• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

চেকআপ-অক্সিজেনের বিল ৬৫ হাজার টাকা!

প্রকাশ:  ২৬ আগস্ট ২০২০, ১৯:৪২
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

করোনাকালে হাসপাতালের নয়ছয় রূপটা যেন অনেক বেশি স্পষ্ট। অনেকের সাথে ঘটেছে এমন কতশত অমানবিক আচরণ। নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন একটি অমানবিক ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেন প্রবাসী শাহীন কবির।

তিনি লিখেছেন, ‘‘খুবই মনোবেদনা নিয়ে একটি ঘটনা শেয়ার করছি আজ। ঘটনাটি আমার মাকে নিয়ে। মাকে ঘিরেই আমার আমাদের পৃথিবী। প্রথম গল্পটা ২০০৫ সালের। একদিন হঠাৎ করে আমার ছোটভাই ফোন করে কান্নাকাটি। আমি তখন ইউএসএ তে। ছোটভাই কাঁদতে কাঁদতে বলছে, মার নাকি ক্যান্সার হয়েছে! এই বয়সে কারো ক্যান্সার হলে খুব স্বাভাবিক ভাবে তা উদ্বেগের কথা। দূর পরবাসে থেকে আমি অস্থির হয়ে গেলাম। কালবিলম্ব না করে দেশে রওনা হলাম মায়ের জন্য।

সম্পর্কিত খবর

    সারাপথ আমার ঘুম হলো না দুশ্চিন্তায়! স্বাভাবিক ভাবেই আমার বাড়িতে তখন এক হতাশার অন্ধকার। এই বুঝি মাকে হারাতে হবে আমাদের। আমার ৩০ ঘন্টা নির্ঘুম জার্নি শেষে মাকে যখন জড়িয়ে ধরলাম, মনে হলো সব ক্লান্তি শেষ। আমরা যারা সন্দিপের বাসিন্দা তাদের সকলের প্রথম পছন্দ মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। সেখানেই মাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ড. জসিমের অধীনে ভর্তি করা হলো। ডাক্তারের বেশ নামডাক আছে এলাকায়।

    এবার চিকিৎসার শুরু। ডাক্তার আমাকে বললেন, রাতের ভেতরে অপারেশন না করালে খুবই বিপদজন্ক পরিস্থিতির ভেতরে পড়ে যাবে আমার মা! আমি জানতে চাইলাম, কেমন বিপদ? বললেন হয়তো আগামী ৩ মাস বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে! স্বাভাবিক ভাবেই আমরা বাড়ির সবাই ভেঙে পড়লাম। আমার নির্ঘুম ক্লান্ত শরীর। অস্থির লাগছে সবকিছু!

    হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ! আমি শক্তমনের মানুষ। সহজে কান্না আসে না আমার। তবুও চোখটা বারবার ভিজে আসছিল। বাবার সাথে, পরিবারের সাথে আলাপ করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় নিয়ে যাবো। সেখানেই মায়ের চিকিৎসা হবে। পরদিন চট্টগ্রাম থেকে ডমেস্টিক ফ্লাইটে নিয়ে এলাম মাকে। ভর্তি করালাম ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে। সেখানে সব চেকআপ শেষে আমার ৪৮ ঘন্টা নির্ঘুম রাত শেষে ডাক্তার আস্বস্ত করলেন যে, না যতটা শংকার কথা ভাবছেন ততটা না। ডাক্তারকে আমার খুব হেল্পফুল মনে হলো।

    আমি হোটেলে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে গেলাম। হঠাৎ আবার আমার ভাই ফোন দিয়ে জানালো, নেক্সট ডিউটি ডক্টর নাকি বলেছেন, অবস্থা ভালো না। তাকে জরুরী ভাবে ওটিতে নিতে হবে। আমি আবারও সেই প্রথম ডক্টরের পরামর্শ নিলাম। তিনি আবার বললেন, না তেমন আশংকার কিছু নেই।

    আমি এবারে সত্যিই কনফিউজড হয়ে গেলাম। যাই হোক এই অস্বস্তিকর বেদনার পরিস্থিতি চলতে থাকলো। আমি এদিকে মাকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাবার কাগজপত্র ঠিক করলাম। এক সপ্তাহের ভেতরে আমি মাকে নিয়ে গেলাম ইন্ডিয়াতে। এবং সেখানে কোনোরকম অপারেশন ছাড়াই ঔষধ পথ্যে মা সুস্থ হলেন। এখনও আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

    এখন অনেকেই ভাবতে পারেন ২০২০ এ এসে আম্মাকে নিয়ে এই কথাগুলো কেন লিখছি। কারণ আমার মায়ের সম্প্রতি কোভিড নাইন্টিন পজিটিভ এসেছে। মাকে আবারও সেই হাসপাতালে নিয়ে গেলে সামান্য কিছু চেকআপ আর অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রাথমিকভাবেই ৬৫ হাজার টাকা তারা ক্লেইম করছে। সেই একই হাসপাতাল। একইরকম ভয় দেখানো শুরু করেছে। ফুসফুসের নাকি ৭৫% ড্যামেজ হয়ে গেছে। বডি সার্ভাইভাল পয়েন্ট নিয়ে আশংকার কথা ছাড়া ডাক্তারদের মুখে অন্য কোনো কথা নেই।

    আমি জানি আমার মা একজন ফাইটার। তিনি এসব রিকভার করে সুস্থ হয়ে উঠবেন। এদিকে আমার ছোটভাই মাকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর শুনলাম মায়ের তেমন কোনো সমস্যা নেই। দ্রুতই রিকভারি হবে ইনশা আল্লাহ।

    আমি ভেবে অবাক হই, হাসপাতালে মানুষরুপী এসব হায়েনাদের কথা। আমি কখনওই কারো বিরুদ্ধে কিছু লিখি না বা বলি না। কিন্তু একজন সন্তান হিসেবে আমার মাকে নিয়ে না লিখে পারলাম না। এই যে নাজেহাল করলো একটি চিকিৎসা কেন্দ্র তার বিহিত হওয়া জরুরী। অথচ আমার নিজেরই কজন বন্ধু বান্ধব আছেন মেট্রোপলিটন হাসপাতালে। কিন্তু এইসব ডাক্তাররুপী হায়েনা আছে হয়তো বাংলাদেশে অনেক জায়গায়। আমি সত্যিই বাকরুদ্ধ। এমনকি আমাকেও এই হাসপাতালের ডিরেক্টরশীপ নেবার অফার করা হয়েছিল বেশ ক’বছর আগে।

    আমার কথা হলো- আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। পৃথিবীর অনেক বড় বড় হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা আমার এক জীবনে দেখা ও জানা অনেক গল্প রয়েছে। ডাক্তাররা রোগীর সাথে মেন্টাল কাউন্সিলিং করেও ৬০ থেকে ৭০ পারসেন্ট অসুখ ভালো করে দেয় অনেক সময়। অথচ এইসব লাইসেন্স ধারী কসাই ব্যবসায়দের কী বলবেন আপনারা!

    আমি খরচের কথা বলছি না। আমি বলছি টাকা হাতিয়ে নেবার স্বার্থে এই যে ডাক্তার নামের লুটেরাদের বিরুদ্ধে টাস্ক ফোর্স তৈরি করা জরুরী। ডাকাতদের চাইতেও নিকৃষ্ট এরা কারণ ডাকাতরা তো টাকা নিয়ে অন্তত ছেড়ে দেয় সবাইকে। এরা তো অপারেশন থিয়েটারে ভুলভাল চিকিৎসা করে টাকাও নেয়, মানসিকভাবে স্বর্বশান্ত করে একই সাথে মানুষটাকেও মেরে ফেলতে চায়!

    আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দেবেন কী কেউ? জবাব কী জানা আছে কারো?

    সর্বশেষে বলি, আপনাদের প্রার্থনায় আল্লাহর রহমতে আমার মা এখন করোনামুক্ত। ভাল থাকবেন সবাই। সবার প্রতি শুভ প্রার্থনা।’’

    পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close