• শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

অসমাপ্ত

প্রকাশ:  ০১ এপ্রিল ২০২০, ০১:২৪ | আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২০, ০১:২৮
ফারহানা নীলা

রুদ্রদীপ

হঠাৎ এভাবে বদলে যাবে আমাদের চেনা এই শহর আগে বুঝিনি। বদলে গেছে পৃথিবী। ক্রমাগত বদলে যাচ্ছে জীবনের সব পরিচিত মুখ, সব পথ ঘাট। হঠাৎ করেই বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হয়ে গেছে পথটা। সৈকত জুড়ে লাল কাঁকড়ার মিছিল। ডলফিনদের আনাগোনা সৈকতে। কাছিমের ডিমের পর ডিম স্তুপ। আচমকা হরিণের দল আমার চেনা পথে। নাম না কত শত পাখীর কিচিরমিচির।

রুদ্রদীপ,

এখনোতো আমাদের অনেক কথা আছে বাকী। বলবো বলবো করে কেটে গেছে কতটা সময়... বল তো! না বললাম আমি, না বললি তুই! এই যে তোর জন্য আমার মন কেমন করে! এই যে তোর সাথে কথা না বললে আমার মন পোড়ে... বলা হলো না। একসাথে আবৃত্তি করবো বলে কতগুলো কবিতা বেছে রেখেছি, একসাথে দেখবো বলে মুভির লিষ্টটা ক্রমশ বড় হলো। আমাদের একসাথে সূর্যোদয়ের সময় কিছু গোপন কথা বলার ছিল। কুয়াকাটা বেড়িয়ে এলাম সেদিনও, অথচ আমরা সূর্যোদয়ে চোখ বুঁজে থাকলাম। কেন বল তো? ঐ যে আমাদের মত করে দেখবো সূর্যোদয়!

রুদ্রদীপ,

এবার শীতে তোর মাফলারটা সেলাই শুরু করলাম। মেরুন রং উলে কাঁটার কি ক্ষিপ্র গতিতে বুনতে থাকি আমি। শহরটাকে ফাঁকা লাগে। তুই কি জানিস, তুই না থাকলে এই শহরে আমার দম আটকে আসে। আমাদের হয়তো দেখা হয় না, কথাও হয় না। তবুও জানি তুই আছিস... এই ভাবনা আমায় ভরে রাখে। আমি জানি তুই সবই বুঝিস! তবুও তুই কেমন জানি ছন্নছাড়া!

আমরা কখনো ভালবাসার কথা বলিনি।

অনেক কিছু নিয়েই কথা হয়েছে আমাদের! এই যে বনসাইয়ের দুখ, ঝরা বকুলের দুখ, কুশির সুখ, সবুজের আড়াল, জোছনার রুপালি আলো...কত কথা!

হাজার চুরাশির মা পড়ে খুব কেঁদেছিলাম তোর কাছে। আর ঐ যে মাথাটা খেলো মাধবীলতা! ন হন্যতে পড়তে পড়তে মনে হলো ওটা আমি! তোকে অবশ্য মোটেই মির্চা মনে হয়নি আমার!

রুদ্রদীপ,

তোকে একটা চিঠি লেখার কথা ছিল আমার। আসলে কথাটা যে কার সাথে কার?

বদলে যাওয়া শহরে অবরুদ্ধ বাস আমাদের। না পারি আমি যেতে, না পারিস তুই আসতে!

আর এখন তো তোর আসা বারণ। আমি জানি চাইলেও তোকে কেউ আসতে দেবে না আমার কাছে।

শোন,

এই ঘরটায় অনেক জানালা, দরজা দুটো। অনেক বাতাস খেলা করে। আমি জানালা খুলে রাখি, দরজা খুলে রাখি। তবুও বাতাসের বড় অভাব। অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে রুদ্র.....

সময় বড় তাড়া দিচ্ছে। আমার তো লেখা শেষ হলো না! আমার তো তোকে অনেক কথা বলার ছিল....

এম্বুলেন্সের শব্দ পাচ্ছি। আমার এখানেই আসছে বোধ করি। খবরটা আমিই দিয়েছি।

হাসপাতালে গেলে একটা গতি হবে। নইলে তো এই ঘরে কেউ ছোঁবে না আমাকে! তাই ভাল....

রুদ্র,

একবার তোকে ছুঁতে বড় ইচ্ছে করছে। বড় ইচ্ছে করছে....

তোর চুলের ঘ্রাণ আমার ঘর জুড়ে, তোর স্পর্শ আমি টের পাচ্ছি.... রুদ্র কেন এলি? কেন এভাবে এলি তুই?

আমাকে ছুঁয়ে দিলি তুই!

পালা রুদ্র... পালা... এখানে বাতাস নেই, এখানে আকাশ নেই, এখানে জীবন নেই!

পালিয়ে যা রুদ্র, পালিয়ে যা।

"কল্পনার হাঁস সব--- পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রঙ মুছে গেলে পর উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের শব্দহীন জোছনার ভেতর"

"বুনোহাঁস পাখা মেলে--- শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার; এক-- দুই--তিন---চার----অজস্র--- অপার -----""

জীবনানন্দ দাশের কবিতাটা শোনাবি রুদ্র.... বুনোহাঁস!

আবার কখনো যদি আসি আমি ফিরে, বিশ্বাস কর তোকে চিনবো না, কখনোই চিনবো না... তোকে আমার অসহ্য লাগে। ভীষণ অসহ্য তোর এই ছুঁয়ে থাকা, ঘিরে থাকা!

আর জন্মে আমি তোর হবো না... তুই কিন্তু আমার থাকিস!

বাতাস ফুরিয়ে আসছে আমার... এত বাতাস অথচ আমার বাতাসটা শেষ হয়ে যায়...

** একটি অসমাপ্ত চিঠি অথবা চিঠি নয়

#নীল_কথন

(লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ফারহানা নীলা,ফেসবুক স্ট্যাটাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close