• রোববার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||

চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ, রেখে গেলেন মাধুকরী

প্রকাশ:  ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:৩৬
ফিদা হাসান রিসলু

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব গুহ চলে গেলেন অনেকটা পরিণত বয়সেই। সেই যে তারুণ্য-যৌবনের দিনগুলিতে তাঁর লেখা অববাহিকা, জংগলমহল, কোয়েলের কাছে, একটু উষ্ণতার জন্য, সুখের কাছে, কোজাগর'সহ যেসব বই আমাদেরকে প্রাণিত করতো, তারমধ্যে মাধুকরী বোধহয় নানাকারণেই সাড়া জাগিয়েছিল। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন- একবিংশ শতাব্দীর নারী-পুরুষদের জন্যে।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দেড়দশক জুড়ে আমাদের ভূবনে দ্রোহ আর প্রেমের প্রতিভু হিসাবে নব্বইয়ের ছাত্র-গনঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর ছাত্তার টিংকু ছিলেন পঠন আর পাঠনে সকলের প্রিয়বরেষু। আর্থ-সামাজিক-রাজনীতির পাশে জীবন আর জগতের সাথে মানবিক বোধনের সম্পৃক্তির শোধনে উপন্যাস আর কবিতার ক্ষেত্রেও তার প্রেষণা ছিল অপ্রতিরোধ্য। বোধ্য-অবোধ্যের সীমা ছাড়িয়ে আদিগন্ত বিস্তৃত তার পেখমের পাখনায় বুদ্ধদেব গুহ'র মাধুকরী ছিল-অন্যতম দ্যোতনা। এই বইটি তিনি এতটাই মনোনিবেশে নিয়েছিলেন যে, ছত্রে ছত্রে উদ্ধৃত চরিত্রের বিবিধ ভাবনা ছড়িয়ে দিতেন- প্রমথেশের বেগে। মাধুকরী উপন্যাসের পৃথু ঘোষের ভেতর-বাহিরের অন্তর-গভীর দৃশ্যমান ছিল যেন-বা তাঁর সর্বাংগের কাছে। পৃথু ঘোষ যেমন করে চাইতেন- বাঘের মতন স্বয়ংম্ভর বেঁচে থাকতে, তিনিও যে সেরকম চাইতেন-বিধায়; বনজংগলের ছায়াতলে গাছ-গাছালি আর পশু-পাখি থেকে পোকা-মাকড়ের দ্বারে দ্বারে মানুষের আদলে সদৃশ্য সাজাতেন সদায়- ঝর ঝর বৃষ্টির বিভাবরী আঙ্গিনায়। সমাজ-রাজনীতির ছেঁড়াফাটা শামিয়ানার নীচে বইয়ের বিলেতফেরত ইঞ্জিনিয়ার- পৃথু ঘোষের কাছ থেকে অনর্গল বলতে শুনি তাইতো তাঁকেঃ

সম্পর্কিত খবর

    "জীবিকার জন্যে শতকরা নিরানব্বইভাগ মানুষ যা করে, তা করতে ভালো লাগে না তাদের কারোরই। তবু করতে হবে; সকাল থেকে রাত, দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর, যৌবন থেকে মৃত্যুদিন অবধি"।

    ভালো না লাগার এইসব অনিচ্ছাকৃত গেলা'র মাঝে মানুষ তাইবুঝি পরিপূর্ণতা পায় না অপর মানুষের কাছে। আপোষের অস্তাচলে অবিরত হেলে-দুলে ঘূর্ণিত জীবন তার হেরা-জেতার একাকারে ফিরে আসে ভিন্ন ভিন্ন দুয়ারেঃ

    "জীবনে প্রত্যেক মানুষকেই কোনো না কোনো পরীক্ষাতে হারতেই হয়- অন্য প্রতিযোগীর কাছে। সব পরীক্ষা শুধু যোগ্যতা দিয়ে পাশ করা যায় না। যোগ্যতা, চেষ্টা এসবের বাইরেও একটা ফ্যাক্টর থাকে। হয়ত বা একাধিকও। সব পরীক্ষাতে জিতবো বলে যে মানুষ পণ করে আসে, এখানে সেই বোকা জেদীর কপালে অনেকটাই দুঃখ থাকে। তবুও হারতে কারই-বা না দুঃখ হয়। যে হেরে যায়, তার পক্ষে হারটা স্বীকার না করে উপায় থাকে না। তবুও..."

    তবুও'র সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাধুকরী'র দুয়ারে এসে কপাট মেলে দেখিঃ উপন্যাসের গাত্রে গাত্রে থাকে একধরণের সোস্যাল ডিসকাশন।

    নারী-পুরুষের মনোবিশ্লেষণে সামাজিকায়নের বিবিধ আয়নে উঠে আসার সেইসব ঘটন-অঘটনের সাথে মানবিক বোধনের সম্পৃক্ততার পেষণ-তোষণ এতটাই প্রকট যে- চাইলেই বাঁচা যায় না সেখানে- বাঘের মত করে। তাইবুঝি ইংরেজীর তুখোড় ছাত্রী এবং নিজ আলয়ে গোছানো-গায়ত্রী স্ত্রী-রুষা আর ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে অনেক দূরের হাটচন্দ্রা গ্রামের সেই জংগল আর নদীর তীরে বিদেশী কোম্পানীর ম্যানেজার পৃথু ঘোষকে দেখিঃ প্রকৃতির নিবির সান্নিধ্যে গাছপালা আর পশুপাখির মাঝে নিচু শ্রেণির মানুষদের সাথে বহমান এক বোহেমিয়ানের প্রতিচ্ছবি। সেখানে পাড়ে, ঠুঠা, শামীম, দিগা আর বিজলীদের সাথে 'পাগলা ঘোষসা'য় অভিহিত-পৃথু ঘোষ কবিতার কাছে যেমনকরে প্রণিত, পাখির কাছেও তেমনকরে বর্ণিত। কোন পাতা কেমনে ডাকে, কোন পশু কিভাবে হাঁকে, কোন পোকা কোথায় সোঁকে; জোঁকের গায়ে দিয়ে-লবন, বাঘ তাড়ানীর আগুনি লগনের বিবিধ বাঁধনে তবুও কেন রুষা'র পাশে কুর্চি' এসে বুকের ভেতরে চেপে বসে!

    "চোখ তো কতই দেখে, দেখল- এই জীবনে, কিন্তু চোখে যা পড়ে তার সবই কি মনে ধরে? মনে যে বড়ই কম আঁটে! লক্ষে হয়ত একজনকেই মনে ধরে কী ধরে না"!

    তবুও যাঁকে ধরলো মনে, সে-ও কী আসে সবটুকু-প্রাণে! ছোটবেলা থেকে চেয়ে আসা কুর্চি'কে কাকাতো-বোনের সম্পৃক্ততায় আর অল্পশিক্ষার অস্পৃশ্যতায় বিয়ে করতে না পারার পরেও যখন মনের যতনে অবিরত বয়, তখনো কিন্তু একেবারেই নয়-সে সম্পূর্ণতায় সর্বোদয়।

    "কাউকে সম্পূর্ণতায় পেতে চাওয়ার ভাবনাটাই হয়ত ভুল। একান্ত করে আজকের মানুষ কেউই কাউকে নিতে বা দিতে পারে না। নিজেদের টুকরো করে টুকরো-টাকরাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে চকলেটের মত তুলে দেয় বোধহয়"।

    ওদিকে পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে দিনে ও রাতে কতই না গোপনের দেয়া নেয়া চলে। ঘটে যায় ছিঁচকে চুরি, দশ্যুবৃত্তি কিংবা ডাকাতি- কতটুকুই বা নিজেদের চোখে পড়ে! বন-জংগলের আপনে-পৃথু'র নির্বাসিত যাপনে রুষা তাই বিত্তশালী ভিনোদের প্রেমে পড়ে। নির্জন ঝর্ণার পাশে বিত্তের বাতাসী বিহারে ভেসে যায়-ওরা একে-অপরে। প্রস্ফুটিত পদ্মের নব্য সে তীরে রুষা'র তিমিরে আলোর আবির ঝ'রে ঝ'রে পড়ে। নীড়ে ফিরেও তাই বিছানার আশনাই'য়ে পৃথু-রুষা'র দেয়া-নেয়ার পাল্লায় নিক্তির উঠা-নামার হিসেবে এলোঃ ''আমার হয়ে গেছে, তোমার হলে ব'লো!"

    পৃথু একথা জানে যে, "সৌন্দর্যের বুকের মধ্যেও অসৌন্দর্য থাকে। আর যা অসুন্দর বলে মনে হয়, তার মধ্যেও সৌন্দর্য থাকে"।

    জানার সাথে তাই চেনাগুলিকে মিলিয়ে নিয়ে তাদেরকেই বরং এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে পৃথু যায়- কুর্চির ঠিকানায়। সেখানে তার স্বামী-ভেটু গাঁজার চালান পাচার করতে নিয়ে ধরা-পড়ে গিয়ে পনের বছরের জেলে-বন্দি কয়েদি। তবুও কুর্চি ফিরিয়ে দেয় তাঁকে এবং হারিয়ে যায়- অন্যত্র কোনোখানে। এদিকে জংগলে ডাকাত ধরতে গিয়ে সর্দারকে গুলি করে হত্যা করতে পারলেও একটি পা হারিয়ে মাসকয়েক হাসপাতালে কাটিয়ে বাড়ি ফিরে দেখে-সেঃ ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে রুষা চলে গেছে ভিনোদের কাছে। পাছে ফিরে দেখা চোখে পৃথু গিয়েছিল যতদূর- কুর্চির পাশে; রুষা'ও ততদূর গিয়েছে সরিয়ে ভুষদের সাথে। সাথে আর পাশের এমনি মনোস্তাত্ত্বিক অধিবাসে অতিবাহিত ভূবন জুড়ে বুদ্ধদেব গুহ'র এইসব জীবনের কুহক- আধুনিকতার সাথে অরণ্যের স্বাধীনতা মিশে সামাজিক দ্যুতকের নানান উঠানামায় অসংখ্য চরিত্রের বাতাবরণে বাঘের মতন বেঁচে থাকবার অভিপ্সায় মানবিক তৃষ্ণার প্রসারিত পিয়াসা জাগায়। জাগরিত সে ভূবনে ব্যাপ্তির বিশালতা আর ভাবনার সচলতায় বুদ্ধদেব গুহ'র অনবদ্য ভাষায় শেষপর্যন্ত মাধুকরী' শব্দের অর্থ দাঁড়ায়-এরকম কোন মানুষের পক্ষেই বাঘের মত বেঁচে থাকা সম্ভব নয়; সেরকম স্বয়ংম্ভর বেঁচে থাকা। প্রত্যেকটি নারী এবং পুরুষকে অপর কোন নারী, পুরুষ কিংবা শিশুর হৃদয়ের দ্বারে-দ্বারে ঘুরে-ঘুরেই বেঁচে থাকতে হয়। প্রীতি-প্রেম, কাম-অপত্য, ভক্তি-শ্রদ্ধা, ঘৃণা-বৈরিতা, ক্রোধ-সমবেদনা এমনকি উদাসিন্যের বোধগুলিকেও দেওয়ালীর রাতের অসংখ্য প্রদীপের কম্পমান শিখার মত অনুভূতির দ্বিধাগ্রস্ত আংগুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে জীবনকে পরিক্রমণ করে যেতে হয়। এই পরিক্রমারই আরেক নামঃ মাধুকরী।

    (ফেসবুক থেকে নেওয়া)

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close