিমগীতি পরিবেশনা) থাকছে সন্ধ্যায়। বাউল ভক্তসহ আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাবার (শাহ আব্দুল করিম) স্বপ্নের সংগীতালয় চালু করার দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

একাডেমিক কমপ্লেক্স ভবন নিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সংরক্ষণের অভাবে গুণী শিল্পীর প্রতিষ্ঠিত সংগীত বিদ্যালয় এখনো চালু না হওয়ায় শুদ্ধ ও অবিকৃত সুরে তার গানের চর্চা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাউল করিম ভক্তরা। দাবি উঠেছে দ্রুততম সময়ে কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে বাউল শাহ আব্দুল করিম কমপ্লেক্স তৈরির প্রকল্প প্রস্তুত করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, ‘গাড়ি চলে না চলে না, চলে না-রে গাড়ি চলে না, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান, ঘাঁটু গান গাইতাম’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি’, ‘কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা শাহ আব্দুল করিম শারীরিকভাবে না থাকলেও গানে আর সুরে তিনি আমাদের মাঝে অনন্তকাল থাকবেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

শাহ আব্দুল করিম,সুনামগঞ্জ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close