• রোববার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮
  • ||

প্রমাণ করুন আপনি বন্ধু না শোষক

প্রকাশ:  ১৬ এপ্রিল ২০২১, ১৭:০৯
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
এবিএম জাকিরুল হক টিটন

তার সাথে বন্ধুত্ব করবেন যে আপনার সুখের দিনে এসে চা খেয়ে যাবে আর দুঃখের দিনে আপনাকে চা খাওয়ার দাওয়াত দেবে। ওয়ান সাইডেড লাভ করবেন না। মানুষের সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক ও হুবহু তাই। আমার সুখের দিনে আমার থেকে লাভে ব্যাবসা করবে, আমার দুঃখের দিনে লাভ করবে না। উপরন্তু যদি পারে আমাকে সাহায্য করবে যাতে আমি দুঃখের দিন কাটিয়ে উঠতে পারি।

সাধারণ মানুষকে ব্যবসায়ীদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার দরকার আছে। তারা আমাদের কাছে পণ্য, সেবা বিক্রি করে, কর্মসংস্থান করে। আবার সাধারণ মানুষকে ব্যবসায়ীদের দরকার আছে। কারণ তারা না থাকলে কার কাছে পণ্য বিক্রি করবে আর কার সেবা করবে?

অগুনতি বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, টেলিফোন কোম্পানি, ইত্যাদি আমাদের কাছে লাভে সেবা বিক্রি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে। আমাদের টাকা দিয়ে তারা প্রাসাদ বানায়, কোটি টাকার গাড়ি চড়ে, বিদেশে বাড়ি করে, আমাদের টাকার উপর তারা ঘুমায়। বিনামূল্যে একটা গাছের পাতা ও ডাইনে থেকে বায়ে নেয় না কেউ বাংলাদেশে। ফেলো কড়ি, মাখো তেল।

ব্যবসায়ীরা ব্যাবসার নামের পাশে বাহারি ট্যাগ লাগায় - কাছাকাছি আছি, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী, আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু, সেবায় সদা জাগ্রত, যেন মায়ের কোল, যত দূরে যান আছি, দু'জনে দু'জনার, নির্ভরতার প্রতীক, সিনার লগে বান্দি রাইক্কুম তোঁয়ারে, আরো কতো কী! ব্যাবসার লোগো বানায় - আপনার মাথায় ছাতা, ঘরের চাল, আপনাকে তাদের বুকের মাঝে লুকিয়ে রেখেছেন, এমন সব ছবি দিয়ে। আজকে আছেন কেউ পাশে করোনার এই দুর্দিনে? প্রশ্ন করুন আজ তারা কোথায়?

উন্নত বিশ্ব আলাদিনের চেরাগের দৈত্য বানিয়ে দেয়নি। মানুষ বানিয়েছে। উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাক্তি সবাই যে যেভাবে পারছেন সাহায্য করছেন এখন। এরা সারাবছর ধরেও সাহায্য করে, অন্যকে সাহায্য করতে উৎসাহীত করে। অন্যকে কিভাবে উৎসাহিত করে শুনবেন? একটা বলি। কর্মচারী যদি ১ টাকা কোনো রেজিস্টার্ড চ্যারিটিতে দান করে, মালিক ঠিক সমান অংকের টাকা তার সাথে যোগ করে দেয়। বুর্জোয়া ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার পরও।

অবাক হয়ে যাবেন এদের কান্ডকারখানা দেখে। উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না কে কে কত কত টাকা করোনা রিলিফ ফান্ডে দিয়েছে, মানবতার সেবায় এরা কিভাবে এগিয়ে এসেছে। কানাডার ৪টা টেলিফোন কোম্পানির এখন পর্যন্ত মোটাদাগের ডোনেশান দিয়েছে। স অয়ার্লেস ১০ লাখ ডলার, বেল ৫০ লাখ ডলার, রজার্স ৬ কোটি ডলার, টেলাস ১৫ কোটি ডলার রিলিফ ফান্ডে দিয়েছে।

এগুলো হলো ডাইরেক্ট থোক ডোনেশান। এর বাইরে লং ডিস্টেন্স কল, রোমিং চার্জ, অতিরিক্ত ডাটা খরচের জন্য চার্জ ইত্যাদি বাতিল, প্রতিটা কল (কত টাকার কল না, কয়টা কল) থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ বিভিন্ন চ্যারিটিতে দান করছেন এরা।

এবার আসি ব্যাংকের কাছে। ৭ টা বড় ব্যাংক বলেছে ৬ মাস বাড়ির লোনের কোনো কিস্তি দিতে হবে না। ৬ মাস পর থেকে দিবেন যখন, তখন এই ৬ মাসের সুদ দিতে হবে না। এর বাইরে এই ৭ টা ব্যাংক ডোনেট করেছে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিভিন্ন ফুড ব্যাংক, রেডক্রস, ইউনাইটেড ওয়ে, মি টু উই, মিল অন দ্যা হুইল, সহ যত আর্ত মানবতার সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান আছে, সব প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ ডলার ডোনেট করছে সেটা নাই বা বললাম (বেশীরভাগ ১০ লাখের উপরে)।

বীমা কোম্পানি বসে নেই। এখন মানুষের সেবা করার প্রতিযোগিতা। প্রতিটা কোম্পানি তাদের সাধ্যের মধ্যে সব করছে। কিছু সরাসরি অর্থ ডোনেশান আর কিছু ইন্ডাইরেক্টলি সাহায্য। সরাসরি যা ডোনেট করছে তা লাখ লাখ ডলার। লিস্ট করে শেষ করা যাবে না।

আমার এক বন্ধু যে কোম্পানিতে কাজ করে তারা ৭০ লাখ ডলার ডোনেট করেছে রিলিফ ফান্ডে আজ পর্যন্ত। অন্য সবাই ও করছে। এরা সারাবছর করে। এর বাইরে যে কাজটা করছে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ী ব্যাবহৃত হচ্ছে সীমিত, অনেক মিল কারখানা বন্ধ। আর তাই ঝুঁকি ও অনেক কম। ইন্সুইরেন্সের প্রিমিয়ার নেওয়াই হয় ঝুঁকির হিসেব করে। ঝুঁকি কম হলে প্রিমিয়াম কেন ফেরত পাবে না বীমা গ্রহীতা? তাই বীমা কোম্পানি ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম ১৫% থেকে ৭৫% পর্যন্ত ফেরত দিয়েছে এবং তা চালু আছে।

যারা ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম দিতে পারছেন না, তা মওকুফ, পিছানো বা এডজাস্ট করে দিচ্ছে। প্রতিটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রায়ই একই কাজ করছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, মুদি দোকান, রেস্টুরেন্টে, কেউই পিছিয়ে নেই কারো থেকে। ফাস্টফুডের চেইন (সাব ওয়ে) দশ লাখ ডলার দিয়েছে কোভিড ফান্ডে। উপরে যা বললাম তা মোট কত কোটি ডলার হিসাব করে দেখুন, এর বাইরে যা আছে বা যা খুঁজলে বের করা যাবে, তা আরো কত কোটি ডলারের হবে এই মূহুর্তে বলা মুসকিল। আর তাদের এই দান চলমান।

বাংলাদেশের টেলিফোন কোম্পানি যদি এ মুহূর্তে এমন উল্লেখযোগ্য কিছু না করে, তাহলে একযোগে, গণহারে তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করে দিয়ে সরকারি ফোন কোম্পানিতে চলে যান। ৫০০ জনকে ১০ কেজি করে চাল দিয়েছে এমন ফকিন্নি দানের কথা যেন কেউ না বলেন বুক চিতিয়ে। করোনার প্রথম ঢেউ এ কে কি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে সেটা সবার জানা।

বীমা কোম্পানিকে বলেন, আমাদের প্রিমিয়াম ফেরত দাও কারণ আমার ফ্যাক্টরী বন্ধ, গাড়ি আগের চাইতে কম রাস্তায় নামে। আর তাই তোমাদের রিস্ক কমে গেছে যার জন্য তুমি আমার কাছ থেকে টাকা নাও। তারাও যদি এই দুর্দিনে গরীব মানুষের সাহায্যে না আসে, বলুন আপনি ওদের সাথে থাকবেন না আর।

বাংলাদেশের ব্যাংককে সাধারণ মানুষ বলতে পারবেন না (ব্যাংক মানবিক হলে পারতেন) কারণ তারা ব্যাংক থেকে লোন নেয়ার দলে, তাই দুর্বল। বড় বড় শিল্পপতি, ব্যাবসায়ীরা পারেন ইন্ডাইরেক্টলি সাহায্য করতে পারে গরিব মানুষকে এই দুর্দিনে। ব্যাংককে তারা বলতে পারেন, তুমি যদি গরিব মানুষকে এই দুর্দিনে সাহায্যে না করো তাহলে আমি আমার টাকা তুলে নেবো তোমাদের কাছ থেকে আর সব লেনদেন অন্য ব্যাংকে করবো।

ব্যাংকগুলো ও স্বেচ্ছায় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। টেলিফোন কোম্পানি, বাণিজ্যিক ব্যাংক, জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, বাড়ি নির্মাতা, গ্যাস সরবরাহ কোম্পানি, ওষুধ প্রস্তুতকারক, ইলেকট্রনিকস, ইলেক্ট্রিক্যালসহ সব কনজ্যুমার গুডস প্রস্তুতকারীদের এখনই সময় নিজেকে প্রমান করার আসলেই কি তারা জনগণের/গ্রাহকের বন্ধু (যেমনটি তারা দাবি করেন), নাকি শোষক।

জনগণও সঠিক বন্ধু চিনে রাখুক। শোষক কখনো বন্ধু হতে পারে না। তাদের বয়কট করা দরকার। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা,কর্পোরেট হাউসগুলো মুনাফা বোঝে,মানুষ বোঝেনা- সেবা বোঝেনা। সরকার সাধারন ছুটি বা লকডাউন ঘোষনা করলে প্রনোদনা খেতে এদের জিহ্বা লক লক করে। ৩০ বছর ব্যাবসা করে, সরকারি প্রণোদনা খেয়েও ১ মাসের বিনা শ্রমে মজুরী দিতে পারেনা এই মানসিক প্রতিবন্ধীরা! অথচ খোঁজ নিয়ে দেখুন একটা প্রতিষ্ঠান থেকে ১০টা প্রতিষ্ঠান বানিয়েছে, বিদেশে টাকা পাচার করেছে। করোনার প্রথম ঢেউ এ ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি প্রণোদনা খেল। জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ট্যাক্সের টাকায় সরকারের রাজস্ব আয় হয়, আর তার থেকে দেয়া হয় প্রণোদনা!

যারা ব্যাংক মালিক, তারাই ব্যাবসায়ী নেতা, তারাই মন্ত্রী, তারাই এমপি, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাবসায়ী সেজে প্রণোদনা খান (ওরে বাটপার)! সরকার প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর ও সার্ভিস চার্জ নেয় মনমতো কিন্তু বড়লোকের বা অতিধনীদের কাছ থেকে সম্পদকর বা প্রকৃত আয়করও নেয় না। ফলে দুর্ভোগ শেষ পর্যন্ত সেই গরুব, নিম্নমধ্যবিত্ত,মধ্যবিত্তদেরই। তাই সরকারকে বলছি লুন্ঠন পূজির পুজা বন্ধ করুন, গরিব বান্ধব বাজেট বানান। আপদ কালীন সহায়তা বাড়ান। মানুষকে শোষণ করার সুযোগ করে দেবেন না শোষককে। আমলাদের জবাব দিহিতার আওতায় আনুন, দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতাদের বর্জন করুন।

করোনা ফিরে এসেছে বহুগুণ শক্তিমত্তা ও জটিলতা নিয়ে। আগে কভিড হয়েছে বা টিকা নিয়েছেন এসব কথা বাদ দিন। সতর্ক হোন। মানুষ অন্য লোককে যত ঠকায়, মানুষ নিজেই নিজেকে তার চেয়ে বেশী ঠকায়।- গ্রিভিল।

করোনাকালে দেখলাম হাজারকোটি টাকার মালিকও কত অসহায়, কত অক্ষমতা তার। যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম কে বন্ধু, কে শত্রু বা শোষক। বিপদে যে পাশে দাঁড়ায়, সেই প্রকৃত বন্ধু। বাংলাদেশের মহাজনেরা আপনারা কি বন্ধু না বন্ধু বেশে শোষক?

ভালো থাকুন সবাই।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

এবিএম জাকিরুল হক টিটন: রাজনীতিবিদ, লেখক

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

এবিএম জাকিরুল হক টিটন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close