• বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

সন্ত্রাসীদের হাতে ব্যবসায়ীকে তুলে দিয়েছে পুলিশ, নিহতের পরিবারের দাবি 

প্রকাশ:  ১৫ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৬
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
স্থানীয় জনতা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে

রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলায় রবিউল বিশ্বাস নামে এক বিস্কুট ব্যবসায়ীকে পানিতে চুবিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোরে স্থানীয় মোনাই বিল থেকে তার মরদেহ উদ্ধারে গেলে পুলিশ সদস্যদের দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয়রা।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার মাজবাড়ি ইউনিয়নের বেতবাড়িয়া গ্রামে। রবিউল ছিলেন বেকারি ব্যবসায়ী। মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।

পরিবারের অভিযোগ, গভীর রাতে রবিউল বিশ্বাসকে পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেন কালুখালী থানার এসআই ফজলুল হক। পরে সকালে তার লাশ পাওয়া যায় বিলে। তবে রবিউলকে গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ পুলিশ অস্বীকার করেছে।

নিহতের বোন মাজবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য আমেনা বেগম জানান, তুচ্ছ একটি ঘটনায় রবিউলসহ চারজনের বিরুদ্ধে কালুখালী থানায় একটি মারামারির মামলা হয়। শুক্রবার রাত ২টার দিকে কালুখালী থানার এসআই ফজলুলসহ তিন পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে ঘরের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। তার ভাইয়ের স্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এরপর তার দুই ভাই রবিউল ও আকতারকে ধরে নিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেয়। আকতার পালিয়ে বাঁচলেও রবিউলকে হত্যা করা হয়। শনিবার সকালে বাড়ির কাছের একটি খালে তার ভাইয়ের লাশ পাওয়া যায়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের তিনটি শিশুসন্তান এতিম হয়ে গেল। ওদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।

নিহতের স্ত্রী জানান, রাত ২টার দিকে এলাকার তিন দুর্বৃত্ত- রফিক, ইলিয়াস ও রাকিব তাদের বাড়িতে যায়। এ সময় পুলিশও তাদের সঙ্গে ছিল। তার স্বামীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সকালে তার লাশ পান। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

এলাকাবাসী জানায়, রফিক, ইলিয়াস ও রাকিব মাদক কারবারে জড়িত। তারাই রবিউলকে হত্যা করেছে বলে তাদের মত।

রফিক, ইলিয়াস ও রাকিবসহ মাদক কারবারে জড়িত যুবকদের সঙ্গে ইউপি সদস্য ইউসুফ হোসেনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য ইউসুফ হোসেন বলেন, ওই এলাকা দুর্গম। এটি আমার বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। আমি এবার চেয়ারম্যান প্রার্থী। এ কারণে চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব কথা বলছে।

এদিকে শনিবার সকালে এসআই ফজলুলসহ তিন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। ওই সময় এলাকাবাসী ফজলুল ও স্থানীয় ইউসুফ মেম্বারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বিচার দাবি করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কালুখালী থানার ওসি কামরুল ইসলাম একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ তিন পুলিশ সদস্যকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। ব্যর্থ হয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খবর দিলে ১১টার দিকে রাজবাড়ী থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর লাঠিচার্জ করে তাদের তিন সহকর্মীকে মুক্ত করে।

এলাকাবাসী জানায়, সাম্প্রতিককালে মাজবাড়ি ইউনিয়ন এলাকায় মাদক ব্যবসা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। নিহত রবিউলসহ কয়েকজন মাদক ব্যবসায় বাধা দিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে অকালে প্রাণ হারাতে হলো।

কালুখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কাজী সাইফুল ইসলাম জানান, মাজবাড়ি ইউনিয়ন মাদকে ছেয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় লোকজন একদল মাদক কারবারিকে ধাওয়া করে। সন্ত্রাসীরা বিষয়টি ইউসুফ মেম্বারকে জানায়। এ বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার এলাকায় সালিশ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে ইউসুফ মেম্বার না আসায় সালিশ আর হয়নি। রাতে পুলিশ রবিউল, আক্তার ও বাবুল নামে তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়।

এসআই ফজলুল অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, শুক্রবার ইলিয়াস কালুখালী থানায় একটি মারামারি মামলা করেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বেতবাড়িয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে ওই মামলার আসামি বাবুলকে গ্রেপ্তার করে থানায় রেখে তিনি ঘুমাতে যান। তিনি রবিউলদের বাড়িতে যাননি।

ফজলুলের দাবি, ফজরের নামাজের পর ওসি ফোন করে জানান যে বেতবাড়িয়া গ্রামে ঝামেলা হয়েছে। এজন্য সেখানে জরুরি ভিত্তিতে যেতে বলেন। তারা সেখানে গেলে জানতে পারেন রবিউল পানিতে ডুবে মারা গেছেন। পরে লোকজন তার লাশ খুঁজে পায়।

কালুখালী থানা সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় জনগণ পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। লাশ নিয়ে আসতে গেলে বাধা দেয়। এ সময় থানার পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। যাদের মধ্যে এসআই ফজলুলও রয়েছেন।

কালুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে আমাদের চারজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছে। তারা বর্তমানে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তারপরও কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় আমরা সে ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুুতি চলছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, একটি মামলার আসামি হিসেবে রাতে কালুখালী থানার পুলিশ রবিউল ও তার ভাই আকতারকে গ্রেপ্তার করতে যায়। গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে ডোবায় থাকা নৌকায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। ওই সময় অপর একটি নৌকায় প্রতিপক্ষ ইলিয়াসসহ কয়েকজন ধর ধর বলে চিৎকার করে। তাদের ভয়ে আকতার নৌকা থেকে নেমে একটি গাছের নিচে পালায়। আর রবিউল পানিতে ঝাঁপ দেয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কারো শিখিয়ে দেওয়া কথা।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

রাজবাড়ী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close