• শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

বাবার স্মৃতিচারণ করে অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদের আবেগঘন স্ট্যাটাস

প্রকাশ:  ২৫ আগস্ট ২০২০, ২২:০৬
ড. নাজনীন আহমেদ
বাবা ও মায়ের সাথে ড. নাজনীন আহমেদ। ছবি: ফেসবুক

আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল আমি বাবাহীন। এভাবে পাঁচদিন গড়াবে পাঁচ মাসে, তারপর পাঁচ বছরে এবং চলতে থাকবে যদি বেঁচে থাকি। অদ্ভুত শূন্যতা লাগছে। আব্বা যেহেতু প্রায় সাড়ে তিন বছর শয্যাশায়ী ছিলেন, কথাবার্তা নড়াচড়া ও অনুভূতি কোন কিছুই ছিল না, তাই মানসিকভাবে পারিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের চিন্তা এসে গিয়েছিল যে, যেকোন সময় আব্বা চলে যেতে পারেন। তারপরও সত্যিকার অর্থে চলে গেলে যে এমন লাগবে, কোনোদিন ভাবিনি।

ছোটবেলার সব স্মৃতি ভেসে উঠছে মনের পর্দায়। আমি এইচএসসি পরীক্ষার ২ মাস আগে পর্যন্ত লেখাপড়া করতাম আব্বা আম্মার রুমে। আমার অভ্যাস ছিল‌ জোরে জোরে পড়ার।প্রতিদিন সকালে আর সন্ধ্যায় পড়ার সময় কোন‌ ভুল হলেই আব্বা বলতেন, কোথায় কেন ভুল হচ্ছে। উনার জ্ঞানের গভীরতায় বিস্মিত হতাম। আব্বা অনেক বানান, শব্দের ব্যবহার এমনভাবে মাথায় ঢুকিয়েছেন যে এখনও সেসব লিখতে গেলে সতর্ক হয়ে যাই। আমার অভ্যাস, আমার যেকোন সাফল্যের খবর সবার আগে‌ আব্বাকে দিতে হবে। এখন কাকে বলবো? কে আমার জন্য জোরে জোরে‌ আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাবে, আর দোয়া করবে?

এইচএসসি পরীক্ষায় ১৯৯০ সনে হলিক্রস কলেজ থেকে ঢাকা বোর্ডের মানবিক বিভাগে যখন ছেলেমেয়েদের সম্মিলিত মেধাতালিকায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করলাম, সেদিন আমাদের বাসায় সাংবাদিকদের আনাগোনায় ভরে দিয়েছিল । তখনকার সময়ে বোর্ডে প্রথম দিকে যারা স্ট্যান্ড করতো তাদের বাসায় সাংবাদিক আসতেন সাক্ষাৎকার নিতে, ছবি তুলতে। আব্বা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর একটু গম্ভীরভাবে দিচ্ছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না তার এই গম্ভীর থাকার কারণ। পরে যখন জিজ্ঞেস করলাম আব্বা, তুমি ওনাদের সামনে এতো গম্ভীর হয়ে উঠবে উত্তর দিচ্ছিলে কেন? আব্বা বললেন, মা, যদি আমি বেশি খুশি দেখাই, তাহলে সবাই হয়তো ভাবতে পারে এই স্থান তুমি ডিসার্ভ কর না, হঠাৎ প্রথম স্থান অধিকার করায় যেন বেশি খুশি হয়ে গেছি । কিন্তু হলিক্রস কলেজের সব পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী হিসেবে, আমি বিশ্বাস করেছি যে তুমি এই প্রথম স্থান ডিজার্ভ করো। সেই কারণে একটু গাম্ভীর্য নিয়ে ছিলাম! আহারে আমার প্রতি উনার কী কনফিডেন্স ছিল!

আমার পিএইচডি ডিগ্রী হবার আগ পর্যন্ত আব্বা সবসময় বলতেন, তোমার পিএইচডি ডিগ্রী হওয়া পর্যন্ত যেন আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন। ২০০৬ সালে যে মুহূর্তে আমি পিএইচডি ডিগ্রী পেয়ে আব্বাকে ফোন দিলাম বিদেশ থেকে, উনি কোন কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু কাঁদছিলেন, খুশিতে, আর ফোনের মধ্যেই দোয়া করেছিলেন আমার জন্য।

ছোটবেলা থেকেই আমার দুই ভাইয়ের সাথে আমাদের দু বোনকেও আব্বা আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহ দিয়েছেন। উচ্চশিক্ষার কারণে বিদেশ থাকাকলীন শত বাধার মধ্যেও আব্বা ভরসা দিয়েছেন। আমার মেয়েকে প্রতিদিন স্কুল‌ থেকে আনা নেয়া করতেন। আব্বা-আম্মার স্নেহমাখা সাপোর্ট ছাড়া এই আমি আগাতেই পারতাম না। আম্মা এখনও চোখের সামনে আছেন। আল্লাহ্ যেন আব্বাকে চিরস্থায়ী শান্তিতে রাখেন আর আম্মাকে দীর্ঘ, সুস্থ জীবন‌ দেন।

লেখক: খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ড. নাজনীন আহমেদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close