• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

একটু পরিবর্তিত হই

প্রকাশ:  ১৬ মে ২০২০, ১৫:১৩ | আপডেট : ১৬ মে ২০২০, ১৫:১৬
ফারহানা নীলা

লকডাউন এই কথাটির সাথে তিনমাস আগেও কেউ জীবনের অনুষঙ্গ হিসাবে পরিচিত ছিল না। এখন এই শব্দটা ব্যাপক ব্যবহৃত। যেমন নাকি সঙ্গ নিরোধ, সামাজিক দূরত্ব... এই শব্দগুলোও বারবারই আসছে ঘুরে-ফিরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।

ঘরে থাকুন... কথাটা এখন বুলির মত। লকডাউন শব্দটিতে একটা রিদম আছে। রিদমিক উচ্চারণ করার একটা অনুভূতি আছে।সেটা হোক ধনাত্মক কিম্বা হোক ঋণাত্মক।

আচ্ছা কেন এই লকডাউন? অথবা লকডাউন দিয়ে আমরা আসলে কি চাইছি? অথবা লকডাউন করলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? লকডাউন করা কার্যকর করতে গিয়ে জানা গেলো ঘরে বন্দী দশা নিশ্চিত করতেই এটার প্রয়োজন। কিন্তু কতদিন, কতক্ষণ, কতকাল? দিনের পর দিন কি তবে লক হচ্ছে চলবে?

মানুষ ঘরে আবদ্ধ। খাবার নেই। কাজ নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। দিন মজুরের মজুরির জোগান নেই। অসুস্থতার চিকিৎসার বিড়ম্বনার শেষ নেই। জীবন তো একটা চলমান এবং ঘটমান প্রক্রিয়া। জীবনকে কতদিন থামিয়ে দেওয়া বা রাখা যায়? জীবনের থাকে নানাবিধ প্রয়োজন।

লকডাউন শিথিল আরেকটি নতুন শব্দ। দোকানপাট খুলছে। ব্যবসা বানিজ্য একটু একটু চলছে। গার্মেন্টস খুলছে। মসজিদ খুলছে। এভাবে খোলার আওতায় ধীরে ধীরে সবই আসতে হবে।

আচ্ছা কেন এই গৃহবন্দিত্ব আর কেনই বা লকডাউন? দু’টো শব্দের মূলকথা হলো সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। তার মানে একা হওয়া আর একা থাকা। নিদেনপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে শেখা।

এখন বিকেল পর্যন্ত খোলা দোকানপাট। ব্যাংক খোলা, কিছু অফিসও খোলা। আর হাসপাতাল, পুলিশ,আনসার, সেনাবাহিনী,সাংবাদিক.... ইনারা আবার চব্বিশ ঘণ্টা কর্মরত।

অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপক। মানুষ হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু আর নির্ভীক। তারা এসব কিছুই আর মানতে চাইছে না। কারণ প্রয়োজন এবং ক্ষুধা। আর কারও জন্য বেড়াতে বেড়ানোর উছিলা। যাদের উছিলা, তাদেরকে নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। কিন্তু যাদের সত্যিকার প্রয়োজন... তাদের জন্য ভাবতে হবে।

কোনও নির্দিষ্ট সময় খোলা রাখবার কথাটা যদি বাদ দেই, কারণ করোনাভাইরাস রাতদিন বোঝে না। ঝোপ বুঝে কোপ মারে। ধরা যাক, আড়ং,স্বপ্ন, মিনা বাজার, ওষুধের দোকান, বড় বড় শপিংমল.... এগুলো কিছু নাম! ২৪ ঘণ্টাই খোলা রাখা হলো। লাভটা কি তাতে? আপনি যদি আগে থেকেই বুকিং দেন কখন যাবেন? মানে ধরা যাক প্রতি বার দশজন ঢুকতে পারবেন। তাহলে এই দশজন সেই নির্দিষ্ট সময়ে থাকবেন ওখানে। অন্যরা কেউ ভিড় জমাবেন না। তাতে সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাবে। পরবর্তী দশজন আবার তারপরের স্লটে.... এভাবে দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। আর প্রয়োজন মেটানোও সম্ভব।

ব্যাংক, গার্মেন্টস.... এসব জায়গাও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তাহলে লাভ হলো বিশাল লাইন তৈরি হবে না। মানুষ এমনিতেই দূরত্ব বজায় রাখতে পারবে এবং শিখবে।

এগুলো করতে পারাটা খুব কঠিন কিছু নয়। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের যদি নিজস্ব সিস্টেম তৈরি করা যায়, ডিজিটাল কোনও এ্যাপ ব্যবহার করা যায়.... তাহলে ক্রেতা-ভোক্তা সকলেই জানতে পারবেন কোন সময়টাতে তিনি সেখানে কাজের জন্য যাবেন।

ডাক্তারের চেম্বারে সিরিয়াল দেওয়া হয়। সিরিয়াল দেখে রোগী দেখা হয়। এখানেও এমন সিরিয়াল দেখে আসতে বললে সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব হয়তো কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা সম্ভব।

তার মানে কিছুই বন্ধ নেই আর। সব খোলা। শুধু আপনাকে জেনে নিতে হবে কোন সময়টা, কতটা সময়... আপনার জন্য বরাদ্দ। চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকতে হবে। সবখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ নেই। সিলিন্ডারই ভরসা। কোভিড১৯ আক্রান্ত রোগীর প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেন সময়মত দিতে পারলে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর.... এসব হয়তো খুব কমই লাগবে। কিন্তু অক্সিজেন চাই, চাই-ই।

বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি গাড়ী রিক্যুইজিশন করা হয়। এটা প্রয়োজন মাফিক করা হয়। আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা যদি অক্সিজেনের বিষয়টি একটা কোনও নির্দিষ্ট বা সেন্ট্রাল কোনও প্রতিষ্ঠানের আওতায় আনতে পারি, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন সরবরাহ সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে যদি বলি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অক্সিজেন সিলিন্ডার দান না করে সবগুলোই এক ছাতার নীচে রাখি। বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আছে সিলিন্ডার, ক্লিনিকে আছে। সরকারি হাসপাতালে আছে। সবগুলোই একখান থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারলে রোগী বান্ধব সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়তো যাবে। ফুরিয়ে গেলে আবার রিফিল করে একইভাবে সরবরাহ করাও যাবে।

বেসরকারি হাসপাতালে এখন অন্যান্য রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ তেমন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন না। তাদের অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো এখন কোভিড১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য রিক্যুইজিশন করা যেতেই পারে। আর তাদের রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চাহিদা মোতাবেক তারাও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসতেই পারেন।

ঘরে আছি আমরা... কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘরে থাকা সম্ভব নয়। বুদ্ধি দিয়ে, সচেতনতা দিয়ে, সাবধানতা দিয়ে আমাদের বাঁচা শিখতে হবে। করোনা কতদিন থাকবে, কবে যাবে, আবার ফিরেফিরে আসবে কি-না.... আমরা কেউ জানি না।

জনসমাগম আর করা যাবে না আপাতত। তিনজন, পাঁচজন, দশজন..... এমনভাবেই সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আড্ডাও দিতে হবে ছয় ফুট দূরে থেকে। এখন আমাদের কাছাকাছি বা পাশাপাশি থাকার সময় নয়।

দাওয়াত, সিনেমা হল, বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিন, চেহলাম, মিলাদ, মসজিদ..... এড়িয়ে চলতে হবে। আর আমরাও আর কেউ এমন কোনও অনুষ্ঠান করবো না, যেখানে অনেক মানুষের সমাগম করতে হবে।

মসজিদে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু নামাজের সময় নির্দিষ্ট, জামাতের কাতারের নিয়ম আছে। সেক্ষেত্রে ভাগভাগ করে নামাজ আদায় করা যায়। যেই দশজন ফজর পড়বেন মসজিদে, তারা জোহর পড়বেন বাসায়। অন্য দশজন জোহর পড়বেন মসজিদে।

এসব সবই আপদকালীন ভাবনা। আপদকালীন সময়ে নিজেদের সাময়িক ভাবে অন্যধারায় অভ্যস্থ করার প্রয়াস। সুদিন এলে, করোনার পরাজয় হলে, আমাদের জয় হলে.... আমরা আবার ফিরে পাবো হারানো সময়। তখন হয়তো আমাদের অনেকেই থাকবে না জীবনে,হয়তো বদলে গেছে জীবনের অনেক কিছুই! আমরা এখন যে সময় পাড়ি দিচ্ছি.... অত্যন্ত বিপদসংকুল পথ এটা।

একটু হোঁচট খেলেই খাঁড়া নেমে যাবো খাদে। তার চেয়ে বরং একটু বদলে নেই নিজেদের, একটু শুধরে নেই আপদকালীন ভুল। আর আলো আসবেই.... এই প্রত্যাশা জিইয়ে রাখি ততদিন।

জীবন আর জীবিকা.... এই নিয়েই তো চলতে হবে আগামীর পথে।সুস্থ আর অসুস্থ.... দু’টোই আমাদের কার্যকলাপের সাথে সম্পৃক্ত। আমরাই তবে ঠিক করি.. কেমনটা চাই?

এখন কিন্তু আমরা অনেকেই বিশ সেকেন্ড হাত ধোয়া রপ্ত করে ফেলেছি। রপ্ত করেছি মাস্ক পরা। আসলে মানুষ অভ্যাসের দাস.... কথাটায় কোনও ভুল নেই। আর পেটে খেলে পিঠে সয়.... এই প্রবাদটাও তো মিথ্যে নয়।

(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

ফারহানা নীলা,করোনা,ভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close