• রোববার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭
  • ||

ডাক্তার পিটিয়ে হত্যা, আমরা মানুষ হবো কবে?

প্রকাশ:  ১৮ জুন ২০২০, ২০:৫৮ | আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ২১:০০
প্রফেসর রুমেল এমএস পীর
প্রফেসর রুমেল এমএস পীর

আমার ভাবী প্রতিদিন হাসপাতালে যায়। ভাবী বড় ডাক্তার, সিলেটের নামী এক হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। আমরা সবাই গত ৩ মাস ধরে যখন বাড়িতে নিজের অবসর কাটাতে কাটাতে ক্লান্ত, ভাবী সেই পুরো ৩ মাসই মানুষের সেবা নিয়ে ব্যস্ত। স্বাভাবিক সময়ে তার সপ্তাহে ১ দিন ছুটি থাকে। গত ৩ মাসে সাপ্তাহিক ছুটিও নেই বললে চলে। সকালে ভাবী গাড়ি চালিয়ে বের হয়, তার ৪ বছর বয়সী ছোট ছেলেটা অনেকদূর গাড়ির পিছনে ছুটে যায় মা-কে আটকাতে। সন্ধ্যা পর্যন্ত মায়ের পথ চেয়ে বসে থাকে, মা ছাড়া কারও হাতেই ভাত খাবেনা সে। সন্ধ্যায় মা আসে। ছোট্ট ছেলেটা তখন দুপুরের খাবার খায়! এসব দেখে একদিন ভাবীকে বললাম, হাসপাতালে সময় একটু কমানো যায় না ভাবী? কিংবা সপ্তাহের ছুটি নিলে কি ভালো হয় না? আপনারওতো বিশ্রামের দরকার লাগে। ভাবী চমকে উঠে বললেন, ‘কি বলছো ছোটভাই? আমি যদি নিজের আরামের কথা ভাবি তবে আমার রোগীরা এই সময়ে কার কাছে যাবে’? আমি থমকে গেলাম। মুচকি হেসে ভাবী বললেন ‘ওসমানীতে পড়েছি দেশের টাকায়। দেশের মানুষের সেই ঋণ শোধ করতে হবেনা কিছুটা’? আমার চোখ ছলছল করে উঠে। কি গভীর দেশপ্রেম! বলে রাখা ভালো, আমার ভাইয়া ১৭ বছর অস্ট্রেলিয়া ছিলেন। পড়ালেখা, পরে চাকুরী। সেই সুবাদে ভাইয়া, ভাবী এবং তাদের দুই সন্তানেরই অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশীপ আছে। তবু তারা বাংলাদেশে থাকে শুধুই এই অপরূপ দেশটাকে প্রানান্ত ভালোবেসে।

আমার বাড়ির ডাক্তারের খবর বললাম। তবে আমি নিশ্চিত দেশের সকল ডাক্তারের বাড়িতেই এমন হচ্ছে এই করোনা পরিস্থিতিতে। ডাক্তার বাবা ডিউটিতে যাচ্ছেন, সন্তান পা ধরে বসে আছে যেনো বাবা যেতে না পারে- এই ছবিটা কোথায় যেনো দেখেছিলাম। হাহাকার করে উঠেছিলাম। করোনার বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় যোদ্ধা যে এই ডাক্তারেরা। সাথে নার্স এবং সকল স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের মানবিকতায় এখনো মুগ্ধ না হলে বুঝতে হবে আমার-আপনার মন মরে গেছে। সিলেটের ডা. মঈন থেকে শুরু, এ পর্যন্ত ৪৭ জন ডাক্তার মারা গেছেন এই দেশে। আর কতো আত্মত্যাগ করলে আমরা বলবো ‘তোমরা আমাদের হিরো’? আমরা যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তারা অন্তত আজকের এই করোনা যোদ্ধাদের সাহস ও সততাকে সম্মান জানাতে না পারলে বড্ড এক আফসোস থাকবে। সেই সম্মান জানাতেই আমরা কতো যে কার্পণ্য করি! দেশের কোথাও কোনো ডাক্তারের ছোট কোনো ভুল হলে সকল ডাক্তারকে ‘কসাই’ বলতে আমরা এক মুহুর্তও কি দেরী করি? শিক্ষকের মাঝেও এমন আছেন যারা টাকা দিয়ে পাশ করিয়ে দেন কিংবা প্রশ্ন আউটে সাহায্য করেন, পুলিশে এমন মানুষ আছেন যারা অন্যায় করেন, ঘুষ নেন- তাই বলে পুরো শিক্ষক সমাজকে আমরা খারাপ বলিনা, সব পুলিশ অফিসারই অসৎ না। অথচ ডাক্তারের বেলায় ‘কসাই’ গালি সব ডাক্তারের গায়েই লাগে। ডাক্তারদের প্রতি কিছু মানুষের এক ধরণের এ্যালার্জি আছে- হিংসা এ্যালার্জি। তাদের সম্মান, তাদের শিক্ষা নয়তো তাদের বাড়ি, গাড়ির প্রতি এ্যালার্জি। অথচ যতোটা পড়াশোনা করে একজন বিখ্যাত ডাক্তার হতে হয়, যতোটা মেধাবী হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হওয়া যায়- ততোটা পরিশ্রম করলে আর মেধা থাকলে অন্য পেশাতেও কম সফল হয় না কেউ। আবার অনেকের মনে থাকে মেডিক্যাল কলেজে চান্স না পাওয়ার সুপ্ত কিন্তু চরম ক্ষোভ। গালি দিলে মনে হয় তাদের কিছুটা শান্তি লাগে। ভেবে দেখেছি কি কেউ যে অনেক ডাক্তারেরই পারিবারিক জীবন থাকেনা প্রায়, সামাজিক জীবনও নেই বললেই চলে। চেম্বারের পরও পরিচিতজন, বন্ধু-স্বজনদের ফোনে পরামর্শ দিতে দিতে তাদেরওতো ক্লান্তি লাগে। এই ফোনে পরামর্শ যদিও আমরা ফ্রি-ই নেই তবে একবার যদি ডাক্তার ফোনটা না ধরে তবেই কিন্তু ‘শালা কসাই’ বলে চিৎকার করে গালি দেই। গালি দিয়ে এখন আর মন ভরছেনা। তাই ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে আমরা ডাক্তারকে পিটিয়ে মেরে ফেলি। কি লজ্জা! আমরা মানুষ হবো কবে?

মানবসেবা ও দেশপ্রেমের শপথ নিয়ে যে সকল ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিরন্তন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের জন্য অফুরান ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আপনাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা আমার জানা নেই তবে মহৎ হৃদয় নিয়ে আপনারা আমাদের এবারও ক্ষমা করে আমাদেরই জীবন বাঁচাবেন- এই কামনা করি।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

সিলেট,প্রফেসর রুমেল এমএস পীর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close