• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

‌‘স্বাধীনতা পেলে আমরা পরাধীন হতে ভালোবাসি’

প্রকাশ:  ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৩০
ফিদা ইসলাম রিসলু

আমার দোকানের সামনে দুজন গরীবমানুষ ফল বিক্রি করেন। একজন হযরত, আরেকজন বৈরাগী। দুজনই তারা নামাজী এবং পূজারী। একজন পীরের প্রগাঢ় ভক্ত, আরেকজন হচ্ছেন আবার- তীর্থযাত্রীদের গাইড পার্টনার। তারা নির্দ্বিধায় একজন আরেকজনের কাছে ফল-ফলাদী রেখে নিদিষ্ট সময়ান্তে ধর্ম পালনের জন্যে চলে যাচ্ছেন। এর মধ্যে যখন চলে যাওয়া ধার্মিকের খরিদ্দার আসছেন, থেকে যাওয়া ধার্মিক চলে যাওয়ার হয়ে সেগুলি বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার পুলিশ এসে যখন তাদেরকে উঠিয়ে দিতে চাইছেন, শুধু নিজেরটা নয়, অপরেরটাকেও আগলে রাখতে চাইছেন। হি

ন্দু-মুসলিম দুই-খড়কুটোর এই যে পারস্পরিক হৃদ্যতা, সেখানে বেঁচে থাকবার কিংবা বাঁচিয়ে রাখবার একধরণের মানবিক প্রণোদনা বাহিত বইছে- যার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ক্রিয়াশীল নয়। সাম্প্রদায়িকতা আসে ধর্মের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন থেকে। ধর্মকে যখন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিনত করা হয়, ধর্মের সুপেয় সুধা সেখান থেকে উবে গিয়ে অধর্মের অনপনেয় কালিমা শনৈ শনৈ বয়। সামাজিকায়নে সেটা প্রভাবিত হয়, দিগ-বিদিকে বিদ্বেষ ছড়ায় এবং আধিপত্যের মানস তৈরি করে। মানবিক বোধের সংগে এর বিরোধে মানুষ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠে।

সম্পর্কিত খবর

    বৈরাগী আর হযরতের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না। লেখাপড়ায় এরা অজ্ঞ হলেও ধর্মের অভ্যন্তরস্ত বিশ্বাসের বহতার সাথে দৈনন্দিন লড়াই-সংগ্রামের ঘাম-ঝরানো আর্দ্রতা মিশে তাদের ভেতরে একধরণের সহৃদয়তার মহিমা ঝরে, যেখানের বরে সুখে-দুখে তারা থাকেন- পরস্পরের পরম্পরা। তাছাড়াএরা দিনআনা-দিনখাওয়াদের অন্তর্ভুক্ত মানুষ। এদের ভেতর শ্রেনীগত উত্তরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এরা কেউ কারো জায়গা-জমি কিনতে চাইবে না, ক্ষমতা আর শক্তির সান্নিধ্যে তাদের জিহবা লকলকিয়ে উঠবে না। সন্তান-সন্ততি নিয়ে বেঁচে থাকবার বাসনাটাই তাদের কাছে মূখ্য, বিধায়- রাজনীতি এদের জীবনে ধর্মকে টেনে এনে অধর্মের মাৎস্যন্যায়ে পরিনত করে না। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে উঠে আসা বিচারহীনতা সুবাদে বড়মাছ কর্তৃক ছোটমাছকে গিলে খাওয়ার এই উপমার সাথে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের সংযুক্তি থাকে।

    নিজের বড়ত্বকে ধর্ম বানিয়ে আধিপত্যের কর্তৃত্বশীল প্রণোদনার এই সাম্প্রদায়িক প্রবণতা ভারত উপমহাদেশকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলতে সক্ষম হলেও বৃটিশ শাসনপূর্ব দীর্ঘ সময়জুড়ে হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খৃষ্টানদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল ঈর্ষনীয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অনান্যদের সাথে মোগল, পাঠানরা এই জনপদ শাসন করেছেন, কিন্তু কখনোই তারা অন্যধর্মের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাননি। মুসলিম শাসকদের অধীনে আদালত কিংবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করবার জন্য হিন্দুদের ধর্ম ত্যাগ করতে হয়নি।

    মোগল সেনাবাহিনীর শপথ অনুষ্ঠানে হিন্দু সেনারা বিষ্ণুর নামে আর মুসলমান সেনারা আল্লাহর নামে শপথ নিতেন। বহু ধর্মকে এক করে শাসনকার্য পরিচালনার নীতিতে অটল ছিলেন সম্রাট আকবর। ধর্ম অবমাননার জন্যে যখন রোমের ক্যাম্পো দে ফিউরিতে জিউরদানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, সম্রাট আকবর তখন আগ্রায় ধর্মীয় সহনশীলতার উপর বক্তৃতা দিয়েছেন।

    অনেক হিন্দু ইতিহাসবিদ সম্রাট আওরঙ্গজেবের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে সমালোচনামুখর হলেও নোবেল লোরিয়েট অমর্ত্য সেনের নানা প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ক্ষীতিমোহন সেন সেই ইতিহাসের জ্ঞান নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। সেটিকে তিনি কল্পিত ইতিহাস আখ্যা দিয়ে আওরঙ্গজেবের আদালত ঘনিষ্ট সহচরদের মধ্যে বিদ্যান হিন্দুদের সাহচার্যকে সামনে নিয়ে এসেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর মোগল শাসকদের আগেও আফগান থেকে আসা পাঠানদের আদালত এবং সেনাবাহিনীতে ভিন্নধর্মের মানুষদের সন্মানজনক সংশ্লিষ্টলতা ছিল। মূলতঃ ধর্মের এই একত্রিত অবস্হানের বিপরীতে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে।

    ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্হায়ী বন্দোবস্তের আওতায় জমিদারদের স্হায়ীভাবে সরকারকে রাজস্ব দেয়ার প্রথা চালু হয়। এতে করে ইচ্ছেমত খাজনা বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে জমিদারেরা তাদের বরকন্দাজদের মাধ্যমে প্রজা সাধারণের কাছ থেকে খাজনার টাকা নিয়ে কলকাতায় গিয়ে বিলাসিতায মত্ত হয়ে পড়েন, অন্যদিকে ক্রমশই নিঃশ্ব থেকে নিঃশ্বতর হতে থাকে প্রজাসাধারণ। এই জমিদারদের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের, আর প্রজাকূলেরা ছিলেন মুসলমানের। সামন্ত শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট এরা- তাদের দূভাগ্যের জন্যে হিন্দু জমিদারদের দায়ী করে ক্রমশই তাদের কাছ থেকে সরে যেতে থাকেন। বঞ্চনা থেকে উদগিরিত এই ক্ষোভের সাথে আরও নানাক্ষোভের কষ্টকীর্ণ পথ বেয়ে বেয়ে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ বৃটিশ শাসনের মনোস্তত্ত্বে যে বিষয়টি প্রতিভাত করে, তাতে করে আরেকটি ফরাসী বিপ্লবের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখে তা থেকে উত্তোরণের পথ নির্দেশিকায় তারা একটি মধ্যবিত্ত শ্রেনী তৈরি করতে তৎপর হন; যারা রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতি, রুচি-মূল্যবোধে হয়ে উঠবেন ইংরেজের নকলনবিস।

    এ লক্ষ্যের বাস্তবায়নে জাহাজে করে নিয়ে আসা হলো লর্ড মাকওলে'কে; পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে যিনি বৎসরে আয় করতেন ২০০ পাউন্ড। কিন্তু পরিবারের জন্যে প্রয়োজন ছিল তার ৫০০ পাউন্ড। তাকে ১০,০০০ পাউন্ড বেতন দিয়ে এখানে নিয়ে আসা হলো- যখন কলকাতায় বসে রাজার হালে দিনকাটালেও খরচ হতো ৫০০০ পাউন্ড। তিনি ইনডিয়ান পেনাল কোড তৈরির দাযিত্ব সম্পন্ন করে হাত দিলেন শিক্ষা সংস্কারে। তবে তার প্রবর্তিত শিক্ষাদান পদ্ধতি তার নিজের পর্যবেক্ষণেই পূর্নাংগতা পায় নি। তিনি শিক্ষাকে education না বলে দক্ষতাদান অর্থাৎ instruction বলতেই স্বস্তিবোধ করতেন। যেজন্য শিক্ষা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার নাম দেয়া হয়েছিল "ডিরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন"।

    রাষ্ট্র ভেঙ্গে আরেক রাষ্ট্র তৈরি হওযার পরেও সে-নাম অনেককাল ধরে বিদ্যমান ছিল। এই সীমিত শিক্ষাদান যে দুটি কাজ করতে সক্ষম হয়েছিল, তার একটি হচ্ছে শ্রেনিবিভাজন তৈরি করা আর অন্যটি হলো- সেই বিভাজনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করা। শ্রেনী বিভাজন আগেও ছিল, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন সেই বিভাজনকে বাড়িয়ে দিলো এবং এই নতুন শিক্ষিত শ্রেনীর করতলে চলে গেল চাকরী আর পেশার সাথে সাথে রাজনীতিও। এরমধ্যে রাজনীতিই পেল সর্বাধিক গুরুত্ব।

    তবে সেই রাজনীতিও ছিল তাদেরই তৈরিকৃত কিচেন-পলিটিক্সের ভারতীয় সংস্করণ। রিটায়ার্ড আইসিএস এ্যালেন হিউমের রান্নাকৃত এই রাজনীতির পরিবেশনে ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাজ ছিল মূলতঃ ভারতের বিভিন্ন শহরে ডিসেম্বরের শেষ তিনদিনের কাউন্সিলে নানান আবেদন-নিবেদনের তোড়জোড় আর নতুন সদস্যভুক্তির দেন দরবার। কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ব্যারিষ্টার উমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের পথ বেয়ে প্রথম তের সভাপতির বারোজনই ছিলেন ব্যারিষ্টার। একমাত্র সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় ব্যারিষ্টার না হলেও আইসিএস পরীক্ষায় উত্তির্ণের পরেও নিয়োগ লাভে ব্যর্থ হয়ে ইংরেজী দৈনিক " দি বেঙ্গলী" পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন।

    যুক্তি-তর্কে যুতসই এইসব ব্যারিষ্টারেরা ইতোমধ্যেই বৃটিশ পার্লামেন্টের নানান কায়দা কানুন রপ্ত করে নিয়ে নিজেদের অবস্হানকে সংহত করতে গিয়ে এদেশে প্রবর্তিত অস্ত্র আইন, অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন, স্হানীয় সংবাদপত্র ডিক্লারেশন আইনের বিরোধীতায় মুখর হয়ে উঠলে ধূর্ত ইংরেজদের কাছে দেশীয় নেটিভদের দ্বিচারিতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তারা লক্ষ্য করেন, এরা যেমন ইংরেজদের তোয়াজ করেন, একইসাথে আবার তোয়াজকারীদের ফোঁড়ন কাটতেও পিছ-পা হন না। বিরক্ত ইংরেজ শাসককূল ভিন্নপথের চিন্তায় রাজনীতিতে প্রাগ্রসর বাঙালীদের শায়েস্তা করতে বংগকে ভংগ করে একদিকে পশ্চিমবংগের সাথে বিহার আর উড়িষ্যার পাশে ছোট নাগপুরকে রেখে দিয়ে পূর্ববংগের সাথে আসামের সংযুক্তিতে আরেকটি প্রদেশের জন্ম দেন। হঠাৎ নেমে আসা এই খড়গাঘাতে নবোদ্ভূত বাঙালী মধ্যবিত্ত কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবসা-বানিজ্যের সাথে শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদের বেদনায় প্রথমে ব্যাথিত এবং পরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন।

    তাছাড়া ইংরেজদের এই কৌশলী বিভক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা যেমন বিহার, উড়িষ্যা আর ছোট নাগপুরের অবাঙালীদের তুলনায় সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে, একইভাবে পূর্ববংগের হিন্দুরা মুসলমান বাঙালীদের কাছে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। এই বিভক্তি তাই তাদের সমূহ অস্তিত্বের উপর আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত করে ঢাকায় একটি শিক্ষা সন্মেলনের আয়োজন করে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বংগভংগের বিরোধীতাকারী ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহকে একটি বড়অংকের ব্যাংকলোন পাইয়ে দিয়ে পূর্ববংগীয় মুসলিমনেতৃত্বকে ইংরেজদের পক্ষে নিয়ে আসেন। একইসাথে ১৯০৯ সালের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্হার প্রবর্তন করে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধকে এমন এক মাত্রায় নিয়ে যাওযা হয়, যেখানে প্রদেশের গভর্ণর কর্তৃক ইংল্যান্ডের ভারতসচিবকে চিঠিতে জানানো হয় যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানেরা নিজেদেরকে এতটাই ঘৃণা করেন যে, তারা বৃটিশদেরকে ঘৃণা করবার সময়ই করে উঠতে পারেন না।

    তবে হিংসা-বিদ্বেষের এই পর্বত-পর্যায়ে যাওয়ার আগে বংগভংগকে কেন্দ্র করে বাঙালী মানসে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদগীরণ ঘটে, সেটিও ছিল বিস্ময়কর। এই প্রথম জনপদের মানুষ পথে নেমে আসে। মিটিং-মিছিলে উত্তাল কলকাতায় শিল্প-সাহিত্যের রথী-মহারথীরা কবিতা-গানে, নাটকে-যাত্রায় এই বিধ্বংসী প্রবনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেন। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বংগভংগের প্রতিবাদে বিভিন্ন সভাসমিতিতে বক্তব্য দিতে থাকেন। তাঁর বিখ্যাত দুটি গান- " আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ( যেটি আমাদের জাতীয় সংগীত হয়ে চিরকালের রূপ পরিগ্রহ করে আছে) আর "বাংলার মাটি বাংলার জল/ বাংলার বায়ু বাংলার ফল- পূর্ণ হউক, হে ভগবান" উত্তাল সেই সময়ে রচিত হয়েছিল। তবে শ্রেয়বোধে প্রশান্ত এই মনীষা বিদেশী পন্য বর্জনের নামে বেশিদামে দেশীয় পন্য কেনাতে বাধ্য করানোর প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে মেলাতে না পেরে সেই আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। আন্দোলনের এই তূর্য অবস্হান থেকে তিনি আড়ালে গেলেও সেইসময়ের পত্র-পত্রিকাগুলি ছিল সমান সরব। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর দি বেঙ্গলী ছাড়াও অরবিন্দ ঘোষের ডেইলি বন্দে মাতরম আর অমৃতবাজারের বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিকের পাশাপাশি কলকাতা থেকে প্রকাশিত পাঁচটি বাংলা দৈনিকের সাথে সাতান্নটি সাপ্তাহিক পত্রিকার আগুন আখরে বংগভংগ বিরোধী আন্দোলন একটা পরিনতির দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতরে ধর্মীয় উপাদানের পুনঃ পুনঃ আবির্ভাবে বিভক্তি ক্রমশই স্পষ্ট হতে থাকে।

    গরিষ্ঠসংখ্যক বাঙালী মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে বাঙালীর সমগ্রতায় হিন্দুয়ানার বাতায়নে 'বন্দে মাতরম' গানের সঞ্চারিতে সপ্তকোটি বাঙালীর দ্বিসপ্তকোটি হাতকে দেবীদূর্গার আরাধনায় বাপৃত করবার বঙ্কিম চন্দ্রীয় অনুরণনে মুসলমানেরা অসন্মানিত বোধ করতে থাকেন। ফলে সভা-সমাবেশের সমাপান্তে 'বন্দে মাতরম' ধ্বণীর বিপরীতে 'আল্লা হো আকবর' ধ্বণীর দ্বৈরথে আন্দোলনের পথে পথে যে বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে পড়ে, তারই তোড়ে ১৯০৫ সালের আগে যে সাম্প্রদায়িক দাংগার কথা মানুষ কল্পনাতেও আনেনি, বিক্ষিপ্তভাবে স্থানে স্হানে তেমনি দাংগায় রক্তাক্ত হিন্দু-মুসলমানের বিদ্বেষ-বিসম্বাদের ভেতর দিয়ে ১৯১১ সালে বংগভংগ রদ হলো বটে, তবে কলকাতা'র রাজধানী দিল্লীতে স্হানান্তরিত হয়ে দাংগাকেও নিয়ে গেল গোটা ভারতবর্ষের দ্বারে দ্বারে।

    রাজনৈতিক প্রণোদনার অনৈতিক আবহে বংগভংগের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র দাংগা ১৯২৬-এ গিয়ে মাঝারি রূপ পরিগ্রহের পরিক্রমায় ৪৬-এ এসে ব্যাপক রূপ ধারণ করে ৪৭-এ এসে বাংলা আর পাঞ্জাবকেই শুধু চিঁড়ে ফেললো না, গোটা ভারতবর্ষকেই দুটুকরা করে দিলো। এইসব দেওয়ার পেছনে কার কতখানি অবদান, সেদিকের বিশদে না গিয়েও বলতে পারি যে, ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রগুলোর সতন্ত্র স্বাধীকারের মাধ্যমে একটি যুক্তফ্রন্টীয় ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠার বিপরীতে কংগ্রেসের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আর মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের একগুয়ে মনোভাবের মাঝে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিভাজন নীতির ত্রিপক্ষীয় জারণে এই বিভক্তির পলে পলে রাজনৈতিক নেত্বত্বের স্বার্থান্বেষী ভূমিকার বলি হয়েছে কেবল- সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকবার বাসনা। মহাত্মা গান্ধী চেষ্টা করে গেছেন শেষতক, কিন্তু বল্লভভাই প্যাটেল এমনকি জওহুর লাল নেহেরুর অনাপত্তির পাশে মোহাম্মদ আলী জিন্নার একক কর্তৃত্বে যে দেশভাগ নিশ্চিন্তির প্রান্তে উপনিত হয়েছিল, সেখানে বাঙালীদের ভূমিকা ততটা উজ্জ্বল নয়, যতটা অনুজ্জ্বল ছিল- তাদের কৌশলী বটিকায়।

    শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত সতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের সংশোধনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একক রাষ্ট্রের প্রস্তাবকে বাস্তবে পরিনতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের প্রয়োজন ছিল, ৪৬'র ১৬ই আগষ্টের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস'এর কলকাতাকেন্দ্রিক দ্বিপক্ষীয় হানাহানির মধ্য দিয়ে সেখানে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে বলি হতে হয়েছিল। পুলিশ সেই দাংগা থামাতে গিয়ে ২৪ ঘন্টা সময় নিযেছিল, অথচ বাংলার প্রধানমন্ত্রী তখন গনতন্ত্রের মানসপুত্রখ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ইতিহাস বলে কায়েদে আজমকে খুশি করবার মাধ্যমে নবদ্ভূত পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা থেকে তার সেইসব কর্মকান্ডের পরেও অধিক চতুর জিন্নাহসাহেব যখন সে ইচ্ছার মুখে পানি ঢেলে দিলেন, তড়িঘড়ি করে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা এবং নেতাজী সুভাষ বোসের ভ্রাতা ব্যারিষ্টার শরৎকুমার বসুর সাথে দুইবাংলা একত্রিকরণের একটা ব্যর্থচেষ্টার সংগে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিয়েছিলেন।

    অপরদিকে জিন্নাহসাহেবের মারপ্যাচে কুপোকাত হয়ে শেরে বাংলা অনেকটা বৃদ্ধবাঘের ভূমিকায় নেপথ্যের যবানিকায় নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেন মাত্র। এভাবেই পাকিস্তানের জনক দুই বাঙালী রজনীতিককে ব্যবহার করে ২৬কোটি হিন্দুর বিপরীতে ১০ কোটির মুসলমান নিয়ে গান্ধীজীর কল্পিত রামরাজ্যের প্রতিপক্ষে ইসলামী রাষ্ট্রের জনক হলেন বটে, কিন্তু পেছনে রেখে গেলেন এক তৃতীয়াংশ সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমানের বুকচাপা আর্তনাদের পাশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বেশুমার বিবমিশা।

    বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সেই তমসার ভেতর থেকে বাঙালী জাতিসত্তার একটা উদগিরণ লক্ষ্য করে আবারো নতুন আলোয় অবগাহিত হতে চেয়েছি। আমাদের নিজস্ব শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জীবনে নিজেদেরকে নববর্ষায় ভিজিয়ে নিয়ে যেভাবে সতেজ হতে চেয়েছি, একই তেজের তীব্র তুমুলে পাঞ্জাবী সামরিকতন্ত্রের নিগড় ছিঁড়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সামনে নিয়ে এসেছি স্বাধীকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বাঙালী জাতীযতাবাদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অভ্যুদ্বয় আমাদের সেই স্বপ্নের বরণীতে তরণীর তীর্যক শ্রোত বইয়ে দিয়ে জাতিকে নিয়ে গেছে স্বাধীনতার স্মরণীতে।

    সেখানের বেদীমূলে আমাদের ত্রিশলক্ষেরা মিলে মুক্তির করতলে যেসব স্বপ্নের বিচ্ছুরণ ছড়িয়েছিল, কতটুকু তার পেয়েছিল আকার- সে প্রকারে খুঁজতে গিয়ে এখনো কেন জানি না- ফিরে ফিরে আসে সাম্প্রদায়িকতার কলুষিত কদাকার! কুমিল্লা, চাঁদপুর হয়ে পীরগঞ্জের জেলেপল্লী থেকে উঠে আসা মানুষের আবারো সেই হাহাকার মাঝে এতটাই বেদনায় ভাসি যে, কবি নির্মলেন্দু গুনের কবিতার কাছে কেবলই ফিরে ফিরে আসিঃ "স্বাধীনতা পেলে আমরা পরাধীন হতে ভালোবাসি"!

    (লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

    পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close