• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

বারবার উঁকি মেরে দেখে আসি- ঠিক আছে তো? বেঁচে আছে তো?

প্রকাশ:  ০৩ এপ্রিল ২০২০, ১০:৩৪
জেসমিন চৌধুরী

অনেকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনার ছেলের টেস্ট করিয়েছেন?’

একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত বোধ করলেও আমি বিরক্ত হই না। পৃথিবীর উন্নততম দেশের একটিতে বাস করেও এতোটা অসুস্থ একজন মানুষের টেস্ট হয় না কীভাবে, তা আপনারা কেমন করে বুঝবেন? বরিস জনসন সরকারের একটা রাজনৈতিক ভুলের কারণে, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতার কারণে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো আমার ছেলেরও করোনা টেস্ট করানো সম্ভব হয়নি। ঘরে ঘরে তারই মতো উপসর্গ নিয়ে বসে থাকা অসংখ্য ডাক্তার এবং নার্সরাও টেস্ট না হবার কারণে কাজে ফিরতে পারছেন না।

সে যা ই হোক, এ পর্যন্ত করোনা নিয়ে যেটুকু পড়াশোনা করেছি তা থেকে নিঃসন্দেহে বলতে পারি মিরাজের করোনা ইনফেকশন হয়েছে। আটাশ বছরের জীবনে কখনো একটানা নয়দিন ধরে এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে দেখিনি তাকে, এতোটা অসুস্থ হতেই দেখিনি কখনো। জ্বর, কাশি, সায়নাসের সমস্যা, নাক দিয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ, প্রচন্ড ক্লান্তি, শ্বাস নিতে কষ্ট, উঠে বসতেও অনিচ্ছা এবং অক্ষমতা- করোনা ছাড়া আর কী?

আজ দুইদিন ধরে নাকের রক্তক্ষরণ হালকা হয়ে এসেছে। সে উঠে বসেছে, কিছুটা হাঁটাচলাও করছে, কিন্তু কিছুক্ষণ চলাফেরা করার পরই প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মাঝে মধ্যে শ্বাস নিতে কিছুটা কষ্টও হয়। এখনো রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারি না আমি, বারবার তার কামরার সামনে গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসি- ঠিক আছে তো? বেঁচে আছে তো? শ্বাস নিচ্ছে তো? একজন মা হিসেবে এমন দুশ্চিন্তা জীবনে কখনো বোধ করিনি।

অনেকে বলছেন, 'টেস্ট না করিয়ে করোনা হয়েছে' বলা ঠিক না। আমি মনে করি এই রোগের বেলায় এই কথাটা খাটে না। ক্যান্সার, হৃদরোগ ইত্যাদি শনাক্ত না করে যেমন আপনি সঠিক চিকিৎসা নিতে পারবেন না, ঠিক তেমনি এসব ক্ষেত্রে যদি সঠিক সময়ে রোগ ধরা না পড়ে আপনি নিজে হয়ত মরবেন কিন্তু সাথে আরও এক হাজার জনকে মারতে পারবেন না।

কোভিড-১৯ অন্য জিনিস। বর্তমান পরিস্থিতিতে এর টেস্ট কোনো দেশেই সহজলভ্য নয়, এবং সংক্রমণ এড়াতে সন্দেহভাজন রোগীদেরকে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে যেতেও নিষেধ করা হচ্ছে। কাজেই উপসর্গ দেখা দিলে করোনা হয়েছে ভেবে সতর্ক থাকাটাই নিরাপদ।

আমি একজন সম্ভাব্য করোনা রোগীকে কীভাবে সামাল দিয়েছি তা শেয়ার করতে অনুরোধ করেছেন অনেকে।

প্রথমত, মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন ইউকেতে করোনা নিয়ে হুলুস্থুল শুরু হলো তখনই আমি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখতে পেরেছিলাম বলে মিরাজের উপসর্গ দেখা দেয়া মাত্র সম্পূর্ণরূপে আইসোলেশনে যেতে পেরেছি পুরো পরিবারকে নিয়ে। অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্যে মাস্ক, গ্লাভস, এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার পড়ে না কারণ এগুলো অনেক আগেই বাজার থেকে উবে গিয়েছিল।

মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে যখন অপু কাশতে শুরু করলো, বরিস জনসন করোনা নিয়ে সিরিয়াস হতে শুরু করলেন, এবং অবশেষে স্কুলগুলোও বন্ধ হয়ে গেল, আমরা তখন একটা ফ্যামিলি মিটিং করে জরুরি করোনা পরিকল্পনা তৈরি করলাম। আমাদের তিনতলা বাসার ডিজাইনটা আইসোলেশনের জন্য খুবই উপযুক্ত। প্রতি তলায় একটা করে টয়লেট থাকাটাই সবচেয়ে বড় সুবিধার বিষয় বলে মনে হলো। ঠিক করা হলো অপুর বা আমার একজনের উপসর্গ দেখা দিলে দুজনেই মাস্টার বেডরুমে আইসোলেশনে যাব, কারণ আমরা এক বিছানায় ঘুমাই। একজনের হবার মানেই হলো অন্যজনের হবার অপেক্ষা মাত্র। মিরাজ বা ইলার হলে তিনতলায় আইসোলেশনে রাখা হবে, তিনতলার টয়লেটটা সেক্ষেত্রে অন্য কেউ ব্যবহার করবে না। যুদ্ধ প্রস্তুতি হিসেবে আমি বাসার সব আসবাব পত্র, মেঝে, এবং দরজার হাতল ব্লিচযুক্ত পানি দিয়ে পরিষ্কার করলাম।

বাসার ভেতরে স্যোশাল আইসোলেশনের নিয়ম ঘোষণা করা হলো, ইলা বারবার নিয়ম ভেঙ্গে বকুনি খেতে থাকলো। তখনো বুঝতে পারিনি যে যুদ্ধটা আসলেই লড়তে হবে, এবং প্রথমেই আক্রান্ত হবে আমার ডানহাত মিরাজ, ব্রেন হেমারেজ হবার পর থেকে যার সাহায্য ছাড়া ঘর সংসার সামলানো আমার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মিরাজ আইসোলেশনে গেল। উপরের তলার বাথরুমে ইলার যা‌ওয়া নিষিদ্ধ করা হলো। আমি এবং ইলা সিঁড়িতে বসে তার সাথে সময় কাটাই। আমি রান্না করতে নিচে গেলে ইলা কিছুক্ষণ বসে। তাকেও আবার ঘরে বসে অফিসের কাজ করতে হয়, জরুরি সব মিটিং করতে হয়।

দেখতে দেখতে মিরাজের শরীর বেশ খারাপ হয়ে গেল, তবু শুনি সে বারবার ইলাকে ডেকে বলে, ‘তোমরা মাকে সাহায্য করছ তো? এতোগুলো মানুষের রান্নাবান্না, সারাদিন কত বাসন নোংরা হয়, আমার দেখাশোনা- মা কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

ইলা যখন এসে বলে, ‘মা তোমার হেল্প লাগবে?’ আমি হেসে জিজ্ঞেস করি, ‘তোমাকে কি মিরাজ পাঠিয়েছে?’ সেও হাসে, ‘ও বলেছে, অবশ্য না বললেও আমি আসতাম’।

ঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি বারবার তিনতলায় যাই, কিন্তু কামরার ভেতরে ঢুকি না। সিঁড়িতে বসে বসে ফেসবুকে পোস্ট লিখি, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মিরাজের সাথে আলোচনা করি, হাসিঠাট্টা করি। হাসতে গিয়ে ওর কাশি বেড়ে গেলে চেহারার উদ্বেগ ঢাকতে চেষ্টা করি। দরজার বাইরে খাবার রেখে সরে গেলে ও কোনোমতে কষ্ট করে উঠে খাবারটা বিছানায় নিয়ে যায়। সিঁড়িতে বসে দেখি- তার হাতের টিস্যু রক্তে ভিজে যাচ্ছে। গরম পানি এনে দিই ভাপ নেবার জন্য। হট ওয়াটার বটল ভরে নিয়ে আসি। স্যুপ বানিয়ে নিয়ে আসি। ফল কেটে নিয়ে আসি। আদা চা, মধু আর লেবুর রস দেয়া গরম পানি, ভিটামিন সি, কমলা। নিচের তলা থেকে তিন তলা উঠানামা করতে করতে ঘরের ভেতরেই আড়াই কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়, কে বিশ্বাস করবে? ছেলে যে কোনো মুহূর্তে কল করতে পারে ভেবে ফোনটা গলায় ঝুলিয়ে রাখি বলে গুগল ফিটের হিসেবে কোনো ভুল হয় না। আড়াই কিলোতে অতৃপ্ত আমি আবার এক ফাঁকে পার্কে আরো পাঁচ/ছয় কিলোমিটার হেঁটে আসি। দুশ্চিন্তা তাড়াতে হাঁটা একটা ভালো ওষুধ হলেও এই পরিস্থিতিতে খুব একটা কাজে আসে না।

এর মধ্যে আবার ইলার আক্কেল দাঁত উঠতে শুরু করেছে, গাল ফুলে ঢোল। আজকাল নিয়ম ভেঙ্গে ডাক্তাররা টেলিফোনে এন্টিবায়োটিক দিচ্ছে, তাই রক্ষা। গত দুইদিনে দুই বাচ্চার জন্য দুইবার ফার্মেসিতে যেতে হলো। নিজে ঠিক না থাকলে তাদের দেখাশোনাটা এভাবে করতে পারতাম না। তাই নিজের দেহের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করি, সময়মতো সে ভালোই সার্ভিস দিয়েছে। অবশ্য সামনে কী ঘটে তা বলা যায় না।

আজ মিরাজের আইসোলেশনের অষ্টম দিন। অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা ভালো তা স্বীকার করতেই হবে। তবু দুশ্চিন্তা দূর হয় না। শুনেছি অনেক রোগীর অবস্থা ভালো হতে হতে আবার খারাপের দিকে চলে যায়। কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও একেবারে গা ছেড়ে দিইনি। এখনো চোখ রাখছি। ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার ভালোমতো ভাপ নেবার ব্যবস্থা করলাম। ভাপ নিতে নিতে চোখ তুলে মিরাজ বলল, ‘তোমার দেখি কোনো অসুখ হচ্ছে না মা? অদ্ভুত কাণ্ড!’

বিছানায় শুয়ে শুয়ে লিখছি আর থেকে থেকে তার কাশির শব্দ শুনছি। এই নির্ঘুম রাত আমার জন্য কয়েক ঘণ্টা পরেই আশা করি কেটে যাবে, একই আকাশের নিচে আরও অনেকের হয়ত সেই সৌভাগ্য হবে না। কেমন অনুভব করব, বুঝতে পারি না।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

জেসমিন চৌধুরী,করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close