• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

ওসির আগেই পানিতে লাফিয়ে পড়েন কনস্টেবল কাউছার

প্রকাশ:  ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৪ | আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:০২
সজিব খান

ময়লা পানিতে নেমে খাদে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রীদের উদ্ধার করে সারা দেশব্যাপী প্রশংসায় ভাসছেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্তত ১০-১৫ জনকে উদ্ধার করে তিনি ফেসবুকসহ অনলাইন মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল। তবে ওসি পানিতে নামার আগেই এক পুলিশ কনস্টেবল যাত্রীদের উদ্ধারে পানিতে লাফিয়ে পড়েন বলে জানা গেছে।

জীবনের ঝুকিয়ে নিয়ে ১০-১২ জনকে উদ্ধার করলেও এখনও আড়ালেই রয়ে গেছেন গোসাইরহাট সার্কেল অফিসে কমর্রত মোঃ কাউছার নামের ওই পুলিশ কনস্টেবল। তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপসি গ্রামের সন্তান।

মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) সকাল সোয় ৯টার দিকে ডামুড্যা-শরীয়তপুর সড়কের খেজুরতলা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রীদের উদ্ধারে নোংরা পানিতে নেমে যাত্রীদের উদ্ধারে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন পুলিশ কনস্টেবল মোঃ কাউছার। বাসটিতে অন্তত ৩০ জন যাত্রী ছিল। এদের মধ্যে কামরুজ্জামান মাহমুদ মুন্সী (৪৫) ও ইয়াকুব পাইককে (৮০) উদ্ধার করা গেলেও বাঁচানো যায়নি। এছাড়া আহত হন ছয় নারীসহ অন্তত ২৫ জন।

পুলিশ কনস্টেবল মোঃ কাউছার বলেন, সকালে আমাদের গোসাইরহাট সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমিনুল ইসলাম স্যার ঘটনাস্থল থেকে ফোন দিয়ে বলেন যে, ‘একটি যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে গেছে। যাত্রীদের উদ্ধার করতে হবে। তোমরা দ্রুত চলে এসো।’ এরপর আমি এবং আমার বন্ধু পুলিশ কনস্টেবল মোহাম্মদ আলী সঙ্গে সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থালে পৌছাই। ডামুড্যা থানার ওসি মো. মেহেদী হাসান এবং আমাদের স্যার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমিনুল ইসলাম আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। সাধারণত কোনো ঘটনা ঘটলে থানায় আগে খবর যায়। তাই ওসি সাহেব আমাদের আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গিয়ে দেখি, বাসটি খাদের পাড়েই পানিতে পড়ে আছে, আর কিছু যাত্রীদের পানি থেকে তোলা হচ্ছে। সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের অনেক সদস্য ছিলো। তাদেরকে উদ্ধার কাজে স্থানীয় লোকজন সহযোগিতা করছিলেন।

তিনি বলেন, বাসটি পানিতে ধেবে ছিল, সেটার ভেতরে বা নিচে কেউ আটকে আছে কিনা তা দেখার জন্য বাসটি সড়ানো লাগতো। কিন্তু কেউ পানিতে নামতে চাচ্ছিলো না। আর ওই মূহূর্তে সেখানে কোনো ক্রেনও ছিলো না যে তা দিয়ে বাস সড়ানো হবে। তখন দড়ি দিয়ে বেঁধে বাস টেনে সড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু কেউ পানিতে নামতে চায় না। পরে আমি আর আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী পানিতে নামলাম। আমরা নামার সাথে সাথেই ওসি স্যারও পানিতে নামেন। এরপর আমাকে দেখে উৎসাহিত হয়ে আমার মতো বয়সী স্থানীয় ১০-২০ জন যুবক জোরে চিৎকার করে পানিতে লাফিয়ে পড়েন। এরপর আমরা বাসটি টেনে সোজা করি, দেখি বাসের নিচে বা ভেতরে কেউ আটকে আছে কিনা। এরপর যারা ছিলো এবং যাদের উদ্ধার করে উপড়ে তোলা হয়েছে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কাউছার জানান, খাদে পড়ে যাওয়া বাসের যাত্রীদের ১০-১২ জনকে তিনি উদ্ধার করেছিলেন। ওইরকম একটা পরিস্থিততে তার মাথা ঠিকমতো কাজ করছিলো না। কিভাবে যাত্রীদের উদ্ধার করা যায়। সেটাই ছিল তার লক্ষ্য।

কনস্টেবল কাউছার বলেন, আমরা এক ঘণ্টার মতো উদ্ধার কাজে ছিলাম। আমাদের স্যার গোসাইরহাট সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমিনুল ইসলাম পুরো সময়টা সেখানে উপস্থিত থেকে উদ্ধার কাজ পর্যিবেক্ষন করছিলেন। এরপর তিনি সেখান থেকে সরাসরি ডামুড্যা সরকারি হাসপাতালে রোগীদের অবস্থা দেখতে চলে যান। আর পানিতে নামায় আমার এবং আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলীর সারা শরীর নোংরা পানিতে ভিজে গিয়েছিলো। মোবিলের পানিতে সারা শরীর ও চেহারার তখন বাজে একটা অবস্থা। আমরা সেখান থেকে সরাসরি স্টেশনে ফিরে এসে গোসল করে ডেস চেঞ্জ করে ডিউটিতে যোগ দিই।

তিনি জানান, উদ্ধার কাজে থানার যতো পুলিশ ছিলো সবাই অংশগ্রহণ করেছিলো। যার ডিউটি নাই, সেও সেখানে উপস্থিত ছিলো। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কেউ বাসা থেকে, কেউ থানা থেকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলে এতো লোকজন ছিলো রাস্তাঘাট পুরো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ সদস্যদের রাস্তা খালি করার কাজও করছে হয়েছে। উপস্থিত জনতার জন্য তারা ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলেন না।

কাউছার বলেন, সেখানে এতো লোকজন এসে জড়ো হয়েছিল যে আমরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলাম না। কেউ সেলফি তুলছিলো, কেউ ছবি তুলছে। আবার কেউ কেউ গায়ের ওপর এসে পড়ছিলো। তবে আমরা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় জনগণ সকলে মিলে বাসের যাত্রীদের উদ্ধার করতে সক্ষম হই।

উল্লেখ্য, শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান ওইদিন নিজে নোংরা পানিতে নেমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া বাসটি থেকে ১০ থেকে ১৫ জনকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি পানিতে লাফিয়ে পড়ে গাড়ির জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে দেন। যাতে গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীরা বেরিয়ে আসতে পারেন। ওসির উদ্ধারের কয়েকটি ছবি ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরাল হয়। এরপর অনেকেই তার ভূয়সী প্রশংসা করার পাশাপাশি পদোন্নতির দাবি জানান।

তবে উদ্ধার কাজে গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও কনস্টেবল মোঃ কাউছারের নাম কোনো গণমাধ্যমে আসেনি। তবে তার বেশকিছু ছবি তার পরিচিতজনরা ফেসবুকে শেয়ার করে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন। সেইসঙ্গে কোনো পত্রপত্রিকায় তার নাম না আসায় কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশও করছেন। তবে এসব নিয়ে কোনো দুঃখ নেই এই পুলিশ সদস্যর। তিনি তার দায়িত্ববোধ থেকেই উদ্ধার কাজে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বলে জানান।


পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

ওসি,পানি,কনস্টেবল,কাউছার,শরীয়তপুর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

সারাদেশ

অনুসন্ধান করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত