• শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||

ভালোবাসার শিক্ষা

প্রকাশ:  ০২ আগস্ট ২০২১, ১৭:৩৫
মাহবুবর রহমান
মাহবুবর রহমান

রবিউলের যে জিনিসটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল সেটা ওর হাসি। দিলখোলা প্রশান্ত হাসি। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা দাঁতের ঝকঝকে হাসি। কোথায় যেন পড়েছিলাম, সাদা দাঁতের ঝকঝকে হাসির মানুষদের অন্তরও সাদা হয়। এই তত্ত্বের কারণে কিনা জানি না, কালো ঝাঁকরা চুলের রবিউলকে আমার ভালো লেগেছিল।

সে এসেছিল বগুড়া শহর থেকে। ‘বগুড়া মানে–বগুড়ার দই’–একথা বলতেই ববিউল প্রশান্ত হাসি উপহার দিল।

-স্যার ডায়াবেটিস থাকায় দই খেতে পারি না। কিন্তু আপনার জন্য বগুড়ার দই আজ থেকে ফিক্স করে ফেললাম!

নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সংশোধন করলাম– ‘আরে না না, ওটা এমনি বলেছি। আমিও দই খাই না। ছোটোবেলায় আমার নানীর হাতে আখের গুঁড় আর কাঁচা দই দিয়ে অনেকদিন পান্তা খেয়েছি। সেই স্মৃতি আজো জ্বলজ্বল করছে!’

–আপনার নানী বেঁচে আছেন স্যার?

–নাহ্। প্রায় দুই যুগ পার হয়ে গেল তিনি চলে গেছেন।

হঠাৎ দূরলোকে আমার নানীর স্নিগ্ধ সৌম্য মুখখানি ভেসে উঠলো। কতদিন আমাকে বুকে আগলে রেখে গভীর মমতায় ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। আজ তিনি নিজেই এক অসীম ঘুমে নিমগ্ন হয়ে আছেন।

একটা বেসরকারী ব্যাংকের কর্মকর্তা রবিউল। বগুড়াতেই থাকে। উচ্চ রক্তচাপ আর ডায়াবেটিস নিয়ে সমস্যায় আছে। আমি যথাসম্ভব চিকিৎসাপত্র দিয়ে ছেড়ে দিলাম। বগুড়া শহরে অনেক ভালো ডাক্তার আছেন । বললাম ওখানেই ফলো আপ করাতে।

যথারীতি বগুড়ায় ফিরে গিয়ে আমাকে সে ফোন দেয়। মেসেজ পাঠায়। আমিও যথাসম্ভব ফোন ধরি, জবাব দেবার চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে তার সাথে একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠলো। রবিউল মাঝে মধ্যে অন্য রোগীও আমার কাছে পাঠায়। আমি দেখে দিই। ধন্যবাদ জানাই।

দু’মাস পার হতেই হাতে দইয়ের হাড়ি নিয়ে রবিউল আমার চেম্বারে হাজির। আমি জানতাম সে হয়ত এই কাজ করবে। আমি মুখে মৃদু ভর্ৎসনা করে ( মনে মনে খুশি হয়ে ) এধরণের কাজ আর না করার আদেশ জারি করলাম। রবিউল তার ঝকঝকে সাদা দাঁতের সদা প্রশান্ত হাসি হেসে আমার সামনে বসে পড়লো।

এমন আন্তরিক ভালোবাসা কয়জনের কপালে জোটে এই ভেবে মনে মনে নিজের প্রশস্ত কপালের তারিফ করলাম। রবিউল ধীরে ধীরে তার পরিবারের সব বিষয়ে আমার সঙ্গে শেয়ার করা শুরু করলো।

অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কটি পেশার গন্ডির ভেতরেই রাখা উচিত । তাই আমি যতই ফরমাল হতে চাই রবিউল ততই নন-ফরমাল হতে চায়।

যাই হোক তার পারিবারিক বিষয়ে যতটুকু পরামর্শ দেয়া শোভন সেভাবে তাকে বলে বিদায় করলাম।

কিন্তু চাইলেই সব বিদায় করা যায় না। রবিউল তার বিনম্র চাহনি আর ঝকঝকে সাদা দাঁতের হাসি দিয়ে আমাকে জয় করে চললো।

রবিউল তার আনন্দের কথা শেয়ার করে। প্রোমোশন হবার কথা জানায়। আমি খুশি হই। আবার কষ্টের কথা জানায়। তার বৃদ্ধ বাবা মারা যান। আমি দুঃখ প্রকাশ করি।

একদিন খুব ভোরে রবিউলের ফোন পেলাম। সে গাড়ি দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। আমি শুনে আতঙ্কিত হলাম। কী হয় না হয় ! বেচারা রবিউল।

আমি পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করে রবিউলের উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য অনুরোধ করলাম। কিন্তু তারপরেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না।

সাধারণত বাসাতেই লাঞ্চ করি। সেদিন হাসপাতালেই করলাম। তারপর আমার হাসপাতাল থেকে সোজা ঢাকা মেডিকেলে রওনা দিলাম।

সায়েন্সল্যাব এর সিগনালে সবুজ বাতি জ্বলছে। কিন্তু ট্র্যাফিক মামার হস্তচালিত অঙ্গুলির ইশায় সব গাড়ি লাল বাতির সাজা ভোগ করছে। সারা ঢাকা শহরে একই চিত্র। ফি বছর গরীব জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাল সবুজের স্বয়ংক্রিয় বাতি কিনছেন আর সিগনাল দিচ্ছেন হস্তচালিত! আবার ওদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের গপ্প অনবরত ঝেড়ে চলেছেন। সবার প্রিয় মাল বাবাজি বোধ হয় এটাকেই বলেছেন ‘ রাবিশ’!

ঢাকা কলেজের উল্টোদিকের হকার্স মার্কেট দেখে পুরান দিনের কথা মনে পড়লো। তখন কেবল নতুন চাকরিতে ঢুকেছি। উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যস্ত থাকায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস নেই। চাকরির বেতনে চাল ডাল শাকসব্জি আর বড় জোর কাচকি মাছ কেনা যেত। সেই কাচকির যুগে ঈদ ছিল পশ্চাৎদেশে বিষফোঁড়া। ছাত্রযুগে কাউকে কিছু দেবার দায় ছিল না। কিন্তু এখন তুমি চাকরিযুগের ডাক্তার। সবাই তো আশা করতেই পারে। তাই সরকার বাহাদুরের দেয়া ২৮৫০ টাকার ঈদের বোনাস হাতে নিয়ে বড় জোর হকার্স মার্কেট পর্যন্ত আসতে পারতাম। মনে মনে হকার্স মার্কেটকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিউমার্কেট বরাবর নীলক্ষেতে পৌঁছে গেলাম। এখানে এলেই মনটা চনমন করে ওঠে। স্মৃতির পাখিরা হঠাৎ ডানা মেলে নীল আকাশে উড়াল দিতে চায়। নীলক্ষেতের পুরাতন বইয়ের দোকানগুলো কৈশোর প্রেমের মত বুকে চিনচিনে ব্যথার বিউগল বাজায়। কত কত গল্পের বই, প্রেমের উপন্যাস, সমাজবিপ্লবের কত বই, এমনকি ‘রেপিড ইংলিশ স্পীকিং কোর্স’,- এসব বইও কিনতাম। সবশেষে লালসালু পরা মোটা মোটা ডেকচির গরম গরম দু’টাকার বিরানী । যেন অমৃত!

ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডের এক কোনায় দেখি রবিউলের বিমর্ষ মুখ। অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে দেখে তার চোখমুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তার সেই ঝকঝকে সাদা দাঁতের প্রশান্ত হাসি আরো বিস্তৃত হয়ে আমাকে মুগ্ধ করলো। সে তার প্লাস্টার করা ভাঙ্গা পা নিয়ে পারলে এখনি উঠে বসে পড়ে অবস্থা। আমি তাকে নিবৃত্ত করে শান্ত হতে বললাম। সে কখনো ভাবেনি যে, এত ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে আমি তার কাছে যাবো।

যাই হোক কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স সবাইকে রবিউলের যথাসাধ্য সেবা করার অনুরোধ জানালাম। ডাক্তার হিসেবে তারা সমাদর করলো। তারপর ওষুধপত্র , পথ্য কেনার জন্য কিছু টাকা উপহার হিসেবে রবিউলের হাতে জোর করে গুঁজে দিয়ে ফিরে এলাম।

মেডিকেল থেকে বেরিয়ে শহীদ মিনারের সামনে আসতেই বুকটা হুহু করে উঠলো। কতদিন, কত বিকেল, কত সুখময় স্মৃতির ফুল এখানে ফুটেছিল। ফুলের সেই পাপড়িগুলো আজ কোথায়?

হাসপাতাল থেকে ছুটি নেবার কিছুদিন পর রবিউল তার নম্বর থেকে আমাকে ফোন দিল।

-স্যার আমার ক্ষেতের তাজা তরিতরকারী আপনাকে পাঠাচ্ছি। কুরিয়ার সার্ভিসে। বগুড়ার সরু চাল খুব সুস্বাদু ভাত হয়, বন্ধুর দোকান থেকে দুই বস্তা নাজিরশাইল চাল পাঠালাম। ঢাকায় কী সব ভেজাল খান না খান। আপনি না বইলবেন না!

আমি যতই না না করি সে ততই হা হা করে। নাছোড়বান্দা।

একটু পরেই দেখি দাম পরিশোধের জন্য সে একটা বিকাশ নম্বর মেসেজ করে পাঠিয়েছে।

আমি বিব্রত হয়ে তার নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশ করে পাঠিয়ে দিলাম। ভাবলাম অসুস্থ , পা ভাঙ্গা মানুষ , তারপরও সে কত আন্তরিক !

কিন্তু দু’দিন যায় , পাঁচদিন যায় তার পাঠানো কুরিয়ার আর আসে না। তার নম্বরে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

ভেতরে একটা অস্বস্তি নিয়ে ব্যাপারটা ভুলে যেতে চেষ্টা করলাম।

কিছুদিনের জন্য আবার কাজের নীচে চাপা পড়ে গেলাম। রবিউলের কথাও বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ একটা ফোন কল পেয়ে মনটা বিগড়ে গেল।

সাধারণত অচেনা নম্বর থেকে আসা কোনো কল রিসিভ করি না। কিন্তু বার কয়েক রিং হওয়ায় কী মনে করে কলটি ধরলাম।

-হ্যালো।

-ডাক্তার সাব বলতিছেন?

-জ্বী বলুন।

-আমি ডেপুটি স্পিকারের অফিস থেকে বলতেছি। আগামী অক্টোবরে মাননীয় ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বে একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল ইউরোপ সফর কইরবেন। আপনাকে ঐ টীমের সদস্য করা হইয়েছে। আপনার কিছু কাগজপত্র লাগবে।

এই খবর শুনিয়া আমার যারপরনাই খুশি হইবার কথা ছিল। কিন্তু মাথার মধ্যে খটকা লাগিল। আমি কী এমন পুণ্যির কাজ সম্পাদন করিলাম যে, স্বয়ং সার্বভৌম রাজদরবার পায়ে হাঁটিয়া আমার দরজায় ধুলা ঝাড়িতে আসিল?

নিজেকে সংযত করে ঠান্ডা গলায় বললাম, বলুন কী করতে হবে?

-আপনার পাসপোর্ট , চারকপি ছবি, দশ হাজার টাকার একটি পে অর্ডার ডেপুটি স্পিকার মহোদয়ের অফিসে পাঠিয়ে দিবেন।

আমি যারপরনাই ধন্যবাদ দিয়ে এবং অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফোন রেখে দিলাম। ইউরোপ ভ্রমণের লোভনীয় প্রস্তাবে হৃদয় প্রীত না হয়ে খচখচ করতে শুরু করলো। কারণ ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠটি অত্যন্ত পরিচিত।

মনকে প্রবোধ দিলাম এই বলে যে, আমিই বোধ হয় ভুল শুনেছি। হয়ত এই কণ্ঠ তার নয়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে শিখেছি–ক্ষমা করেছি, কিন্তু ভুলিনি।

শরৎচন্দ্রের কাছে শিখেছি–অবিশ্বাস করে জেতার চেয়ে বিশ্বাস করে ঠকাও ভালো।

আমি কি ঠিক শিখেছি?

লেখক: সিনিয়র কনসালটেন্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

মাহবুবর রহমান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close