• বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

এখন কত্তো মানুষ আওয়ামী লীগ করে, কিন্তু মজিদ’রা নাই!

প্রকাশ:  ৩১ জুলাই ২০২০, ১১:৪৯
মঞ্জুরে খোদা তরিক
মঞ্জুরে খোদা তরিক

মা’কে দেখতে গতবছর দেশে যেয়ে সিরাজগঞ্জে যাই। সিরাজগঞ্জে যেয়ে মোটামুটি বাসাতেই ছিলাম। প্রায় সবসময় মার কাছেই বসা থাকতাম। মাঝে মাঝে বন্ধু-স্বজন-পরিচিতরা দেখা করতে আসতো। আমিও কখনো কখনো বাইরে গিয়েছি। প্রতিদিন ভোরে হেটে-দৌড়ে যমুনার ধারে যেতাম। আর রাতে অনুজ টুটুলের সাথে মাঝেমধ্যে বাজার স্টেশনে যেতাম। প্রিয় তোমিজ কাকার মিষ্টির দোকানে ও আসেপাশে ঘোরাঘুরি চা-পানি খাওয়া আড্ডা এই তো। একদিন দেখা হলো আব্দুল মজিদের সাথে। আমাদের সময়ের ছাত্রলীগ নেতা। সেই সময় সে ছাত্রসংসদ নির্বাচনও করেছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ প্যানেল নাসির-মজিদ পরিষদে সে জিএস পদে দাড়িয়েছিল। কিন্তু জিততে পারেনি। জিতবে কিভাবে, তখন ছাত্রলীগের একক প্যানেল দেয়ার অবস্থাই ছিল না। তাদের সংগঠনে অনেক ছেলেমেয়েও ছিল না। তারপরেও যে কয়েকজন ছিল, নির্বাচনের দাড়ানোর মত ফিগার ছিল না, আবার যাও বা ছিল তারা খুব সাহস করত না। কারণ সবাই জানতো সিরাজগঞ্জ কলেজে ও শহরে ছাত্রদলের একক প্রভাব ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের হুমকি-ধামকি, প্রতাপ-আধিপত্য ছিল ব্যাপক। ছাত্রলীগ তো দূরের কথা, আমরা সকল সংগঠন মিলেও তাদের সাথে পেরে উঠিনি। তখন ছাত্রদলই সিরাজগঞ্জ বিএনপি’র মূল শক্তি। ছাত্রলীগ করতো হাতেগোনা কয়েকজন, খুব অল্পসংখ্যক ছেলেমেয়ে। বরং ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রলীগ, বাসদ, জাসদ ছাত্রলীগ তাদের চেয়ে ভাল অবস্থানে ছিল।

ছাত্রদল কতটা শক্তিশালী ছিল তার একটা কাহিনী বলে ফের মজিদ প্রসঙ্গে যাব।

তখন আমরা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করছি, কোন কারণে সিরাজগঞ্জে ছাত্রদল-বিএনপি’র সাথে আমাদের মানে অন্যান্য সংগঠনের ভয়ঙ্কর বিরোধ তৈরী হলো। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে, বিএনপি বাদে সিরাজগঞ্জের সকল ছাত্র-যুব সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কওমী মজদুর ইউনিয়ন ও শহরের আশেপাশের অঞ্চলের তরুণ-যুবকদেরও সংগঠিত করা হয়েছে। ছাত্রদল-বিএনপিকে এবার শায়েস্তা করতে হবে, ওদের শহর ছাড়া করতে হবে, ওদের ধানবান্ধি-কালিবাড়ি, আমলাপাড়া, হোসেনপুরের ঘাটি ভেঙ্গে দিতে হবে। ওরা আমাদের অনেক জ্বালিয়েছে, অদের অনেক দাপট দেখেছি, অনেক সহ্য করেছি, আর না।

আমাদের নেতারা পরিকল্পিনা করলেন কিভাবে আক্রমন করা হবে, কিভাবে ঘেরাও করা হবে, কিভাবে ওদের জনমের শিক্ষা দেয়া হবে। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী নেতারা আমাদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করলেন, গ্রুপের সামর্থ ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজও ভাগ করে দিলেন। অনেক হিসেবনিকেস করে দেশীয় যন্ত্রপাতি, লাঠিসোঠা, ইটপাথর যোগারজন্ত করে আক্রমনের সব ধরণের প্রস্ততি নেয়া হলো। প্রবল প্রতাপশালী প্রতিপক্ষ ছাত্রদল- বিএনপিও বসে নেই। তারাও সব হিসেব কষে, পাল্টা প্রস্ততি নিয়ে বসে আছে। অতপর সেই ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষন এলো ও তাদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল, এবং তা সারা শহর ছড়িয়ে পরলো। কয়েকদিন এই অবস্থা চললো, আক্রমন পাল্টা আক্রমন চললো। বাস্তব সত্য হচ্ছে সিরাজগঞ্জের সেই সংঘাত-সংঘর্ষে সব দিক থেকেই বিএনপি-ছাত্রদল এগিয়ে ছিল এবং তাদের দূর্দান্ত সাহস, মনোবল ও মাঠ দখলের দক্ষতার কাছে আমাদের নতিস্বীকার করতে হলো। তারা শহর দখল করে বিজয়োল্লাস করলো। বিএনপির এই শক্তির কথা বলছি, তখন তারা ক্ষমতায় ছিল না। তখন ক্ষমতায় ছিল এরশাদ! এখনকার বিএনপিকে দেখে অবাক হচ্ছেন? তখন এটাই ছিল বাস্তবতা।

এবার শোনের মজিদের বাকি কাহিনী। ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জিএস প্রার্থী হিসেবে মজিদ মোটেই আকর্ষনীয় ছিল না। তার চেহারা ছিল তামাটে ভাঙ্গাচোড়া, রুগ্নস্বাস্থ্য, কাপড়-চোপরে পুরাই গ্রাম্য। গ্রাম্যতো হবেই, সে একেবারে গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ। শহরের হাওয়া তার গায়ে লাগেনি। শহুরে ভাব তার চেহারায় মোটেই নেই। খসখসে চামড়ায়, হাতেপায়ে সড়িসার তেল, চোখে কাজল-সুরমা দিয়ে সে কলেজে আসতো। তার চোখের উপর আবছা ভ্রু ছিল, প্রায় দেখাই যেতো না। সে কারণে নির্বাচনে ওর পোস্টার করতে যেয়ে আমাদের বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে। স্টুডিওতে ওর ছবি তোলা হলো, কিন্তু ছবিতে ভ্রু দেখা না যাওয়ায় খুব বিদঘুটে লাগছিল, পরে ফটোগ্রাফারকে অনুরোধ করে হাতের কাজ করে ছবির একটা সিসটেম করা হলো। কারিগর বেচারাকে এ জন্য বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এভাবেই ওর পোস্টারও হয়ে গেল। এই ছিল সহজ, সরল, আন্তরিক, মুজিবাদর্শের ছাত্রলীগ নেতা মজিদ।

কিন্তু ভোটে দাড়ালেই তো হবে না, ছাত্রছাত্রীদের কাছে তো ভোট চাইতে যেতে হবে। জিএস প্রার্থী মজিদকে নিয়ে কেউ ক্যাম্পিংএ যেতে চাইতো না। কারণ তার চেহারা খারাপ, মোটেই স্মার্ট না, সুন্দর করে কথা বলতে পারে না। এমন গেয়ো ছাত্রনেতাকে নিয়ে নিজের ভোট কমাবে না’কি? তাকে নিয়ে মেয়েরা হাসি-তামশা-ঠাট্টা-মশকরা করে ইত্যাদি। কিন্তু মজিদের কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ তার কাছে রাজনীতি কোন কেরিয়ার ছিল না। শহরের সেইসব ধান্ধাবাজি সে বোঝে না! তাকে স্পর্শও করে না এগুলো! সে ছিল ছাত্রলীগের নিবেদিত প্রাণ সৈনিক। তার সংগঠন ও দলকে এগিয়ে নিতে, টিকিয়ে রাখতে যা করা দরকার তাই সে করছে। আমাদের সামনেই তাকে অনেকবার অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। তাকে নিয়ে মশকরা করতে দেখেছি, মার খেতে দেখিছি। কিন্তু মাজিদ ছাত্রলীগ ছাড়েনি, গ্রাম থেকে হেটে বা সাইকেল চালিয়ে এসে শহরে রাজনীতি করেছে।

সেই মজিদকে দেখলাম সিরাজগঞ্জের বাজার স্টেশনে একটা ছোট্টা একটি প্রেসের ব্যবস্যা করছে। আমাকে সে নিয়ে গেল তার প্রেস দেখাতে সেখানে, ছোট ঘর গুমোট ভাব, অসহ্য গরম, পরে বাইরে কড়ি গাছের নিচে কিছু সময় আড্ডা দিলাম, স্মৃতিচারণ করলাম। ছাত্রলীগের আরো নেতা ছিলেন তপন সিরাজী, পিয়ার ভাই। পিয়ারভাই থাকতেন কালীবাড়ী, একেবারে বিএনপির পেটের মধ্যে। সারাদিন আতঙ্কেই থাকতেন। তপন ভাইয়ের সাথে ছাত্রদলের নেতাদের অনেক ঠাট্টা মশকরা করতে দেখেছি। আরও বেশ কয়েকজনের কথা মনে হয়, কিন্তু নামগুলো মনে করতে পারছি না। আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ও মুজিবভক্ত ছিলেন কিন্তু পঁচাত্তরের পর দলের দূঃসময়ে তাদের দেখা যায়নি। তারা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সমর্থক এমন পরিচয় নিয়ে সামনে আসেননি। এরমধ্যে আমার এলাকার বন্ধু, পরিচিত, অপরিচিতরাও ছিল!

সিরাজগঞ্জ গেলে স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে, মাথাচাড়া দেয়। স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে গেলে সকলের কথা মনে হয়। মনে হয় যাদের সাথে দীর্ঘদিন জোট-ঐক্যের রাজনীতি করেছি, সে সব নেতা-সহযোদ্ধাদের সাথে দেখা করি। সে ভাবনায় গেলাম আওয়ামী লীগ অফিসে, প্রথমে তো চিনতেই পারিনি আওয়ামী লীগের অফিস। যাইহোক দেখলাম অনেক পরিবর্তন, সেই ভাঙ্গাচোড়া দরজা-জানালা ছাড়া অফিস আর নেই! সেই চট, চাটাই, মাদুর বিছানো অফিস আর আর নেই! এখন তা বহুতল ভবন! মনে হচ্ছিল কোন কর্পোরেট অফিস! কিন্তু অফিস কেন বন্ধ? কেন তালা লাগানো? সেখানে থাকা লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কি ভাই, এটা তো আওয়ামী লীগ অফিস, কিন্তু বন্ধ কেন? লোকটি বললো, ভাই এখন তো অফিস সবসময় খোলা থাকে না! যখন প্রগ্রাম থাকে, তখন নেতারা আসে, এমপি-মন্ত্রীরা আসে, তখন অফিস খোলা থাকে! আমি বললাম, কেন সাধারণ নেতাকর্মী যারা আছে, তারা আসে না? পরিচিত লোকটি বলল, আরে ভাই সবাই এখন ব্যবস্যা-বাণিজ্য করে, ব্যস্ত। এখানে বসে কেউ সময় নষ্ট করে না। সরকারী অফিস-আদালতে যান, তাদের পাবেন। আর নেতানেত্রীদের বাসা, ব্যবসার অফিসে যান পাবেন। শুনে অপ্রস্তত হলাম! যে অফিস দলের চরম দূঃসময়েও বন্ধ থাকেনি, তা আজ ক্ষমতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও ব্যক্তি বলয়-কার্যালয়ের কাছে অপাঙত্তেয়!! হায়রে ক্ষমতার রাজনীতি, সময়ের ব্যবধানে তার পরিবর্তন ও বাস্তবতা!

এবার একটু বিএনপি অফিসে গেলাম সেই সময়ের নেতাদের সাথে দেখা হবে, একটু স্মৃতিচারণ হবে, সবার খোঁজও নেয়া হবে। কিন্তু বিএনপি অফিসে যেয়ে দেখি এ যেন এক অন্ধকাচ্ছন্ন, জীর্ণশীর্ন অরক্ষিত ভূতরে ঘর। সেখানে কেউ নেই। সেখানে উপস্থিত দুই-একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা নেই? তারা আসে না? তারা বললো ভাই, উনারা তো সব দৌড়ের উপর আছে। তাদের তো একসাথে দাড়াতেই পারে না, অফিসে বসবে কি..? মনে পড়ে গেল সেই অতীত বিএনপি’র কথা, ভরা যৌবনের কথা, তাদের প্রভাব, প্রতাপের কথা! সময়ের ব্যবধানে অবস্থা ও বাস্তবতার কত পরিবর্তন! যে সিরাজগঞ্জে পুরনো কিছু লোক ছাড়া আওয়ামী লীগ করার মানুষ ছিল না; সেই একই গঞ্জে মনে হলো এখন কে এই দল করে না? সবাই আওয়ামী লীগ করে! এমন কি আওয়ামী লীগের এক বড় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আমাদের সাথে পড়তো, তার সাথে রাজনীতি নিয়ে একদিন কথা বলতেই সে বলেছে, “আই হেট পলিটিক্স।” তারা এখন তার পিতার বড় সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগার! এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় যে মানুষগুলো আমাদের নানাভাবে ভৎসনা করতো। মনে করতো এগুলো করে নিছক সময় নষ্ট করছি। আজ দেখি তারাই চকচকে মুজিবকোটে বড় বড় মুজিবাদর্শের সৈনিক। অনেক অর্থবিত্ত ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক!

ফেসবুকের কারণে দেখার সুযোগ হচ্ছে এখন কত মানুষ আওয়ামী লীগ করে! যাদের মুখে কখনো দলটির নাম পর্যন্ত শুনিনি, তারা আজ সরকারী দল আওয়ামী লীগের হর্তাকর্তা! তাদের হম্বিতম্বি দেখে নিজেকে বিশ্বাস হয় না, আমি কি ঠিক শুনছি? আমি কি ঠিক মানুষের সাথে কথা বলছি? পরে মনে হয়েছে, জমানা বদল হ্যায়! যারা বলেছিল, কি সব করে সময় নষ্ট করছেন? আসলেই সে ছিল আমাদের এক বিপুল সময়ের অপচয়! না হলে আজ কেন তার এমন পরিণতি? কটুরীপানাও চলে স্রোতের দিকে, সেও বোঝে স্রোতের ধার! ভোগবাদী সমাজে স্বার্থপর মানুষের কথা আর কি বলি? তাই দেখে শুনে মনে হয়, এখন কত্তো মানুষ আওয়ামী লীগ করে, কিন্তু মাজিদ’রা নাই! যে কারণে পত্রিকায় প্রতিদিন দলের হাইব্রিড নব রত্মদের সংবাদ পাই!!

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

মঞ্জুরে খোদা তরিক,রাজনীতি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close