• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

আনিসুলের ‘বোন-বোন জামাই তাকে আঘাত করেন নাই, তার প্রমাণ কী’

প্রকাশ:  ২০ নভেম্বর ২০২০, ২০:৪৮
আবদুন নূর তুষার

সাধারণ কিছু কৌতূহল।

যারা জানেন তারা যদি বিষয়গুলি জানাতেন সবাইকে তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেতো।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার হাসপাতালে মৃত্যু শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, এটা প্রমাণ করে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রশাসকরা দিনের পর দিন অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কি ভঙ্গুর অবস্থায় এটাকে জোড়াতালি দিয়ে রেখেছেন। যদি মাইন্ড এইডে কাউকে পাঠানো অপরাধ হয়, তবে অনুমোদনহীন হাসপাতাল দিনের পর দিন যারা চালু রাখতে দিয়েছেন তারা কেন রিমান্ডে নাই?

১. পৃথিবীর কোন চিকিৎসাবিষয়ক বইয়ে তিন দিন ঘুম না হলে রোগীকে বাড়ির কাছে হাসপাতাল রেখে, সেখানে না নিয়ে, মানসিক হাসপাতালে গামছা দিয়ে হাত বেঁধে নিয়ে এসে কেবিন দেওয়ার জন্য চাপ দিতে বলা হয়েছে?

২. ঘুম হয় না এমন রোগীকে ঘুম পাড়ানোই মূল কাজ হওয়ার কথা। বোন ও বোন জামাই ডাক্তার। তারা রোগীকে ঘুম কীভাবে পাড়াতে হয় সেটা জানেন না? নাকি বগুড়া মেডিকেলে এই চ্যাপটার পড়ায় না?

৩. তিন দিন ঘুম না হলে রোগী লোকজনকে মারধর করে, ভায়োলেন্ট বা মারমুখী হয়ে যায়, এটা কোন রোগের লক্ষণ? কখন কখন এ রকম হয়?

৪. রোগীর ভাই সংবাদমাধ্যমে এমনকি ভিডিওতে বলেছেন, রোগীর প্রমোশন হয় নাই, ট্রেনিংয়ে না গিয়ে একটা শোকজ নোটিশ পেয়েছে, ইত্যাদি চাকরিসংক্রান্ত জটিলতার কথা। এটা যদি মানসিক চাপের কারণ হয় তবে এ জন্য কে দায়ী? তাকে মানসিক চাপ কে দিল?

৫. ঘুম না হওয়া রোগীকে ওয়ার্ডে রাখা যাবে না? কেবিন লাগবেই? মাইন্ড এইডে গিয়ে তার আত্মীয়রা নাকি ভালো করে যাচাই-বাছাই করেছেন। কোন ডাক্তার সেখানে যায়, দিনে দুবার সেখানে বিশেষজ্ঞ আসে, রোস্টার, কেবিন, এসি সব যাচাই করেছেন। এটা তো রোগীর ভাই পরিষ্কারভাবে বলেছেন অন ভিডিও। তাহলে তারা জেনেশুনে সন্তুষ্ট হয়ে রোগীকে কেবল কেবিন দেওয়ার জন্যই কি মাইন্ড এইডে গিয়েছিলেন। নিজেরা নিজ দায়িত্বে সরকারি টিকিটের ওপরে লিখিয়ে নিয়েছেন যে রোগী সরকারি হাসপাতালে থাকতে ইচ্ছুক না। তারপরেও দোষ কেন হবে ডা. মামুনের?

৬. ডা. মামুন সেখানে রোগী দেখেন। কমিশন পান । এসব অভিযোগের সঙ্গে রোগীর মৃত্যুর কি সম্পর্ক? যদি এই অভিযোগ সত্যও হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয় ডা. মামুন সেখানে কাউকে হত্যা করার জন্য পাঠান না। বলা হয়েছে যে গত কয়েক মাসে তিনি নাকি দশ লাখ টাকা কমিশন পেয়েছেন। এর আগে সব রোগী মেরে ফেলে তিনি এত টাকা কমিশন পেয়েছেন? এই অভিযোগের জন্য আলাদা আইন ও বিচার আছে। এটার জন্য রিমান্ডে নিতে হয়?

৭. যারা রোগীকে হাসপাতালে গামছা দিয়ে বেঁধে নিয়ে এনেছিলেন তারা তাকে কীভাবে হাত বেঁধেছিলেন? মাথায় হাত বুলিয়ে? তারা তাকে হাত বাঁধার সময় কোনো আঘাত যে করেন নাই, তার প্রমাণ কি?

৮. তিন দিন ঘুম না হলে দুই ডাক্তার, বোন ও বোন জামাই তাকে আরো লোকজন দিয়ে হাত বাঁধেন? রোগীর প্রতি এত নির্মম কেন তারা? তিন দিন ঘুম না হলে তাকে মানসিক হাসপাতালে রেখে দিয়ে যেতে আসেন তারা? কোন মেডিকেল বইতে তিন দিন ঘুম না হওয়া রোগী ভায়োলেন্ট হয় ও তাকে হাসপাতালে রাখতে হয় , সেটা বলা হয়েছে?

৯. রোগীর ভাই বলেছেন, রোগীর বাবা নাকি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। রোগীর বাবার বক্তব্য কই? তার স্ত্রীর বক্তব্য কই। সব জায়গায় তার বোন আর বোন জামাই কেন? রোগীর বাবা মাত্র তিন দিনে অসহ্য হয়ে তাকে হাসপাতালে নিতে বললেন? স্বাভাবিকভাবে ভাবেন। প্রথমে তাকে কোন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কথা। তারপর সাইকিয়াট্রিস্ট বললে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার কথা। সেটা না করে তারা একটা অস্বাভাবিক সময়ে, যখন আউটডোর বন্ধ, ইমারজেন্সিতে হাত বেঁধে রোগীকে মানসিক হাসপাতালে এনে কেবিনে রাখার জন্য চাপ দিলেন কেন?

১০. কারা, কী এমন মানসিক চাপ তাকে দিল যে, একজন মেধাবী পুলিশ অফিসার মানসিক ভারসাম্য হারাল? যারা তাকে এভাবে মানসিক অত্যাচার করল তারা কারা? তাদের শাস্তি কি?

১১. পুলিশ বাহিনীতে মানসিক ভারসাম্য হারানোর ঘটনা কি এটাই প্রথম? এই বাহিনীর হাসপাতালে দেশের আইন ভঙ্গ করে অবৈধভাবে চীন থেকে আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ আমদানি করা হয়, বিএমডিসির অনুমতি ছাড়া। একই ভাবে অনুমতিবিহীন অবৈধ ভারতীয় বিশেষজ্ঞ দিয়ে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প করার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। আর নিজেদের জন্য একজন দেশি মানসিক রোগের চিকিৎসকের চাকরির ব্যবস্থা করা যায় নাই গত পঞ্চাশ বছরে? এই কাজে যারা আছেন তাদের মানসিক ও শারীরিক চাপ অনেক বেশি। আর তাদের নিজেদের বেলায় নিজেদের এই অবহেলার জন্য কে দায়ী?

১২. সরকারি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য হোক আর ফৌজদারি অপরাধেই হোক, গ্রেপ্তার করার বিধি আছে। সেটা না মানার কী কারণ? জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য কি গ্রেপ্তার করা জরুরি। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী মামুন নাকি নিজেই সব বলে দিয়েছেন। তাহলে তাকে দুদিনের রিমান্ড কেন?

১৩. বিসিএস এ সবচেয়ে ভালো ফলাফল করা পুলিশের কর্মকর্তাদের একজন কী কারণে মানসিক রোগী হয়ে যায়? তার চিকিৎসা কেন তার পরিবারের একার দায় হবে? কেন পুলিশ কর্তৃপক্ষ নিজেরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে নাই? কেন এই অবস্থায়ও তিনি একটা শোকজ নোটিশও পেয়েছেন? নাকি তার অসুস্থতার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল?

১৪. প্রতিবছর পুলিশ কর্মকর্তাদের মানসিক অ্যাসেসমেন্ট কীভাবে হয়? কারা করে? এ রকম রোগী যদি থাকে আরো এবং তারা কোমরে পিস্তল নিয়ে ঘোরে?

এগুলো সাধারণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেলে অনেক কিছুই স্বচ্ছ হয়ে যেত।

কমিশন খাওয়া, প্রাইভেট প্র্যাকটিস এসবের সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক নাই। হত্যা হলো একটি উচ্চমাত্রার ফৌজদারি অপরাধ। যা দুভাবে হতে পারে। আত্মরক্ষার্থে অথবা কোনো মোটিভসহ উদ্দেশ্যমূলকভাবে। যার কোনোটাই ডা. মামুনের পক্ষে ঘটানো সম্ভব না।

আর যদি হত্যা দুর্ঘটনাজনিত হয় বা অন্য কারো হাতে হয় তবে যে সেখানে অনুপস্থিত তার ওপরে কোনোভাবেই দায় আসতে পারে না।

এ যেন আপনি একজনকে আপনার নিজের বাড়ির রাস্তা চিনিয়ে আসতে বললেন। পথে সে খোলা ম্যানহোলে পড়ে মারা গেল বা কারো সঙ্গে ধাক্কা লেগে বা কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ম্যানহোলে ফেলে দিল।

দোষ আপনার হলো। কারণ আপনি তাকে রাস্তা চিনিয়ে বাড়ি আসতে বলেছিলেন।

আমরা ক্রমেই যুক্তিহীন, সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি বিবর্জিত, ক্ষমতার দম্ভে দাম্ভিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, মাৎস্যন্যায়ের রাজত্বে পরিণত হচ্ছি।

এখানে মেধাবীরা নির্যাতিত। অপকর্মকারীরা সম্মানিত।

এখন বলতেই হবে...

ডাক্তার তুই পালিয়ে যা। এখানে তোর জায়গা না।

লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক

(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

আবদুন নূর তুষার
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close