• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

দিয়াজ হত্যা ও কিছু হাহাকার

প্রকাশ:  ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:১৪
রায়হান উল্লাহ

২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক এবং সংগঠনটির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্মসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর ফটক এলাকার নিজ বাসায়।

পরদিন ২১ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে তার প্রথম ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. জাহেদুল হাসান ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তিনি ছাড়াও ওই বিভাগের আরো দুই চিকিৎসকের স্বাক্ষর রয়েছে।

২৩ নভেম্বর পুলিশ জানায়, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে এমন আলামত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তখন ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দিয়াজের পরিবারসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি অংশ। তারা বলেন, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই।

২৪ নভেম্বর দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী বাদী হয়ে চট্টগ্রামের আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপুসহ ১০ জনকে আসামি করা হয় এবং আদালতে লাশের পুনঃময়নাতদন্তের আবেদন করা হয়।

আদালতের নির্দেশে ১০ ডিসেম্বর কবর থেকে দিয়াজের লাশ তুলে পুনঃময়নাতদন্ত করা হয়। লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সিনিয়র এএসপি হুমায়ুন কবিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

৩০ জুলাই সিআইডি কর্মকর্তা এএসপি হুমায়ুন কবির জানান, দিয়াজের পুনঃময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে শ্বাসরোধে হত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ ২৭ নভেম্বর দিয়াজের খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে কাফনের কাপড় জড়িয়ে অনশন করেন তার মা জাহেদা আমিন চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চত্বর ও শহীদ মিনার এলাকায় দু’দফায় তিনি অনশন করেন।

অনশন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হুদা এলে দিয়াজের মা বলেন, এক বছর হয়ে গেছে আসামিদের গ্রেফতার করা হয়নি। তারা নানাভাবে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। আমি ছেলের কবরের মাটি শপথ করে এখানে এসেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আসামিদের গ্রেফতার করা না হয় আমি এখান থেকে যাব না। পরে প্রশাসনিক ভবনের মহিলা কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাকে জোর করে অ্যাম্বুলেন্সে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের ড. মো. কামরুল হুদা জানান, ছেলে মারা গেছে। মানসিক দিক থেকে এমন দাবি তিনি করতেই পারেন।

দেড় ঘণ্টা পর দিয়াজের মা আবারো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেন। দিয়াজের নানু অনুরোধ করলেও তিনি অনশন ভাঙেননি।

এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, মামলার আসামি আনোয়ার হোসেনকে পুরস্কার হিসেবে প্রমোশনে প্রিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে অধ্যাপক করা হচ্ছে। খুনি আসামি শিক্ষক হতে পারে না। অবিলম্বে তাকে অপসারণ করার দাবি জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে দিয়াজের মা বলেন, আমার ছেলের বিচার না হওয়ার পেছনে ভিসির হাত আছে, প্রক্টরের হাত আছে। ভিসিকে অপসারণ করুন। না হলে আমার ছেলের বিচার হবে না। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবস্থানের পর পরিবারের সদস্যরা তাকে বাসায় নিয়ে যান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনশনকালে দিয়াজের মা কাফনের কাপড়ে হত্যা মামলার আসামিদের নাম লিখে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানান। ওই কাপড়ে তিনি লিখেন, দিয়াজের হত্যাকারী খুনি আনোয়ার, জামশেদ, আলমগীর টিপুসহ সব হত্যাকারীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে অপসারণ চাই।

প্রসঙ্গত, দিয়াজ হত্যা মামলার আসামিরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জামশেদুল আলম, সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদ্য স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদুল আলম জিসান, মার্কেটিং বিভাগের আবু তোরাব পরশ, অর্থনীতি বিভাগের মনছুর আলম, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আব্দুল মালেক, ইতিহাস বিভাগের মিজানুর রহমান, সাংবাদিকতা বিভাগের আরিফুল হক অপু ও বাংলা বিভাগের মোহাম্মদ আরমান। আসামিরা সবাই নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

এ হল গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ের খবর। গুগলের কল্যাণে গ্রন্থনার কষ্ট করা হয়েছে। ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। ধারাবাহিক খবরগুলো পড়ে যান। সংশ্লিষ্টদের কথা ভাবুন। তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা ভাবুন। আরো ভাবুন— রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজ ও বাংলাদেশের কতটা বিকার হলে একজন মা এমন হাহাকার করেন।

নিজেকে দিয়াজের স্থলে; আর জাহেদা আমিন চৌধুরীর স্থলে আপনার মাকে বসান। খানিক সময়ের জন্য নিজে সেটা করে দেখেছি। অনুভূতি বা শিহরণ কিংবা হাহাকার ভাষায় প্রকাশ করার মতো ক্ষমতা অর্জন করিনি!

প্রহসনের বিষয়— উল্টো সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, জাহেদা আমিন চৌধুরীর মানসিক সমস্যা হয়েছে। শুধু সমস্যা না তার মানসিক বিকার হওয়ার কথা। আর এর ফলে হামলে পড়ে অনেক কিছুই তার করার কথা।

আসলে আমরা বোধ হারিয়েছি। তাই এমন ছাত্র, শিক্ষক, প্রশাসক, চিকিৎসক, রাজনৈতিক ও মাকে একসঙ্গে নিয়ে বাঁচি!

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


পূর্বপশ্চিমবিডি/কেএম

দিয়াজ হত্যা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত