• রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
  • ||

ক্ষমতাসীন দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে জহুরের 'রামরাজত্ব'

প্রকাশ:  ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:২৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
জহুর আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন সেক্টরটি জিম্মি হয়ে আছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জহুর আহমদের হাতে। দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর ধরে তিনি এ অ্যাসোসিয়েশনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছেন।

চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও সরকারি দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে তিনি বহাল তবিয়তে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।

জহুরের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চেয়ে ভুক্তভোগীরা তাকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হলে ক্যাসিনোখ্যাত সম্রাটদের মতো তার কাছেও বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের সন্ধান মিলবে। দুদকের অনুসন্ধানেও মিলবে ভয়াবহ তথ্য।

সূত্র জানায়, জহুর আহমদ অ্যাসোসিয়েশনের নামে সাধারণ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকদের কাছ থেকে নানা কৌশলে বছরের পর বছর আদায় করছেন বিপুল অংকের চাঁদা। সরকারি দলের ভয় দেখিয়ে এলাকায় তিনি রীতিমতো রামরাজত্ব কায়েম করেছেন।

ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক ও শ্রমিকদের দেখভাল করা তার দায়িত্ব হলেও উল্টো তিনি নানাভাবে তাদের প্রতিনিয়ত হয়রানি করেন বলে অভিযোগ আছে। এ কারণে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে গাড়ি বিক্রি করে ব্যবসা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। সাধারণ মালিকরা সর্বস্ব হারিয়ে চোখের পানি ফেলছেন।

অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক-বর্তমান নেতা এবং সাধারণ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জহুর আহমদের হয়রানির এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, কথায় কথায় পরিবহন ধর্মঘট কিংবা বন্দর অচল করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটান তিনি। সর্বশেষ ২০ নভেম্বর নতুন সড়ক আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহন ধর্মঘটের নামে চট্টগ্রামে যে নৈরাজ্য হয়েছে সেখানেও তার মুখ্য ভূমিকা ছিল।

নগর আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদে থাকার কারণে সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়েও তিনি ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করেন। অ্যাসোসিয়েশনের শত শত সদস্য হাজী জহুর ওরফে জহুর কোম্পানির রাহু গ্রাস থেকে অ্যাসোসিয়েশনকে মুক্ত করতে চান। কিন্তু প্রকাশ্যে এ নিয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না।

৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, অ্যাসোসিয়েশনে চাঁদাবাজি ও জুলুমবাজি করেই টিকে আছেন সাধারণ সম্পাদক জহুর আহমদ। মেয়াদ শেষে কখনোই নির্বাচন দেয়া হয় না।

নির্বাচন না হওয়ার কারণে সাধারণ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকরা জিম্মি হয়ে আছেন। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ৫ বছর আগে। নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ মালিকরা একবার সমিতি দখল করেছিলেন। তখন রেলের বিট ধরে দৌড়ে পালিয়ে বেঁচেছিলেন জহুর আহমদ। পরে নির্বাচন দেয়া হলেও নানা মেকানিজম করে অ্যাসোসিয়েশন দখলে রাখেন তিনি।

সাধারণ মালিকদের কল্যাণের পরিবর্তে তার দ্বারা অকল্যাণই বেশি হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হওয়ার পরও তাদের কৌশলের কাছে টিকতে না পেরে সাধারণ মালিকদের অনেকেই গাড়ি বিক্রি করে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি চলে যান। এটা কখনোই কাম্য নয়।

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক দফতর সম্পাদক ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা নুর হোসেন বলেন, বছরের পর বছর এভাবে অ্যাসোসিয়েশন দখলে রাখার নেপথ্যে রহস্য কী। এখানে মধু আছে। দুর্নীতি আছে।

এ কারণে তিনি পদ ছাড়তে চান না। দলের পদ-পদবি ও ক্ষমতার দাপটে টিকে আছেন। সাধারণ মালিকরা তাদের হাতে জিম্মি। এ জিম্মিদশা থেকে অ্যাসোসিয়েশন ও সাধারণ মালিকদের মুক্ত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সদস্য প্রায় এক হাজার। যে কেউ চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যবসার জন্য চট্টগ্রামে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান নামাতে চাইলে এ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে হয়।

এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় অ্যাসোসিয়েশনকে। নবায়ন করতেও দিতে হয় নির্ধারিত অংকের ফি। ১ হাজার ৮০০ থাকা রসিদমূলে নেয়া হলেও বিনা রসিদে আদায় করা হয় ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। অন্যথায় গাড়ি নামাতে পারেন না কেউ।

সূত্র আরও জানায়, শুধু সদস্য হলেই যে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারবেন তা নয়, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয় মালিকদের। এর মধ্যে আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে ওভারলোডিং। যে কোনো গাড়ি পণ্য ওভারলোডিং করলে নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয় অ্যাসোসিয়েশনকে। বন্দর অভ্যন্তরের জেটি কিংবা বিভিন্ন ডিপো থেকে পণ্য ওঠানামায় ওভারলোডিংয়ের বিষয়টি তাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না।

সূত্র জানায়, ১০ টন থেকে সর্বোচ্চ ২৫ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করে থাকে ট্রাকগুলো। এ ক্ষেত্রে ওভারলোডেড পণ্যে টন প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়া হয় মালিকদের কাছ থেকে। এছাড়া বন্দরে পণ্য লোড করার জন্য ট্রাকের সিরিয়াল পেতেও নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয়। নিমতলা ট্রাক টার্মিনালে ট্রাক রাখতেও দিতে হয় চাঁদা।

সূত্র জানায়, এক সময় এ সমিতির সদস্যদের ৪-৫ হাজার গাড়ি থাকলেও এসব কারণে এখন তা নেমে এসেছে দেড়-দুই হাজারে। এর মধ্যেও সিংহভাগ গাড়ির কাগজপত্রে রয়েছে ত্রুটি। পুলিশ ম্যানেজড করা এবং দুর্ঘটনার মধ্যস্থতা করার নামেও নানা কৌশলে মালিকদের কাছ থেকে আদায় করা হয় চাঁদা।

সূত্র আরও জানায়, চাঁদা নিয়ে ওভারলোডের সুযোগ করে দেয়ার কারণে সাধারণ মালিকরা পণ্যের ভাড়া পান না। তিনটি গাড়ির পণ্য যদি ওভারলোডের মাধ্যমে একটি গাড়ি এক ট্রিপে পরিবহন করে সে ক্ষেত্রে অন্য গাড়িগুলো ভাড়া না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। আবার বড় বড় কোম্পানির পণ্য পরিবহনের চুক্তিও জহুর আহমদের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের হাতে।

নেতৃত্বে থাকার কারণে নানা কৌশলে তারা এ ব্যবসা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ আছে। বিশেষ করে স্টিল রি-রোলিং মিলের স্ক্র্যাপ পণ্য পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ এ সিন্ডিকেটের হাতে। তারা যাদের গাড়ি ভাড়া করে দেবে তাদের মাধ্যমেই এ পণ্য পরিবহন করতে হবে।

এমন বাধ্যবাধকতা জহুর সিন্ডিকেট চাপিয়ে দিয়েছে। এ কারণেও সাধারণ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকরা পণ্য পরিবহন করতে পারেন না। ব্যবসা না হলেও চাঁদা দিতে দিতে ফতুর হয়ে শেষ পর্যন্ত পানির দামে গাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হন অনেকে।

এদিকে জহুর আহমদ নিজেকে একজন সৎ মানুষ দাবি করে প্রতিবেদককে বলেন, তিনি সিটি কলেজে পড়ার সময় থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী তার বন্ধু ছিলেন। সততার কারণেই তিনি এ অবস্থানে এসেছেন।

৩৩ বছর ধরে পরিবহন সেক্টরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আরও অনেক সংগঠনের নেতা তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দরজা তার জন্য খোলা। পরিবহন সেক্টরের বিষয়-আশয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও অনেক সময় তার সঙ্গে কথা বলেন। তাই তাকে নিয়ে কে কী বলল তা নিয়ে তিনি কোনো কেয়ার করেন না। সূত্র: যুগান্তর


পূর্বপশ্চিম/এআর/কেএম

জহুর আহমদ,চট্টগ্রাম বন্দর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত