• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

গরীবের ডাক্তার লিটু (২য় ও ৩য় পর্ব)

প্রকাশ:  ১৫ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৯ | আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৪৩
ডা. মাহবুবর রহমান
ডা. লিটু

বাংলাদেশ থেকে অনেক ডাক্তার চাকরী নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যান। তাঁদের মধ্যে অনেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী আছেন। তাঁদের যথার্থ মূল্যায়ন সেসব দেশে হয়না। কিন্তু একই মানের বিলেতী ডিগ্রীধারীদের বেতনভাতা পদপদবী অনেক উচ্চতায় ধার্য করা হয়। এটা নিয়ে এদেশের ডাক্তারদের মধ্যে একটা হতাশা আছে। মধ্যপ্রাচ্য , এমনকি ভারতেও বিলেতের এমআরসিপি, এফআরসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র আছে। সেসব দেশের ছেলেমেয়েরা বাড়িতে বসেই অল্প খরচে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু দেশের একটি বেসরকারী পেশাজীবী কলেজের একাংশের বিরোধিতার কারণে এই পরীক্ষার কেন্দ্র খোলা সম্ভব হচ্ছিল না।

বিষয়টি নিয়ে অনেক তরুণ চিকিৎসক লিটুর কাছে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিল। দেশে যদি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চালু থাকতে পারে, যাদের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে ইংল্যান্ডের কিছু বোর্ড, তাহলে রয়াল কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স/সার্জন্স এর কেন্দ্র খুলতে বাঁধা থাকা সংগত নয়। আর পাশাপাশি একটি বিশ্বস্বীকৃত ডিগ্রীর কেন্দ্র থাকলে দেশের শিক্ষামান ও পরীক্ষাপদ্ধতির একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। তাতে আমাদের ডিগ্রীর মান ও স্বীকৃতি বৃদ্ধি পাবে।

ব্যাপারটা ভাল করে স্টাডি করা হল। ডা রেজা ভাই অনেক তথ্য উপাত্ত দিয়ে, রয়াল কলেজের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে অনেক সহযোগিতা করলেন।

‘পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডক্টরস এসোসিয়েশন’ এর ব্যানারে লিটু আদাজল খেয়ে লেগে পড়ল। দফায় দফায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের সাথে মিটিং হল, সেখানকার উপদেষ্টা কহিনূর মার্কার যথেষ্ট সহযোগিতা করলেন। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল লিটুর কাজের বিরোধিতা করতে থাকল। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ , তার লক্ষ্য ছিল অটুট এবং স্বার্থহীন। তাই দীর্ঘ পরিশ্রম এবং বলতে গেলে প্রায় একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে রয়েল কলেজের কেন্দ্র স্থাপিত হল। এখন আমাদের ছেলেমেয়েরা চাইলেই এমআরসিপি, এফআরসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, নিজেদের মানকে বিশ্বমানে উন্নীত করবার একটা সুযোগ পেয়ে গেছে।

যখন লিটু এই আন্দোলনটির সূচনা করে তখন ইতিমধ্যেই সে স্নাতকোত্তর এমডি ডিগ্রী করে একজন সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট। তার নিজস্ব কোন স্বার্থ এখানে ছিল না। লিটু হল সেই রাখাল ছেলে যে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোয় দ্বিধাহীন নিঃশঙ্ক চিত্ত।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি জগাখিচুড়ি অবস্থা। এখানে বাংলা মাধ্যম, ইংরেজী ভার্সন, ইংল্যান্ডভিত্তিক ইংরেজী মাধ্যম, আরবী মাধ্যমের সাধারণ মাদ্রাসা এবং কওমী মাদ্রাসা পাশাপাশি অবস্থান করছে। কোন সমন্বয় নেই, সমতা নেই, জবাবদিহিতা নেই, মান থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। তেমনি স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষায়ও এক অরাজক পরিস্থিতি। এমবিবিএস পাশের পর এক থেকে দুই বছরের ডিপ্লোমা, দুই থেকে পাঁচ বছরের এমফিল, এমপিএইচ, এফসিপিএস, এমডি, এমএস, পিএইচডি ডিগ্রীসহ অজস্র ডিগ্রীর সমাহার। কারো সাথে কারোর সমন্বয় নেই, সবাই ভাবে আমি বড়, তুই ছোট। ফলশ্রুতিতে অশিক্ষিত, আধাশিক্ষিত আমজনতা বিভ্রান্তির জালে আটকে যায়, প্রতারিত হয়।

অথচ ইউরোপ আমেরিকাসহ আধুনিক বিশ্বে এতসব ডিগ্রীর ছড়াছড়ি নেই। আমেরিকায় সবাই এমডি। ইউরোপে এমবিবিএস এর পরে স্নাতকোত্তর সবাই এমডি। কোন অস্পস্টতা নেই। প্রতারনার সুযোগ নেই।

ধারাবাহিক চিকিৎসা শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোবাইল টেকনোলজি ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রের মত দ্রুত পরিবর্তনশীল অন্য আর কোন বিজ্ঞান নেই। আজকে যা সত্য কালকে তা সত্য নাও থাকতে পারে। প্রতিদিন নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার হচ্ছে, পুরাতন ওষুধের ব্যবহার বাতিল হয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ হচ্ছে। এই নিয়ত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে তাই ধারাবাহিক অবিরাম গবেষণা এবং চিকিৎসা শিক্ষা একটি অত্যাবশ্যক উপাদান।

সময়ের এই দাবীকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছিয়ানব্বইয়ের আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর দেশের পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা শিক্ষার সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই লক্ষ্যে গঠিত কমিটি কোর্স কারিকুলাম ও বিভিন্ন ডিগ্রীর সমন্বয় করার প্রস্তাব করে। তারা পাঁচ বছর মেয়াদী চালু থাকা প্রতিষ্ঠিত এমডি এমএস ডিগ্রী বাতিল করে ভারতের অনুকরণে এমডি, ডিএম চালু করার প্রস্তাব করে। কিন্তু অত্যন্ত সুকৌশলে বেসরকারী পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানটির ডিপ্লোমা চালু রাখার ব্যবস্থা বহাল রাখে। স্নাতকোত্তর কোর্স এবং ডিগ্রীসমূহকে একটি স্রোতে এনে সমন্বিত করবার প্রচেষ্টা না চালিয়ে বিভক্তি এবং বিচ্ছিন্নতাকে অব্যাহত রাখা হয়। অর্থাৎ মূল সমস্যা পাশ কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর লক্ষ্যকে পথভ্রষ্ট করার ফন্দি ফিকির জারী রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে দাঁড়ায় পেশাজীবী কলেজটির ডিপ্লোমা দেয়ার মূল প্রতিষ্ঠান।

এই দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডক্টরস এসোসিয়েশন ডা লিটুর নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। দেশের স্বার্থে লিটু নিজের পেশা, ক্যারিয়ারের তোয়াক্কা না করে সময় শ্রম মেধা অর্থ পরিবার সবকিছু বিসর্জন দিয়ে একটি ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এবং একসময় আন্দোলনের যৌক্তিক তীব্রতায় কুচক্রীমহল পিছু হটতে বাধ্য হয়।

আজ বাংলাদেশে আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসা যতখানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পেছনে লিটুর জীবন নিঃশেষ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৩য় পর্ব

জজ গলির সাত নম্বর বাড়ির মেইন গেইটের দরজায় এক এনালগী তালা।বাড়ির ভেতর টু শব্দ নেই। ভাবলাম গলির মুখে যাই। রফিক মিয়ার দুধ চায়ের স্বাদ অনেকদিন নেইনি। বলা হয় চা বানানো সবচেয়ে সোজা কাজ। আমি একমত নই। চা বানানো সবচেয়ে কঠিন রান্না। কতটুকু পানি কতক্ষণ, কত তাপমাত্রায় গরম করতে হবে, কোন্ সময়ে চা পাতা দিতে হবে, চা পাতা দেবার পর কতক্ষণ আগুনের আঁচে রাখতে হবে, তারপর কোন্ সময়ে কতটুকু দুধ ঢেলে দিয়ে আঁচ দিতে হবে- সে এক কঠিন পরীক্ষা!

গেইট দিয়ে বের হয়ে বাম দিকে পা বাড়াতেই একটা হুডতোলা রিকসা এসে ঝট করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সেই রিকসা দিয়ে যে নামল সে চেনাজানা লিটু নয়। মুখে স্বলজ্জ একপ্রস্থ ‘ধরা পড়ে যাওয়া’ হাসি দিয়ে , “ আরে বড়দা, কখন আসলেন? একটা ফোন দিবেন তো! “-এই কথা বলে হুডতোলা রিকসার দিকে মুখ করে বলল, “ আসেন, আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই... শিমু, ইনি আমার সেই বড়দা।”

হুডতোলা রিকসার ভেতর দিয়ে আরেক ‘ধরা পড়া’ ফুলপরী ব্যস্ত ত্রস্ত হয়ে নেমে বলল, “ স্লামুয়ালাইকুম ভাইয়া! ভাল আছেন তো? আপনার কথা ও সবসময় বলে। “

আমি কপট রাগে বললাম, “ না ভাল নেই! তোমাদের জন্য রফিক মিয়ার দুধ চা খেতে পারলাম না। শাস্তিস্বরূপ চল যাই চাইলুং চাইনিজ খেতে যাই।”

রফিক মিয়ার দুধ চা চাইলাম, আর পেলাম চাইলুং চাইনিজ! সঙ্গে দুই ‘ধরা পড়া‘ অপরাধী পরস্পরের দিকে চাওয়া চায়ি করে বাধ্য ছেলেমেয়ের মত রওনা দিল।

কিন্তু যেমনটা আমরা ভেবেছিলাম ফাল্গুনের নরম হাওয়া তেমন করে গুনগুন গান গাইল না। চৈত্রের তেজে পাত্রীপক্ষের চেতন অতিরিক্ত কড়া হতে হতে পুরোপুরি লোপ পেয়ে গেল। তারা কোন মতেই প্রজাপতির আগমনকে স্বাগত জানাল না। অতএব বৈশাখের বিদ্রোহ সমাগত।

ছুরির ফলার মত সূর্যের তপ্ত রশ্মি দিকে দিকে চিকচিক করছে। কৃষ্ণচূড়ার সবুজ চূড়ায় সেই রশ্মি দেয়াশলাই কাঠি হয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সেই আগুন যাদুরকাঠি হয়ে ছোপ ছোপ রক্তের মত ফুল ফুটিয়ে চপলা কিশোরীর খিলখিল অট্টহাসিতে চরাচর কাঁপিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

রমনার বটমূলে বাঙালির নাড়িমূল শেকড় গেড়েছে। পিপীলিকার মত পিলপিল জনস্রোত সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। বৈশাখের সঙ্গে ব্যাকুল বকুলের কোন সম্পর্ক আছে তা আগে জানা ছিল না। নববর্ষের তীব্র দাবদাহের দ্রোহে ঘন পল্লবিত বকুল তার সবুজ শীতল পাখনা মেলে ধরেছে। অপেক্ষমান বকুলবীথির সেই থরথর কম্পমান ঝিরিঝিরি হাওয়ার পালকিতে ভেসে শিমু নতমুখে এসে দাঁড়াল। তার যা হারাবার তা সব হারিয়েছে। শুধু শর্তহীন একখানি হাত অপেক্ষায় ছিল তার।

আমি বললাম, “ছোটদা, আর দেরি কেন? সর্বহারার সর্বস্ব হারাবার এই তো সময় !”

লিটু অগত্যা মুখে ‘এত তাড়াহুড়ার কী দরকার ছিল বড়দা’ ( আর মনে মনে ‘ শুভকাজে দেরি করতে নেই বড়দা’) বলে বকুলের গহীন গন্ধভরা একটি গোলাপী রুমাল উন্মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দিল।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

গরীবের ডাক্তার লিটু,ডা. মাহবুবর রহমান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close