• বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

হাসপাতালে নবজাতক রেখে বাবা-মা উধাও, দায়িত্ব নিলেন পুলিশ কর্মকর্তা

প্রকাশ:  ১৩ জুলাই ২০২০, ১৩:১২
কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লা নগরীর বেসরকারি একটি হাসপাতালের এনআইসিইউতে নবজাতককে ভর্তি করে উধাও হয়ে গেছেন বাবা। লক্ষাধিক টাকা বিল পরিশোধের ভয়ে এ হাসপাতালে নবজাতক মেয়ে সন্তানকে দেখতে আসেননি শিশুটির বাবা-মাসহ স্বজনদের কেউ। হাসপাতালে না এলেও টাকার জন্য বিভিন্ন জনের কাছে ছুটে গেছেন। কিন্তু কারো সাড়া মেলেনি। এতে অভিভাবকহীন এ শিশুটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে শিশুটির সার্বিক চিকিৎসা চালিয়ে যান চিকিৎসকরা।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়লে নজরে আসে পুলিশ সুপারের। এরপরই শিশুর সার্বিক ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেন তিনি। পুলিশ সুপারের মানবিকতার এমন খবরে রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির বাবা-মা ও স্বজনরা। সন্তানকে কাছে পেয়ে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। বিকেলে পুলিশ সুপার হাসপাতালে গিয়ে শিশুটির খোঁজ নেন।

গত ৫ জুলাই দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সদর উপজেলার আড়াইওরা গ্রামের হতদরিদ্র মিজানুর রহমানের স্ত্রী শিরীন আক্তার দুটি জমজ সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর একটি শিশু মারা যায় এবং অপর মেয়ে শিশুটির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসক শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু হতদরিদ্র ওই পরিবারটির ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার আর্থিক জোগান না থাকায় তাকে নগরীর ঝাউতলা এলাকার কুমিল্লা মা ও শিশু স্পেশালাইজড হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে উধাও হয়ে যান নবজাতকের বাবা। হাসপাতালে ভর্তির সময় শিশুটির বাবা মিজানুর রহমান যে নাম্বার দিয়েছিলেন ওই নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাদের সন্ধান পায়নি। পরে গত ৮ জুলাই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে শিশুটির মা শিরীন আক্তারকে নবজাতকের বিষয়ে জানায় শিশুটি চিকিৎসাধীন থাকা হাসপাতালের লোকজন। এরপরই হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির মা।

এরপর বিল পরিশোধ না করলেও শিশুটির চিকিৎসার পাশাপাশি মায়ের নিয়মিত খাবারের ব্যয়ভার বহন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের। এরপরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুটির সার্বিক ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমন খবর পেয়ে রোববার দুপুরে হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির বাবা-মা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত সাত দিনে এ শিশুর চিকিৎসা বাবদ খরচ আসে এক লাখ ৩০ হাজার ১০৭ টাকা।

শিশুটির বাবা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার টাকা দেয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না, তাই ফোন রিসিভ করিনি এবং হাসপাতালে আসিনি।’ শিশুটির মা শিরিন আক্তার বলেন, ‘পেটের সন্তান ভর্তির পর টাকার জন্য হাসপাতালে আসতে পারছি না। এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে। এ কারণে আমার স্বামী হাসপাতালে আসতে পারেননি। আমার অসুস্থতা স্বত্তেও হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য অনেকের কাছে টাকার জন্য ছুটে গিয়েছি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, আমাদের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। মেয়ের জন্য আমার মন কাঁদলেও তাকে দেখতে হাসপাতালে আসতে পারিনি। আমরা একেবারেই নিরুপায় হয়ে পড়েছিলাম।

তিনি বলেন, এসপি স্যার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমরা স্যারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার কাছে মনে হয়েছে আল্লাহ যেন এসপি স্যারকে একজন ফেরেশতার মতো আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।’

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. এমরান বলেন, ‘এটি প্রি-ম্যাচিউর শিশু। ভর্তির সময় তার ওজন ছিল সাড়ে ৭০০ গ্রাম। অন্য শিশুকে যে ধরনের সাপোর্ট দিয়ে থাকি, এর ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরনের সাপোর্ট দিয়েছি। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বর্তমানে শিশুটি উন্নতির দিকে রয়েছে।’

হাসপাতালের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদিউল আলম চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমদিন ভর্তি হওয়ার সময় শিশুটির বাবা দুই হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এরপর আর তার বাবার মুখ দেখিনি। যেহেতু শিশুটি আমার এখানে ভর্তি হয়েছে, এর দায়ভার সম্পূর্ণ আমার মনে করেছি। সে হিসেবে তার চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি করিনি। অভিভাবকহীন এ শিশুটির চিকিৎসায় বিলের দিকে না তাকিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতে মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা দায়িত্ব পালন করেছি। পুলিশ সুপার মহোদয় শিশুটির দায়িত্ব নেয়ার পর রোববার তারা এসেছেন।’

পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সাত দিনে যে বিল এসেছে, হতদরিদ্র এ দম্পতির এ বিল পরিশোধের সামর্থ নেই। আমরা খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পেয়েছি। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে শিশুটি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আমরা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছি। শিশুটি সুস্থ হয়ে ওঠলে আমাদের মানবিক সেবার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি- এ শিশুটি যেন বেঁচে থাকে এবং দৃষ্টান্ত হিসেবেই যেন সে পৃথিবীতে থাকে।

তিনি বলেন, ‘মানুষের সহযোগিতায় যে বেঁচে থাকা যায় বা আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও কেউ না কেউ এগিয়ে আসে, এটা কুমিল্লা জেলা পুলিশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সেও পৃথিবীতে বিকশিত হয়ে পরবর্তীতে কারো না কারো দায়িত্ব নেবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এ হাসপাতালেই বিল পরিশোধ না করে উধাও হয়ে যান আরেক দম্পতি। পরে পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের হস্তক্ষেপে বাবা-মাকে খুঁজে নিয়ে আসা হয় এবং হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে নাম রাখা হয় দৃষ্টান্ত। যদিও পরে ওই শিশুটি মারা যায়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/আরএইচ

কুমিল্লা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close