• মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৪ কার্তিক ১৪২৮
  • ||

রোকনুদ্দিনের গলিত লাশ ও নির্মম ব্যাধি

প্রকাশ:  ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫ | আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৮
বিপুল হাসান

আশি বছর বয়সী বুয়েটের সাবেক শিক্ষক রোকনুদ্দিন আহমেদের অর্ধগলিত লাশের গন্ধ পাচ্ছি নাকে। হৃদয় বিদারক ও শিউরে ওঠার মতোই ঘটনা! কি আছে রহস্যের নেপথ্যে? হতভাগ্য ওই শিক্ষকের চল্লিশ বছর বয়সি ছেলে শাহরিয়ার রূপম পাশের রুমে থেকেও দুদিন ধরে কেন টের পাবে না বাবার মৃত্যু! রোকনুদ্দিনের স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন যতো অসুস্থই হোন না কেন, মৃত স্বামীর পাশে কিভাবে দুদিন ধরে শুয়ে ছিলেন? কেনোইবা গলিত লাশের পাশে অচেতন অবস্থায় তাকে পাওয়া গেল!

মিস্টিরিয়াস কাহিনীর অনুরাগী আমি এ ধরনের ঘটনাগুলো নিজের জন্য নিজের মতো করে ব্যাখ্যার চেষ্টা করি প্রায়ই।এ আমার একধরনের শখ। সেই আগ্রহ থেকেই নানা উৎসে তিন সদস্যের ওই পরিবারটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। পল্লবীর নয়তলা আবাসিক ভবনের পাঁচটি ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন রোকনুদ্দিন আহমেদ (ল্যান্ড ওনার)। তিনি স্ত্রী নিলুফার ও ছেলে রূপমকে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন, বাকি চারটি ভাড়া দেওয়া। ওই ভবনে বাস করা কোনো পরিবারের সঙ্গে এমনকি ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল না। রোকনুদ্দিন বাসা থেকে খুব কমই বের হতেন। তার স্ত্রীকে কেউ কখনো বাইরে বের হতে দেখেনি। শিক্ষক নাকি তার ছেলে রূপমকেও বাইরে যেতে দিতেন না।

ওই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত একজনের কাছ থেকে জানতে পারি, রোকনুদ্দিনের সন্তান ছিল মোট পাঁচ জন, দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। এরমধ্যে বড় ছেলে ১৯৯৫ সালে রহস্যজনকভাবে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় (ফুড পয়জনিং) মারা যায়। এরপর থেকে ওই শিক্ষক পাল্টে যাওয়া শুরু করেন। রোকনুদ্দিন ধারনা করেন, তার বড় ছেলেকে বিষপ্রয়োগে মারা হয়েছে। একসময় আশঙ্কা করতে শুরু করেন, পর্যায়ক্রমে তাকে ও তার ছোট ছেলেকেও মেরে ফেলা হবে। সবাইকে তিনি সন্দেহ করতেন, এমনকি নিজের আপন তিন মেয়েকেও (বিবাহিত)। বাবার বাড়ির দরোজা তাদের জন্য বন্ধ ছিল। কারণ ওই শিক্ষক এতটাই বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে ভাবতেন, সম্পত্তির জন্য মেয়েরা চক্রান্ত করে তাদের মেরে ফেলতে পারে। বিশ বছর ধরেই তিন মেয়ের কারো সঙ্গে পরিবারটির যোগাযোগ ছিল না।

যিনি আমাকে এসব তথ্য দিয়েছেন, তিনি হলেন রোকনুদ্দিনের হতভাগ্য এক মেয়ের সন্তান। সঙ্গত কারণেই তার পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে ছেলের অনুরোধ ছিল, তার মায়ের এ বেদনার ঘটনাটি যেন পত্রিকাতে না যায়। কিন্তু বলতে না পারার অস্বস্তি কাটাতেই বিষয়টি ফেসবুকে তুলে ধরা।

এ রহস্যের (অপরিণত ও ব্যক্তিগত) বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেল, মিরপুরের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়র দুই বোন সেই রিতা-মিতার কথা। এদের সঙ্গে রোকনুদ্দিনের পরিবারের ঘটনাটির কিছু মিল পাই। আমি অনেকটাই নিশ্চিত ওই পরিবারের তিন সদস্যই সিজোফ্রেনিয়া কিংবা ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত। প্রথমে আক্রান্ত হন ওই শিক্ষক, পরে স্ত্রী ও ছেলে। ভয়ংকর এই দুই মানসিক ব্যাধির ধরণই হচ্ছে, রোগীর ঘণিষ্ঠরাও প্রভাবিত হয় এবং ধীরে ধীরে তারাও আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

পাদটিকা : মনের গোপন ঘরে কোনো সাপ নিজের অজান্তে লালন করছি কিনা জানি না। কম-বেশি মানসিক জটিলতায় কখনো না কখনো আমরা সবাই পড়েছি। ছোট ছোট জটিলতাই তো দলবেঁধে মনের অসুখ তৈরি করে। উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা, ওথেলো সিনড্রোম বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো ভয়াবহ মনের ব্যাধির বিষমুক্ত রেখে যেন কবরে নেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

বিপুল হাসান,লাশ,রোকনুদ্দিন আহমেদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close