• শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

আলোচনায় রুবেল-বরকতের প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকেরা

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১:২২
ফরিদপুর প্রতিনিধি

ফরিদপুরে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে দুই হাজার কোটি টাকা উপার্জন ও পাচারের ঘটনায় দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলায় একের পর এক গ্রেপ্তারে জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অনেক নেতা। ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের আরও ১৬ জন নেতা। আরও অনেকেই গ্রেপ্তাররে প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তবে সবকিছুর ওপরে জেলার সর্বত্র এবার তুমুল আলোচনা হচ্ছে বরকত-রুবেল গংদের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ে।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফরিদপুরে আর কাউকে সন্ত্রাসী ও অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড করতে দেয়া হবে না। কারও বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানা গেছে, সম্প্রতি পুলিশের চলমান অভিযানের শুরুতেই গত ৭ জুন রাতে ৭ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও তার ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। বরকত ছিলেন ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই তিনি শহর যুবলীগের সভাপতি হন। এছাড়া জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতিও হন। তারপরই শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পান।

বরকতের ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের সাংবাদিকতার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি হন এবং একটি পত্রিকার ডিক্লারেশনও নেন। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন রুবেল আর প্রকাশক হন বরকত। এছাড়া ফরিদপুরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও তারা কব্জায় নেন। বিরুধীমতকে দমন করতে তারা স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে চরমপন্থার একের পর এক জঘন্য নজির সৃষ্টি করেন তারা। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সন্ত্রাস, জমি দখল, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন তারা। এরপর একের পর এক বিভিন্ন সরকারি সংস্থা দখল করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও জমি দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। যাকে খুশি তাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করতেন। তাদের আক্রমণের শিকার হয়ে অনেকে শহর থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যান।

ফরিদপুরের বাইরেও খুলনা, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাগুরা, পটুয়াখালী, শেরপুর, সিলেট, গাজীপুর ও দিনাজপুরেও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ছিলো তাদের। গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় সিআইডি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা এসব জানিয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দিতে তারা তাদের অন্যান্য আরও অনেক সহযোগীর নামও বলেছেন। তাদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে।

ফরিদপুর জেলা পুলিশের সূত্র জানায়, এ প্রক্রিয়ায় মানি লন্ডারিং মামলায় সর্বশেষ ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম খন্দকার ওরফে লেভি, শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান ফারহান এবং জেলা শ্রমিক লীগের কোষাধ্যক্ষ বিল্লাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ঢাকায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের অভিযোগ, সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তার ভাই মোহতেসাম হোসেন বাবরের হাত ধরে রাজনীতিতে আসা রুবেল ও বরকত রাতারাতি ফরিদপুরের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন।

ফরিদপুরের জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি শামসুল হক ভোলা মাষ্টার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফরিদপুরের বিভিন্ন উন্নয়নে যেসকল কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেছেন তার সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হয়েছে।’

তার অভিযোগ, ‘এই লুটপাটে বরকত-রুবেলকে ব্যবহার করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর। এখন সবার সম্পদের হিসাব নিলেই মূল খবর বেরিয়ে আসবে।’

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন বলেন, ‘রুবেল-বরকতের জন্ম হঠাৎ করে হয়নি। আশ্রয়-মদদদাতাদের কারণে তাদের উত্থান হয়েছে। তাদের দাপটে আওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে ছিলো। সকলকেই আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে ক্ষমতা পেলেই কেউ যা খুশি তা-ই করতে না পারে।’

সৈয়দ মাসুদ হোসেন বলেন, ২০০৯ সালে খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী হওয়ার পর নাজমুল ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ২০১৭ সালের পর থেকে বরকত, রুবেলদের মতো নাজমুলও কেউকেটা হয়ে ওঠেন। শিক্ষাজীবনে স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করতে না পারলেও রাজনীতিতে তরতর করে ওপরে ওঠেন। প্রথমে ছিলেন ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। এরপর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন।

অভিযোগ আছে, জমি কেনা থেকে বাড়ি করা পর্যন্ত নাজমুলকে নজরানা দিতে হতো। সব উন্নয়নকাজের বখরা নিতেন তিনি। দ্রুতই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। শহরের মৈত্রী টাওয়ারে তাঁর রয়েছে তিনটি ফ্ল্যাট। খান টাওয়ারে নিজের নামে দুটি (৮ ও ৯ তলায়) ও ভাইয়ের মেয়ের নামে দুটি ফ্ল্যাট কেনেন। বিল মাহমুদপুর স্লুইসগেটের কাছে কিনেছেন ৬০ শতাংশ জমি। ঢাকায় আছে আরও তিনটি ফ্ল্যাট।

ঈদের দিনে গ্রেপ্তার হওয়া আরেকজন হলেন বিল্লাল হোসেন। সাংসদ মোশাররফ হোসেনের ভাই মোহতেসাম হোসেন ওরফে বাবরের ব্যক্তিগত কর্মচারী ছিলেন বিল্লাল। শুধু কর্মচারী হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। তিনিও স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।

শহরের লোকজন জানান, ২০০৮ সালের আগে মুলি বাঁশের বেড়া ও টিনের ঘরে বাস করতেন বিল্লাল। বাবরের মালিকানাধীন রাজ পোলট্রি ফার্মে চা-নাশতা আনার কাজ করতেন। পরে বাবরের আশীর্বাদে তিনি জেলা শ্রমিক লীগের অলিখিত অর্থ সম্পাদক হয়ে বসেন।

ফরিদপুর শহরতলির হাড়োকান্দি এলাকার এক বাসিন্দা জানান, আদালতের মালি শেখ ইসামুদ্দিনের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বিল্লাল বড়। সেই বিল্লাল নিজের বাড়ি করতে বিদেশ থেকে টাইলস নিয়ে আসেন।

ফরিদপুর সদরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের পাচ্চর এলাকায় ১২০ বিঘা জমির ওপর একটি ইটভাটা আছে তার। এই ভাটা দেখাশোনা করেন বিল্লালের ভায়রা বাবলু। চণ্ডীপুরে আরও একটি ইটভাটা ২৫ বিঘা জমির ওপর। এই ২৫ বিঘার মধ্যে ১০ বিঘা আছে খাসজমি। সেই জমি দখল করে তিনি ইটভাটা করেন। মুন্সিবাজার বাইপাস সড়কের পাশে তাঁর আড়াই একর জমি আছে। আর ভাটপাড়ার চকে রয়েছে ৩০ বিঘা জমি। এ ছাড়া হাবেলি রাজাপুর ও কৈজুরি মৌজায় দোপচক ও ভাঙ্গাচকে ১৫ বিঘা জমি রয়েছে বিল্লালের।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ফরিদপুর সদরের আজিজ পাইপের পাশে একটি পেট্রলপাম্প করার জন্য দেড় একর জায়গা কিনেছেন বিল্লাল, যদিও পেট্রলপাম্পটি এখনো হয়নি। অয়ন ডিলাক্স নামের একটি মিনিবাসের মালিকও তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি তিনটি।

ফরিদপুর জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ হোসেন জানান, বিল্লাল জেলা শ্রমিক লীগের কোষাধ্যক্ষ কখনোই ছিলেন না। তারপরও নিজেকে শ্রমিক লীগের কোষাধ্যক্ষ ও কোতোয়ালি আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিপুল ঘোষ বলেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি একটি গণমাধ্যমে কাজ করে এক সাংবাদিকের সম্পৃক্ততার কথা ওঠে এসেছে। পাশাপাশি বরকতের শ্বশুর ও তার শ্যালকদের চাঁদাবাজি ও জমি দখলের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।

ফরিদপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ বোস বলেন, দলের সুবিধাভোগীরাই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি নূর মোহাম্মদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শওকত আলী, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মনির হোসেনকে কুপিয়ে আহত করেছিলেন। তারা ফরিদপুর প্রেসক্লাবে একাধিকবারের সভাপতি ও ‘নাগরিক বার্তা’ পত্রিকার সম্পাদক কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী, প্রথম আলোর সাংবাদিক পান্না বালা এবং ফরিদপুর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. হালিমকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।

সব সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী মাসুদ।

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, দখলদারদের অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যার যার সম্পত্তি, তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। এছাড়াও যে সকল সম্পদ অবৈধ ভাবে উপার্জন করেছে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জমা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ফরিদপুর সদর আসনের সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন শহরসহ আশপাশের যে জায়গায় সভা-সমাবেশ করতেন, সেখানেই স্লোগান দিতেন আসিবুর রহমান ওরফে ফারহান। সেই পরিচয়ে শহর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ফারহানের বাবা শওকত মো. কামাল জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছিলেন। তার মা মমতাজ বেগম জেলা জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য। সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশোনার সুবাদে আসিবুর কলেজের ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এটা করতে গিয়ে একটি বাহিনীও গড়ে তোলেন। এই বাহিনীর সদস্যরা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্ম করতেন।

পুলিশ জানায়, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী এলাকায় সোনালী ব্যাংকের কাছে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মারা যান ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নার্স। এ ঘটনার সঙ্গে ফারহান বাহিনীর জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশিত হলে তিনি আত্মগোপন করেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, আসিবুরের নামে ঢাকার মিরপুরে এক ভবনেই চারটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুর শহরতলির বিল মাহমুদপুর এলাকায় দুই স্থানে ১০৪ শতাংশ ও ৬৫ শতাংশ জমি রয়েছে। শহরের হিতৈষী স্কুলের সামনে ‘রেইন ফরেস্ট’ নামের একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁ রয়েছে। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার দক্ষিণে পৌরসভার জায়গা ইজারা নিয়ে দোতলা বাড়ি করেছেন তিনি।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ফরিদপুর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close