• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

কনভালেসেন্ট প্লাজমা এবং ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা

প্রকাশ:  ০১ জুন ২০২০, ০১:১৯
ফারহানা নীলা

কোভিড আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে যাবার পর তাঁর রক্তে এন্টিবডি তৈরী হয়।আর এটাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেনি। এই কথাটাকে অনেকেই ভুল বুঝেছেন। ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গের চিকিৎসা করা হয়। কনভালেসেন্ট প্লাজমা ট্রায়াল হিসেবে ব্যবহারে কোনো নিষেধ নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বিএসএমএমইউ ট্রায়াল শুরু করেছে।

কেন এই কনভালেসেন্ট প্লাজমা?

আক্রান্ত রোগী সুস্থ হবার ২৮ দিন পর তার রক্তে তৈরী এন্টিবডি দিয়ে অন্য আরেকজনের কোভিডের উপসর্গ কমিয়ে আনতে পারে। কারণ যিনি বর্তমানে আক্রান্ত, তার এন্টিবডি তৈরী হতে কমপক্ষে চৌদ্দ দিন সময় প্রয়োজন। বাহির থেকে এন্টিবডি প্রয়োগ করলে শরীরের যুদ্ধ করার ক্ষমতা বাড়াতে পারে। কমতে পারে বিভিন্ন উপসর্গ।

একজন ডোনার তার প্লাজমা মাসে দুইবার দান করতে পারেন। ৪০০-৬০০ মিলি প্লাজমা একবারে নেওয়া হয়। ২০০ মিলি প্লাজমা একটা ডোজ। তারমানে মাসে সর্বোচ্চ ১২০০ মিলি প্লাজমা দান করা যাবে।

প্লাজমা রক্তের জলীয় অংশ। এটা পূরণ হতে ৪৮ ঘন্টা সময়ই যথেষ্ট। রক্তদানের চাইতেও সহজ প্রক্রিয়া। এ্যাফেরেসিস মেশিনের মাধ্যমে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়। বাকী রক্ত ডোনারের শরীরে ফেরত পাঠানো হয়। এই কাজটি করতে আনুমানিক সময় লাগে দেড় ঘন্টা।

তারপর টাইটার দেখে নিতে হয়। ১ঃ১৬০ টাইটার কাম্য। কথাটি হলো এমন যে, কত মাত্রায় তৈরী হয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা? ১ঃ৪০ মানে কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, সেক্ষেত্রে সেই প্লাজমা কোভিড রোগীর চিকিৎসার জন্য খুব উপকারে আসবে না।রোগী মুমূর্ষু হয়ে গেলে প্লাজমা থেরাপির সুফল পাওয়া কঠিন। আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর থেকে রোগী ফিরিয়ে আনাও কঠিন। অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখে প্লাজমা থেরাপির সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর এটা সম্পূর্ণ ভাবেই চিকিৎসকের কাজ।

অতি আবেগের বশবর্তী হয়ে প্লাজমার জন্য হাহাকার পড়তে দেখছি। মানুষ ভাবছে প্লাজমা দিলেই রোগী বেঁচে যাবে। বিভিন্ন মাপকাঠিতে মেপেই চিকিৎসক প্লাজমা থেরাপির সিদ্ধান্ত নেন। ওখানে স্বজনরা যদি চিকিৎসককে প্রভাবিত করতে যান,তাহলে তো বিপদ।

প্লাজমা দিলে তেমন কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয়তো নেই। কিন্তু আছেও তো! কোনো চিকিৎসাই কিন্তু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়া নয়।

ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা.....

যে কোনো ডোনারের থেকে রক্ত সংগ্রহ করে রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের মাধ্যমে এই প্লাজমা আলাদা করা হয়। এ্যাফেরেসিস করেও আলাদা করা হয়। তারপর প্লাজমা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়।তাপমাত্রা ভেদে ছয়মাস,এক বছর,পাঁচ বছর পর্যন্ত রাখা যায়।এটি একদম বরফের মতো কঠিন হয়ে থাকে। থয়িং মেশিনের মাধ্যমে গলিয়ে রোগীর দেহে প্রয়োগ করা হয়।

তফাৎ কি?

দুটোই প্লাজমা। সব কিছু একই রকম। পার্থক্য কেবল কোভিড আর নন- কোভিড।

কোভিড রোগীর চিকিৎসা করার জন্য আমাদের প্রয়োজন কনভালেসেন্ট প্লাজমা। মানে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যখন ডোনার। আর ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা যে কোনো ডোনারের প্লাজমা।

কোভিড রোগীর চিকিৎসা করতে আমাদের যে এন্টিবডি প্রয়োজন সেটা ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা থেকে পাওয়া যাবে না। নন- কোভিড ডোনারের প্লাজমা তাই কোভিড রোগীর চিকিৎসার জন্য নয়।

কোভিড রোগীর জন্য কেবল মাত্র সুস্থ হয়ে ওঠা কোভিড পজিটিভ মানুষের প্লাজমা।

বিপত্তি কোথায়?

আমাদের টেস্ট করার সংখ্যা অনেক কম। প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে আর বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকায় অনেকেই টেস্ট করছেন না।টেষ্ট করার পর অনেকেই রিপোর্ট সময়মত পাচ্ছেন না। কখনো কন্টামিনেটেড হয়ে যাচ্ছে স্যাম্পল। কখনো মিশে যাচ্ছে, হারিয়েও যাচ্ছে স্যাম্পল। অদক্ষ হাতে কালেকশন করার জন্য সঠিক রিপোর্ট আসছে না। এমনও হয়েছে দুইবার নেগেটিভ কিন্তু তৃতীয় বারে পজিটিভ। তারমানে কালেকশন করার প্রক্রিয়ার ভুল ছিল।

আরটি পিসিআর করলেও ৩০ শতাংশ ফলস নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে।

সেক্ষত্রে আমরা হয়তো অনেক ডোনারকেই হারিয়ে ফেলছি।

এইসব ক্ষেত্রে এন্টিবডি টাইটার করলে অংক মেলানো সহজ। যদি তার রক্তে কোভিডের এন্টিবডি পাওয়া যায়,তবে সহজেই অনুমেয় তিনি কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এন্টিবডি সনাক্ত এবং টাইটার করার সুযোগও আমাদের তেমন নেই।

যার ফলশ্রুতিতে নন-কোভিড রিপোর্ট দেখে প্লাজমা নিলে তিনি আক্রান্ত ছিলেন কিনা বোঝার উপায় নেই। প্রথম পজিটিভ রিপোর্ট না থাকলে এই প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে রোগীর উপসর্গ কমার আশাও তেমন নেই।

আবার অনেকেই না জানার কারণে ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা কিনে নিচ্ছেন স্বজনের জন্য। এই প্লাজমা তো কোভিড রোগীর প্লাজমা নয়। অতএব কোভিড চিকিৎসার জন্য কোনো ফলই আনবে না।

পরিশেষে বলি....

কারো ব্যবসার বিনিয়োগ হয়েন না। প্লাজমা নিয়ে ব্যবসা বন্ধ হোক। কেউ প্রতারিত হবেন না। প্লাজমা থেরাপির সিদ্ধান্ত চিকিৎসককে নিতে দিন। ডোনারের সন্ধান করুন। নির্ধারিত হাসপাতালে নিয়ম মেনে কালেকশন করা প্লাজমা গ্রহন করুন। যে কারো কাছ থেকে প্লাজমা নেবেন না।

যদি ডোনার না জানেন তিনি সত্যি আক্রান্ত ছিলেন কিনা,তাহলে এন্টিবডি পরীক্ষা করে সঠিকভাবে জানুন।

আমরা ক্রমশ আঁধারে ধাবমান। প্লাজমা থেরাপির সুফল আমাদের স্বজনের জন্য আশার আলো নিয়ে আসুক। আমরা বাঁচিয়ে তুলি জীবন নিয়ে সহমর্মিতা আর সদিচ্ছা।

যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন, জীবন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনারা বন্ধ চোখ খুলুন, আপনারা শুনুন.... ডাকছে জীবন। জীবনের আজ বড্ড অসুখ।

( সবার বোধগম্য করার জন্য এভাবে লেখা)

ফারহানা নীলা

৩১/০৫/২০২০

সহযোগী অধ্যাপক

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

(লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনাভাইরাস,ফারহানা নীলা,ফেসবুক স্ট্যাটাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close