• শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

ভাইরাল মা-ছেলের ক্রিকেট খেলার ছবি, আলোচনায় পোশাক

প্রকাশ:  ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:০৫ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:১০
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

রাজধানীর পল্টনে ছেলের সাথে এক মায়ের ক্রিকেট খেলার কয়েকটি ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। কিন্তু মা আর সন্তানের খেলার ওই মুহূর্তটিকে ছাপিয়ে আলোচনা শুরু হয় ওই নারীর পোশাক নিয়ে।

ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায়, পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা কিশোরের বোলিংয়ে ব্যাট করছেন বোরকাপরা এক নারী। ওই নারীকে আউট করতে পেরে উল্লাসে আত্মহারা সেই কিশোর। কিশোরের আনন্দে সঙ্গী হতে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছেন বোরকাপরা সেই নারী।

সম্পর্কিত খবর

    জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে যখন বাংলাদেশ পুলিশ ও আনসার মধ্যকার জাতীয় বেসবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচ চলছিল তখন রাজধানীর পল্টন ময়দানে ক্রিকেট খেলছিলেন মা-ছেলে। মা ও ছেলের ৩০ মিনিটের ক্রিকেট প্রতিযোগিতার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন ফটো সাংবাদিকরা। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মুহূর্তেই তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

    এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মেহরান সানজানা নামে একজন লিখেছেন, বাঙালি মা বলে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন। কিন্তু ওনাকে দেখে তো মোটেও আমার বাঙালি মনে হয়নি। মনে হয়েছে আফগানি মা। উনি যদি সমাজ পরিবর্তনের জন্য ছেলের সাথে মাঠে নামতেন তাহলে বোরখা পরে নামতেন না।

    এমন মতের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে ব্যবহারকারী। তারা ওই নারীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

    ফারহানা সেলিম সিনথিয়া নামে একজন ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, প্রথমে ছবি দেখে ভেবেছিলাম আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের। পরে জানলাম বাংলাদেশের মা ছেলে। দেখে এতো ভালো লাগলো। ভদ্রমহিলা কি পোশাক পরেছেন সেইটা আমার কাছে বড় বিষয় না। এইটা যার যার নিজস্ব ভালো লাগা। উনার বোরকা নিয়ে সমালোচনা করার চেয়ে আমার ভালো লেগেছে ছেলেকে তার সাপোর্ট দেয়া দেখে, ভাল লেগেছে তার ব্যাটিং করার স্টাইল দেখে, মনে হচ্ছে প্রফেশনাল কেউ ব্যাট ধরেছে।

    নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টে ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেছেন, আপনারা মা আর সন্তানের ভালোবাসা, সন্তানের আনন্দ দেখেন না। দেখেন পোশাক। আপনাদের সাথে তাদের কোন পার্থক্য নাই, যারা মেয়েদের জিনস-টিশার্টকে কটাক্ষ করে অন্যায় অপরাধকে জায়েজ করার চেষ্টা করে।

    এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলেন, নারী কী পরে আছে অথবা পরে নাই সেটা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে। নারীর সমাজ নির্মিত একটি চেহারা আছে এবং সেই চেহারাটা হিন্দুদের জন্য এক রকম, সেক্যুলারদের জন্য একরকম, মুসলমান ভাবাপন্নদের জন্য একরকম। এই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজের মধ্যে এক ধরণের বিভেদ তৈরি হয়েছে। এজন্যই তর্ক-বিকর্তটা হয়েছে।

    একজন নারী বোরকা পরেই হোক আর যা পরেই হোক, তিনি তার সন্তানের সাথে খেলতেই পারে। আরেকটি কারণ হচ্ছে, নারী যে অনেক রকম চেহারা নিয়ে হাজির হতে পারে সেই সহিষ্ণুতার জায়গাটা নাই। এছাড়া নারী কী পরবে সেটাও যে সে নিজে ঠিক করবে-সেই বোধের জায়গাটাও সমাজে তৈরি হয়নি বলে মনে করেন তিনি।

    তিনি বলেন, আমি যেভাবে নারীকে দেখতে চাই সেভাবেই নারীকে নির্মাণের চেষ্টা চলে। যেমন বাঙালি নারী, মুসলমান নারী, নারীবাদী নারী, তাদের প্রত্যেককেই একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমের মধ্যে থাকতে হয়।

    তিনি আরো বলেন, যারা নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করেন অনেক সময় তিনিও মনে করেন যে, নারীকে তার চিন্তার মতো করে চলতে হবে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কারণ নারী কী পরবে নিজে সেই সিদ্ধান্ত নেয়াটাও স্বাধীনতার অংশ। সময়ের সাথে সাথে চিন্তায় পরিবর্তন আনতে হবে।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, এই ছবিটার বার্তা হওয়া উচিত একজন মা তার সন্তানকে উৎসাহিত করার জন্য নিজেই খেলছেন। এটাই বড় বার্তা। তার পোশাক নয়। কারণ আমাদের মায়েরা তো ক্রিকেট খেলেন না। এটাও তো একটা অনিয়মিত ঘটনাই বলা চলে। পোশাক নিয়ে বিতর্কটা আসলে অহেতুক বিতর্ক বলেই আমি মনে করি।

    এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বোরকাপরা মায়ের নাম ঝর্ণা আক্তার। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। এক সময়ে দেশের সফল অ্যাথলেট ছিলেন। ঝর্ণার পুরো পরিবারই খেলাপাগল। তার ছোট ভাই জাতীয় ফুটবল দলে স্ট্রাইকার রোকনুজ্জামান কাঞ্চন। পরিবারের অগ্রজদের মতো খেলায় আগ্রহ ঝর্ণার ১১ বছরের ছেলে শেখ ইয়ামিনেরও। ইয়ামিন মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে।

    ঝর্ণা আক্তার বলেন, আমি এক সময় খেলোয়াড় ছিলাম। ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। বর্শা নিক্ষেপ, চাকতি, গোলক নিক্ষেপ, লং-জাম্প, ৫০০ মিটার দৌড়, ২০০ মিটার দৌড়ে নিয়মিতই অংশ নিতাম। আমার ভাই জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়।

    তিনি বলেন, আমার বাচ্চাটাকে মাদ্রাসায় দিয়েছি। ওর ইচ্ছা, ক্রিকেট খেলা। তাই আমি কাজী নজরুল একাডেমিতে ওকে ভর্তি করিয়েছি। আমিও ক্রিকেট পছন্দ করি। এখন আমারও স্বপ্ন ইয়ামিন একদিন টাইগারদের সঙ্গে খেলবে। আপাতত তাকে বিকেএসপিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছি।

    হঠাৎ করে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হওয়া নিয়ে ঝর্ণা আক্তার বলেন, ওইখানে বেসবল ফাইনাল হচ্ছিল। এক পর্যায় আমার বাচ্চার সঙ্গে আমি খেলতেছিলাম। কিন্তু আমার পাশে যে, মানুষজন ভিডিও করতেসে, সব সাংবাদিক চলে আসছে আমি ওদিকে খেয়াল করিনি। আমরা দু’জন অনর্গল খেলে যাচ্ছি, আনন্দ করতেসি হঠাৎ দেখলাম মানুষ আমাদের ঘিরে ধরেছে। মনে হচ্ছিল আমরা অ্যারেস্ট হয়ে গেলাম! আমি চাই আমার মতো সব মায়েরা হোক। বাচ্চাদের মন বুঝুক, বাচ্চাদের সঙ্গে একটু খেলাধুলা করুক। মায়ের মতো বন্ধু আর কেউই হতে পারে না।

    পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close