• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

মেজর সিনহা হত্যা: দুই সাক্ষী চোখেও দেখেননি, কানেও শোনেননি

প্রকাশ:  ০৭ আগস্ট ২০২০, ২১:১৮ | আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ২১:২৪
নিজস্ব প্রতিবেদক

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনার পরপরই মামলা করে পুলিশ। সেই মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের দুইজন জানিয়েছেন তারা ঘটনা চোখেও দেখেননি, কানেও শোনেননি। অথচ ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। তাদের দাবি, এক প্রকার ভয়েই পুলিশের কথা মতো সাদা কাগজে সই করে সাক্ষী হয়েছেন। পুলিশের উল্লেখিত তিন সাক্ষীর মধ্যে দুজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এমন তথ্য।

পুলিশের দায়েরকৃত মামলার এজাহার মতে, মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনায় অস্ত্র ও ইয়াবার পৃথক যে দুইটি মামলা থানায় রেকর্ড হয়েছে সেখানে পুলিশ সদস্য ছাড়াও সাক্ষী করা হয়েছে স্থানীয় তিনজনকে। তারা হলেন টেকনাফের মারিশবুনিয়ার নুরুল আমিন, মো আইয়াস ও মোহাম্মদ হামিদ।

মামলার এক নম্বর সাক্ষী নুরুল আমিন সাংবাদিকদের বলেন, সিনহা হত্যাকাণ্ড নিজের চোখে কিছুই দেখেননি তিনি। পাশাপাশি শুনেছেনও অনেক পরে। যে সময় শুনেছেন ওই সময় সিনহার কোনো আলামতও ঘটনাস্থলে ছিল না।

আরেক সাক্ষী মারিশবুনিয়ার মো. আইয়াস সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে ডেকে নেয়া হয় আমিনসহ তাকে। পরের দিন সকালে টেকনাফ থানায় নিয়ে স্বাক্ষর করানো হয় সাদা কাগজে।

আইয়াস বলেন, আমি স্বেচ্ছায় সাক্ষী দিইনি। জোর করে অনেকগুলো কাগজে সই করাইছে পুলিশ। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। এটা তো টেকনাফ!

বিষয়টি নিয়ে চাপে আছেন পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা সাক্ষীরা।

তবে মেজর (অব.) সিনহা রাশেদের নিহতের ঘটনায় বর্তমান টেকনাফ থানার দায়িত্বে থাকা (পরিদর্শক তদন্ত) এবিএমএস দোহাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, সিনহা নিহতের ঘটনা নিয়ে পুলিশ ও তাদের পরিবারের দায়ের করা মামলা নিয়ে তদন্ত চলছে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও একটি উচ্চতর টিম তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সুতারাং সমস্ত অভিযোগ অনুযোগ শুনে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সঠিক ব্যবস্থা নেবেন।

আরো পড়ুন: ‘ওকে, স্যার’ বলেই গুলি, বুট দিয়ে সিনহার গলা চেপে ধরে লিয়াকত

প্রসঙ্গত, দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরো তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে বুধবার কক্সবাজারের আদালতে মোট ৯ পুলিশকে আসামি করে মামলা করেন তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতের নির্দেশে বুধবার রাতেই মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত হয়। এই হত্যা মামলায় বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।

মামলার পর ওইদিন বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই। এ মামলায় বৃহস্পতিবার টেকনাফ থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতসহ ৭ আসামির প্রত্যেককে র‌্যাব হেফাজতে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ২ আসামি এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এজাহারে সিনহার বোন অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন সিনহাকে। এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় যে এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর উপর পড়বে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মঙ্গলবার সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন।

আরো পড়ুন: ক্রসফায়ার ছিলো ওসি প্রদীপের নেশা, বদির সাথে ছিলো সখ্যতা

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

পুলিশ,কক্সবাজার,সেনাবাহিনী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close