• রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

আমি অনন্তকাল সন্তানদের মাঝে বাঁচতে চাই

প্রকাশ:  ১৬ নভেম্বর ২০২০, ১৩:০৫
ফারজানা ইসলাম লিনু

আজ থেকে দশ বছর আগের ঘটনা। আমার পুত্র সবে মাত্র দুই বছর পূর্ণ করেছে, কন্যারা আট, নয় বছরের। পুত্র কন্যাদের বাপ আর আমি হজে যাবো। আকস্মিক কোন সিদ্ধান্ত নয়। আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো।

হজ্জে যাওয়ার দিন যত ঘনিয়ে আসে আমার পেটের ভেতর মোচড়া মোচড়ি তত বাড়ে। দুর্বিষহ কষ্টের কথা বলতেও পারি না, সইতেও পারি না। মন খারাপের যাতনায় আমি কাতর, ভীষণ কাতর।

সে বছর হজ্জ ছিলো নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের কোন এক দিন আমাকে সিলেট ছাড়তে হবে। দু'দিন আগেই জানলাম ৩১ তারিখ ফ্লাইট।

যাত্রালগ্নে কুখ্যাত হৃদয়হীনা মায়ের অন্তর্জালা উথলে ওঠে। চোখের জল লুকানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ।

সুবহানিঘাট পয়েন্ট থেকে বাস ছাড়তেই দুই বছরের পুত্র টের পেয়ে যায় তার মা জানি কোথায় চলে যাচ্ছে।

মেঝো ভাইয়ের কোল থেকে চলন্ত বাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। মা........ আ পুত্রের গগনবিদারী আর্তচিৎকার বাতাসের বেগে এসে পরানে লাগে।

ইশ, কি হৃদয় বিদীর্ণ করা মুহুর্ত!! মনে হলে এখনো বুকের ভেতর ভয়ানক মোচড় দিয়ে উঠে।

সন্তানদের প্রতি তেলাতেলা মাতৃস্নেহের বহিঃপ্রকাশে আমি সদা সতর্ক।

এই অতি হিটলারি মনোভাব তখন আমাকে পীড়া দিচ্ছে বেশি। সন্তানদের গায়ের উষ্ণতা, চুলের ঘ্রাণ,মায়াভরা মুখ আমি মিস করছি, ভীষণ মিস করছি। লোক লজ্জা ও ভালোবাসা প্রদর্শনে অতিরঞ্জনের শংকায় মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে কাঁদার ইচ্ছেটা সংবরণ করতে হচ্ছে বড় কষ্টে।

প্রতিদিন আমি স্কুলে যাওয়ার আগেই পুত্র ঘুম থেকে উঠে জামা জুতা পরে রেডি। পুত্র আমার ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলায় ওস্তাদ। মাকে বশ করার কৌশল সেই বাচ্চা কালেই সে রপ্ত করেছিলো।

নিতান্ত জরুরি কোন প্রয়োজনে মা না বলে বলতো মা'জি।

তারপর মোলায়েম কন্ঠে, মা'জি, "আমি আপনার সাথে স্কুলে যাবো, আপনি বলেন, আচ্ছা।"

স্কুলের গেইটের সামনে গিয়ে, মা'জি, "আমি আপনার স্কুলে নামবো, আপনি আচ্ছা বলেন।"

আজন্ম ঘাড় ত্যাড়া মা তাদের, কথায় কথায় আচ্ছা বলতে অভ্যস্থ নয়।

একদিন মামাবাড়ির আবদারে সায় দিলে রোজ রোজ দিতে হবে।

আহ্লাদি সব আবাদার শুনেও না শুনার ভান করি অনেক সময়। গাড়ি থেকে নেমে হন হন করে আমি সোজা স্কুলের গেইট অভিমুখে হাঁটা দেই। একটু তফাতে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সন্তর্পণে তাকাতেই পুত্রের বেজার বদন দেখে নিজেরও খানিকটা খারাপ লাগে।

এই মন খারাপ অবশ্য বেশিক্ষণ টিকে না। পেশাগত দায়িত্ব ও কাজের চাপে একটু পরেই সব বিস্মরণ হয়।

স্কুল থেকে ফিরলে আবার শুরু হয় পুত্রের মুলামুলি। মা'জি," হাত দেন, প্রমিজ করেন, আচ্ছা বলেন।"

দাবি দাওয়া শুনার আগে কেমনে আমি আচ্ছা বলি? আবারও দরকষাকষি, আবারও বিচার মানি তাল গাছ মায়ের।

সিলেট ছেড়ে ঢাকা অভিমুখে সাঁ সাঁ করে চলছে বাস। যাত্রায় কোন ছন্দ নেই, আনন্দ নেই। গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত আমি। গাল বেয়ে অশ্রু নামছে অঝোরে। জ্বল ভরা চোখে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে আরো ঝাপসা লাগে পুরা দুনিয়া। কার্তিকের সোনা ঝরা রোদ, হেমন্তের মৃদু বাতাস, কিন্তু আমার চারপাশে কঠিন বেদনার সুর।

যত সময় যায় পুত্র কন্যার বাপের উপর খালি রাগ বাড়ে। তুন্দা ফুলিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। এই দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় ভুলে আজ আমার এই মর্মবেদনা। আমার সন্তান স্নেহের কাতরতা দেখে বেচারা রীতিমতো বিব্রত ও অপ্রস্তুত।

মনোবেদনা লাঘব করতে সান্তনার হাত বাড়িয়ে দিতেই সেরেছে। আমার দুঃখ, ফেনিল কষ্ট, চাপা অভিমান উছলে উঠে। সাধ্যমতো রাগ গোপন করলেও চোখের জলতো আটকানো দায়।

অশ্রুসজল নয়নে, কপট অভিমানে ব্র‍্যাকেটে বলি, "দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় যদি এই জীবনে আর কান দিয়েছি!" নিজের প্রতিজ্ঞায় অনঢ় থাকা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় এরপরেও বহুবার কান দিতে হয়েছে। তবে সে বারের মতো কোন মর্মঘাতী ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় নি আর।

জেদ্দার হজ্ব টার্মিনাল থেকে সরাসরি আমাদের গন্তব্য মদিনা।

যেহেতু পবিত্র হজ্ব কিংবা ভ্রমণ নিয়ে আমার এই লিখা নয়, সেহেতু ভ্রমণের চুলচেরা বর্ণনা এড়িয়ে যাচ্ছি। পরে এক সময় এই নিয়ে বিশদভাবে লিখবো।

তো যা বলছিলাম,আল্লাহ তার রহমতের সবটুকু ঢেলে পরম মমতায় খর খাট্টা মরুর বুকে বানিয়েছেন পবিত্র দুই শহর মক্কা ও মদিনা। নবী করিম (সাঃ) এর পদস্পর্শ যেখানেই পড়েছে তার নিচে হয় তেল, নয় সোনা। তেল সমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবের শান শওকত ও জৌলুস দেখলেই সত্যতার প্রমাণ মিলে।

ঐতিহাসিক, দৃষ্টি নন্দন, ও দোয়া কবুলের পবিত্র জায়গায় দাঁড়িয়ে সন্তানদের কথা আরো বেশি মনে পড়ে, আহারে তারা যদি সাথে থাকতো?

মদিনার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হজ্জের উদ্দেশ্যে ইহরাম পরিধান করে সরাসরি মিনায় চলে যাই। মিনার তাবুতে রাত কাটিয়ে যেতে হবে আরাফাতে।

আরাফাত অভিমুখে হজ্জযাত্রীদের গাড়ি বহরের দীর্ঘ লাইন। ভীড়ের বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে মাঝরাতেই আমরা গাড়িতে চড়ে বসেছি।

"লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লাব্বায়েক লা শরিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা, ওয়া নিয়মাতা, লাকাওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।"

বান্দার হাজিরা ধ্বনিতে আরাফাতের ময়দান মুখরিত। রুদ্ধশ্বাস যাত্রা শেষে সময়ক্ষেপণ না করে আল্লাহর অনুকম্পা লাভের জন্য ইবাদতিতে মশগুল হাজিরা। এই ভয়ানক আনন্দ ও কঠিন প্রাপ্তির সময় দুনিয়াদারি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন আমরা। কিন্তু সন্তানদের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারি না আমি। মোনাজাতে, দোয়ায়, নিদ্রায় খালি তাদের কথা মনে হয়।

নিস্তব্ধ নিশিতের শেষাংশ, আকাশে অনন্ত নক্ষত্ররাজির ভীড়ে শুক্লপক্ষের চাঁদ খানিকটা ম্রিয়মাণ। আরাফাতের খোলা মাঠে তপ্ত মরুভূমির বাতাস নয়, মনোরম হৈমন্তি এক বাতাস হুঁ হুঁ করে বইছে।

সুশোভিত নিম গাছের অরণ্যের কারণে উষর মরুতে অমন মায়াবি আবেশ। ক্লান্ত দেহ, শ্রান্ত মন। আলো আঁধারিতে আলাদা করে আরাফাতের ময়দানের সৌন্দর্যময় রূপ স্পষ্ট নয়।

মুয়াল্লিমের সহায়তায় নিজেদের তাবুর নাগাল পেয়ে জানে পানি আসে।

আস্তে আস্তে ভীড় বাড়ছে। নিতান্ত কোন প্রয়োজনে তাবুর বাইরে গেলে পথ হারিয়ে আউরি লেগে ফিরে আসা দায় হবে। নিরূপায় হয়ে তাবুর প্রবেশ মুখে বসে বসে আরাফাতের ময়দানের ঐতিহাসিক সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় আছি।

গোনাহ মাফের জায়গা, দোয়া কবুলের জায়গা এই বিশাল আরাফাতের মাঠ। রোজ কিয়ামতের দিন শেষ বিচারের এজলাস বসবে এইমাঠে।

এক অপ্রত্যাশিত মুহুর্তের মুখোমুখি আমি, ক'দিন আগেও যা কল্পনা করতে পারিনি। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়ে আমার সাথে থাকা দুষ্টু লোকের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম। কারণ তার মিষ্টি কথায় ভুলে আজ এই ময়দানে দাঁড়ানোর মতো সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের খুশিতে সন্তানদের সাথে বিচ্ছেদ বেদনার কষ্ট আমার পুরোটাই লাঘব হয়ে যায়। আকাশের পানে দৃষ্টি, প্রভুর দরবারে দুই হাত তুলে দুনিয়া আখেরাতের কল্যাণ কামনায় ব্যাকুল হাজিরা।

দোয়ায় আপনজন, হিতৈষি একে একে সবার কথা আপনা আপনি মনে আসছে।

ব্যাগে থাকা ফোনের আচমকা ভাইব্রেশনে প্রার্থনায় ছন্দ পতন হয়। দেশের ফোন দেখে অজানা কোন আশংকায় অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে, কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি তো?

মদিনা ছাড়ার আগে বিদায় নিয়ে সবাইকে বার বার বলেছিলাম,আর হজ্জ শেষে কথা হবে। তাহলে কেন এই অবেলায় ফোন?

বুকের ধড়ফড়ানি চেপে রিসিভ বাটনে হাত রাখতেই কেউ হ্যালো শুনার তোয়াক্কা করে না। "হ্যাপি বার্থ ডে মা, শুভ জন্মদিন মা। আমরা আপনার জন্য কার্ড বানিয়েছি, মা।" ছেলে মেয়েদের কন্ঠে এতোটুকু শুনেই আমার উড়ে যাওয়া প্রাণ আবার ধড়ে ফিরে আসে। কিন্তু চোখে আবার অশ্রুর ঢল নামে। আনন্দ বেদনার মিশ্র অনুভতিতে এ যেন খুশির অশ্রু।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের অন্যতম ফরজ কাজ। এই দিন আল্লাহ তার রহমের দরজা সবার জন্য খুলে রাখেন। মকবুল হজ ও হাজিদের কল্যাণে দুনিয়ার তাবৎ ধর্মপ্রাণরা মাফ পেয়ে যায় এক উছিলায়।

তাইতো আরাফাতের মাঠে প্রার্থনা ব্যতীত দুনিয়াবি কাজে একমুহুর্তও নষ্ট করা যাবে না। সংক্ষেপে শুভেচ্ছা ও শুভকামনার জবাব দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে আবারও ইবাদতে মশগুল হয়ে যাই।

আমি গোনাহগার বান্দা, লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে হ্যাংলার মতো মহান আল্লাহর কাছে খালি আবদার করে যাচ্ছি। বান্দার জন্য হিতকর সব আবদার তিনি বিনাশর্তে রক্ষা করেন।

দোয়া শেষ। আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে মুজদালিফায় যেতে হবে। হঠাৎ মনে হলো, আল্লাহর কাছে কি যেন চাইতে ভুলে গিয়েছি। সাথে সাথেই হাত তুলে বলি, ও আল্লাহ আমি অনন্তকাল আমার সন্তানদের মাঝে বাঁচতে চাই। পরকালে জান্নাতে আমি আবার মা হতে চাই, ওই তিনটা দুষ্টু সন্তানের মা।"

সেই ঘটনার পুরো দশ বছর পেরিয়েছে। অপূর্ব সুন্দর দুনিয়ায় আনন্দ বেদনায় জড়াজড়ি করে আমাদের জীবন এগিয়ে যাচ্ছে। কঠিন হৃদয় মায়ের পক্ষ থেকে লাঠি ছটা, কঞ্চি বেত, হ্যাঙ্গার, দজি, তাড়ু, ডাইল ঘুটনি, স্যান্ডেল, বিছানার ঝাড়ু, ফুলদানিতে রাখা ফুলের লম্বা স্টিক কোন কিছুর সফল প্রয়োগ কিংবা প্রদর্শনী থেমে নেই।

আর অন্যায় আবদারে মাকে দিয়ে আচ্ছা বলানো, সে তো অরণ্যে রোদন মাত্র।

জননীর সাথে সন্তানদের নিয়মানুবর্তীতা জনিত দ্বন্ধের সমান্তরালে ভালোবাসার প্রকাশে কিঞ্চিৎ কৃপণতা পুরাই বহাল।

কথায় কথায় দ্বিমত আর বিধিনিষেধতো আছেই।

তারপরও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনঢ়। সন্তানদের ভালোবাসার মাখামাখিতে লেপ্টে থাকতে চাই অনন্তকাল। পরকালেও তথা জান্নাতে আবার তাদের "মা" হতে চাই।

অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, তবুও এই ছোট চাওয়া।

যদিও তখন তারা আমার সন্তান হয়ে থাকতে চাইবে কিনা এই নিয়ে বিস্তর সন্দেহের অবকাশ আছে।

এই মুহুর্তে জিজ্ঞেস করলে মুখের উপর নির্ঘাত বলে বসতে পারে, আবার জান্নাতে আপনার সাথে? আবারও কুখ্যায় স্বৈরশাসক লেডি কিম জং উনের রাজত্বে আমরা?

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সমুহ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তাই আপাতত এই ইচ্ছার কথা তাদের জানান দিতে চাইনা। মনের কথা মনেই থাকুক।

জন্মদিনের শুভক্ষণে ঘড়ির কাটা ঠিক বারোটায় ঢং ঢং করছে। এলোমেলো অহেতুক সব ভাবনায় ছন্দ পতনে নিতান্ত বাধ্য হয়ে বিরতি দিতে হচ্ছে।

জীবন থেকে আরেকটা মধুরতম বছর খসে পড়লো, তার জন্য মনটা যারপরনাই ভারাক্রান্ত।

নিজের জন্য যতটুকু শুভকামনা করা যায় তার সবটুকুই করে নিলাম এক ফাঁকে।

শুভ জন্মদিন আমার আমিকে, শুভকামনা পুত্রকন্যাদের মায়ের জন্য, ভালোবাসা নিজের জন্য।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

ফারজানা ইসলাম লিনু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close