• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

নারায়ণগঞ্জে পিপিই'র অভাবে ঝুঁকিতে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী  

প্রকাশ:  ২৫ মার্চ ২০২০, ০৮:২৩
শওকত আলী সৈকত

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকার শিথীল ঘোষণা করায় জেলা সদরের দুইটি সরকারি হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগে মেডিকেল অফিসাররাও মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) থেকে অনুপস্থিত রয়েছেন। ফলে সাধারণ সমস্যা নিয়ে আসা রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে গিয়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এর পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত পরিমানে নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় পুরোপুরিভাবে মারাত্বক ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

মঙ্গলবার দুপুরে শহরের খানপুরে ৩শ' শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও নগরভবন সংলগ্ন ১ শ' শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনেকটাই নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক চিকিৎসক হঠাৎ করে ছুটিতে থাকায় সাধারণ রোগের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বিপাকে পড়েন। অনেককেই ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে ফিরে যেতে দেখা যায়।

এদিকে কর্তব্যরত কয়েকজন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, তারা নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারিভাবে সব ধরণের ব্যবস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। কেউ কেউ দু:খ প্রকাশ করে বলেন, পিপিইতো প্রশ্নই আসে না, সাধারণ গ্লাভস, মাস্ক ও গাউন পর্যন্ত আমাদের নেই। একটা করে মাস্ক আর গ্লাভস দেয়া হয়েছে যা ওয়ান টাইম অর্থাৎ মাত্র একদিন ব্যবহারের জন্য। তাই এগুলোই ধুয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে গাউন এবং পিপিই সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে তারা মনে করছেন। তা না হলে তারা সর্বক্ষণ ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছেন।

তবে জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ দাবি করেন, সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে সরঞ্জাম মজুদ রয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত কোন রোগী আইসোলেশনে নেই তাই পিপিই ব্যবহারের সময় এখনো আসেনি। একেকটা পিপিই অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় এই মূহুর্তে অযথা ব্যবহার না করে জরুরি অবস্থার জন্য মজুদ রাখা হয়েছে। যদি কেউ আক্রান্ত হন তবে সবার ব্যবহারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন তিনি।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজনই নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। এরপর থেকেই জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ৫ শয্যার আইসোলেশন কক্ষ প্রস্তুতসহ শহরের পুরাতন কোর্ট এলাকায় চীফ জুডশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত ভবনকে ১শ' শয্যার প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন ও পরবর্তীতে সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুরে বেসরকারি স্বাস্থসেবা কেন্দ্র সাজেদা হাসপাতালকে ৫০ শয্যার সম্পূর্ণ করোনা চিকিৎসাকেন্দ্র (আইসোলেশন সেন্টার) হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে বলে সিভিল সার্জন সময় নিউজকে জানিয়েছেন।

এদিকে করোনা আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ছয়হাজার প্রবাসী সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে ফিরে এলেও তাদের মধ্যে মাত্র ১৮৬ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাকী পঁচানব্বই শতাংই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। অনেকেই অবাধে ঘোরাফেরা করছেন তাদের নিজ এলাকায়। যার কারণে সাধারাণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে সরকারি হাসাপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমানে নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক ও সেবিকারাসহ কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

চলতি বছরের শুরুর দিকে চীন থেকে করোনা ভাইরাস বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়লে আতংকে নারায়ণগঞ্জের ৫ হাজার ৯শ' ৬৮জন প্রবাসী পর্যাক্রমে দেশে ফিরে আসেন। কেউ কেউ নিজ এলাকায় এলেও সিংহভাগ বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না। যার কারণে তাদের শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলা পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ। বিস্তর সংখ্যক এই বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৬শ' ১জনকে তাদের ঠিকানা অনুযায়ী পাওয়া গেলেও হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আনা গেছে ১শ' ৮৬জনকে। বাকীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো অবাধে চলাফেরা করছেন। কেউ কেউ তথ্য গোপন করে আছেন নিজ নিজ পরিবারের সাথে। তাদের কারো শরীরে করোনা ভাইরাস থেকে থাকলে তাদের পরিবারের সদস্যরা যেমন করোনা ঝুঁকিতে আছেন। একইভাবে ঝুঁকির মধ্যে আছেন তাদের প্রতিবেশিরাও।

তবে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্কতামূলক নোটিশ টানিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাদের ঠিকানা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না তাদের স্বজনদের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতিটি থানা এলাকায় বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে মাইকিংও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে করোনা সংক্রমনরোধে সারা দেশেও মতো নারায়ণগঞ্জেও সেনাবাহিনী এসে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জরুরি সভায় অংশগ্রহণের পর থেকেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামেন। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সারিবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর মোটরযানের টহল দিতে দেখা যায়।

করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো: জসীম উদ্দিন তার কার্য্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানিয়েছেন, জেলার অবস্থা বর্তমানে নিয়ন্ত্রনে আছে। করোনা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন খুবই তৎপর রয়েছে। বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী যখন যা প্রয়োজন তাই করার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, দরকার হলে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হবে। আতংক বা দু:শ্চিন্তার কোন কারণ নেই। জেলা সিভিল সার্জন, জেলা পুলিশ সুপার ও সেনা কর্মকর্তারাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা এ জরুরি সভায় উপস্থিত ছিলেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/আরএইচ

নারায়ণগঞ্জ,পিপিই
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
Latest news
close