• রোববার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

কোন প্রধানমন্ত্রী তোমাকে বাঁচায় দেখা যাবে: আরডিসি নাজিম

প্রকাশ:  ১৭ মার্চ ২০২০, ১৭:২৪
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন। সংগৃহীত

মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের সদ্য সাবেক রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দীনের অপকর্মের নানা কাহিনী এখন একে একে বেরিয়ে আসছে। ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের মতোই একইভাবে রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা আগেও ঘটিয়েছেন তিনি। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

এলাকার নিরীহ মানুষদের নানা অজুহাতে ধরে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল দিয়ে পরে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। ভুক্তভোগী এসব মানুষ তার এসব অপকর্মের শাস্তিসহ নিজেদের প্রতি অবিচার করায় সরকারের কাছে ন্যায় বিচার দাবি করেছেন।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের পঞ্চায়েত পাড়ার কৃষক খালেকুজ্জামান মজনুর বাড়িতে গভীর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে তাণ্ডব চালান নাজিমউদ্দীন। ওই ইউনিয়নের দেবীকুড়া নামক বিল নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এক পক্ষের সাথে যোগসাজসে খালেকুজ্জামানের বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নাম ভাঙিয়ে বাড়ির দরজা, জানালা ভেঙে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন নাজিম। এসময় তাদের বাধা দিতে গেলে তার স্ত্রী, সন্তান ও নাতিসহ পার্শ্ববর্তী অনেককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও লাঠিপেটা করেন তিনি।

পরে খালেকুজ্জামানকে গাড়িতে তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নেয়ার পথে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় জেলে দেয়ার হুমকি দেন। সে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মধ্যরাতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নিচ তলায় একটি রুমে বসিয়ে ছয় মাসের জেল প্রদান করেন। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

এ ব্যাপারে খালেকুজ্জামান জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা সময় হঠাৎ করে বাড়ির দরজায় লাথি মেরে দরজা ভেঙে আমাকে ঘর থেকে বের করে আনে। আমি আরডিসি নাজিম উদ্দীনের কাছে জানতে চাই এতো পুলিশ নিয়ে এসেছেন আমার কি অপরাধ। কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে নাজিম বলেন একে গ্রেফতার করো। তারপর দুইজন বিজিবি আমার দুই হাত দুই দিকে ধরে গাড়িতে তোলে। গাড়িতে তোলার পর আমার মাথায় যে টুপি ছিল সে টুপিটা খুলে ফেলে দেয়। এরপর অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর আমাকে বলে তোমার কাছে দুই লাখ টাকা আছে। যদি টাকা থাকে দাও তোমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাব। তখন টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে এরপর ডিসি অফিসের নিচ তালায় আমাকে নিয়ে একটি রুমে বসিয়ে বলা হয় তোমাকে ছয় মাসের জেল দেয়া হয়েছে। কোন প্রধানমন্ত্রী তোমাকে বাঁচায় দেখা যাবে। আমি সরকারের কাছে এর ন্যায় বিচার চাই।

এর কিছুদিন আগে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের একটি জলমহাল ইজারার ঘটনায় মৎস্যজীবী বিশ্বনাথকে একই কায়দায় মধ্যরাতে বাড়িতে গিয়ে ঘর থেকে বের করে কিল ঘুষি মেরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন তিনি। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় বিশ্বনাথকে দুই বছরের জেল প্রদান করা হয়। জেলে থাকলেও এখন পর্যন্ত সে মামলার কোন কোন কপি হাতে পাননি তার পরিবার।

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে নির্যাতিত বিশ্বনাথের স্ত্রী পারো বালা দাস জানান, আমার স্বামীকে বাড়ি থেকে ধরে মারপিট করে জেলে দিয়েছে। আমার দুটি ছোট সন্তান পা ধরলেও তারা ছেড়ে দেননি। এমনকি আমার ছোট ছোট বাচ্চা দুটিকেও লাথি দিয়ে ফেলে দিয়েছে এই নাজিম উদ্দীন। আমাকে গালি দিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ফেলেছে। আমি তাকে বাপ ডাকলেও তিনি আমার স্বামীকে ছাড়েন নি। তখন আমাকে বুট জুতা দিয়ে লাথি মারেন। এরপর প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসলে তাদেরকেও মারধর করা হয়।

স্বামীকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি গরিব মানুষ কোথায় যাবো। আমার স্বামীকে ছেড়ে না দিলে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে কি খাব। আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়া হোক।

এ বিষয়ে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে ভিতরবন্দ ইউনিয়নে অনেক সাধারণ মানুষকে আরডিসি নাজিমউদ্দীন এভাবে হয়রানি করেছে । এসব ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করেন তিনি।

এছাড়া কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি কমিশনার থাকাকালীন নানা অপকর্মে জড়িত থাকায় তাকে সেখান থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। সেসময় তিনি কক্সবাজার শহরের কলাতলি এলাকার মোহাম্মদ আলী ওরফে নকু মাঝি (৬২) নামে এক বৃদ্ধকে নির্যাতন করার ভিডিও গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

জেলা প্রশাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যোগদান করেন ২৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে। রাজস্ব, এলএ, ব্যাবসা-বাণিজ্য এবং আরএম শাখার দায়িত্ব পালন করেন করেন তিনি। যোগদানের পর থেকেই জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নির্দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে বিভিন্ন অপকর্ম শুরু করেন আরডিসি নাজিমউদ্দীন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাজিমউদ্দীনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার পর জেলা প্রশাসনের আরডিসি নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট আনসার সদস্যদের নিয়ে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের শহরের চড়ুয়া পাড়ার বাড়িতে যায়। এক পর্যায়ে জোড়পূর্বক দরজা ভেঙে তার ঘরে প্রবেশ করে স্ত্রী সন্তানের সামনেই তাকে মারধর করে ধরে নিয়ে যায়। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে নির্যাতনের পর তার বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা রাখার অভিযোগে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ঘটনার একদিন পর জামিন পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অমানুষিক ও বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দেন নির্যাতিত সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম।

এদিকে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে নির্যাতনের ঘটনায় সোমবার আরডিসি নাজিমউদ্দীনসহ দুই সহকারী কমিশনারকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করে নতুন প্রশাসক হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ভিডিও...

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

কুড়িগ্রাম,সাংবাদিক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close