• শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

নারায়ণগঞ্জের সেই এসপি হারুনের হাত থেকে বাঁচতে রেফারির দৌড়

প্রকাশ:  ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৩ | আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৭
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

নানা নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদকে। তার প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন সেখানকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। এতে তার নানা কর্মের তথ্য ডালপালা ছড়াচ্ছে। পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে শুরু করে খেলার মাঠ পর্যন্ত সব জায়গায় ছিল তার দাপট।

সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে খেলার মাঠে এক রেফারিকে তার মারধরের ভিডিও। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মাঠ ভরা দর্শকের উপস্থিতিতে এসপি হারুনসহ পুলিশের সদস্যরা জার্সি পড়ে একজন ফুটবল রেফারিকে মারধর করছেন। আর ওই রেফারি মারধর থেকে বাঁচতে দৌড়ে মাঠ ছেড়ে পালাচ্ছেন। তবে সে সময় পুলিশের পোশাকে থাকা সদস্যরা এসপি হারুনকে ঘিরে সেখান থেকে নিয়ে আসছেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের পর সামাজিক গঠনমূলক কিছু কাজ করে প্রথম অবস্থায় বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন এস পি হারুন অর রশিদ। সাধারণ মানুষের আস্থাও অর্জন করেছিলেন তিনি। তবে, ছয়মাস পার হতে না হতেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডসহ নানা ইস্যুতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচিত হতে থাকেন তিনি। তার বিদায় নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

জানা গেছে, ২৯ জুন মাদক ও জঙ্গিবিরোধী ওই প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। যেখানে এসপি হারুনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের দল ছিল লাল জার্সিতে। আর নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার নেতৃত্বে আকাশী জার্সিতে ছিল সোনারগাঁও ফুটবল দল। সোনারগাঁ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তত্ত্বাবধানে বিকেল সাড়ে ৪টায় এ প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি শুরু হয় সোনারগাঁও যাদুঘরের পাশে শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে। এ খেলায় এসপি একাদশের কাছে ২-০ গোলে পরাজিত হয় এমপি একাদশ।

এ ফুটবল খেলা উপলক্ষে জেলা জুড়েই ছিল উত্তেজনা। সেজন্য উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা আন্তর্জাতিক সকল নিয়ম কানুন অনুসরণ করে খেলার আয়োজন করে। উপজেলা জুড়ে দর্শকদের উপস্থিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে মাইকিংও করা হয়। প্রীতি এ ফুটবল খেলায় ফিফার তালিকাভুক্ত রেফারিকে ম্যাচ পরিচালনা করেন।

সেদিন বিকেলে খেলোয়াড়র উপস্থিতি হওয়ার আগেই কানায় কানায় মাঠ ভরে উঠে। চারদিক থেকে দর্শকের ভীড়। মাঠও সাজানো হয় রঙ বেরঙের পতাকা দিয়ে। মাঠের এক পাশে করা হয় উপস্থাপনার মঞ্চ। ছিল ট্রফি, মেডেল, ক্রেস্ট ও শুভেচ্ছার ফুল।

ম্যাচের প্রথমার্ধের খেলা ভালোই শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে খেলা চলার এক পর্যায়ে এসপি হারুন অর রশিদ এমপি একাদশকে অফসাইড থেকে গোল দেন। আর সেটা রেফারির চোখে পড়লে তিনি অফসাইডের পতাকা ও বাঁশি বাজান। একই সঙ্গে গোল বাতিল ঘোষণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে রেগে যান এসপি হারুন। গোল বাতিল করার ক্ষোভে দৌড়ে এসে রেফারিকে লাথি মারেন এসপি হারুন। আর সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে এসপি একাদশের অন্য খেলোয়াররা রেফারিকে ঘিরে ফেলে মারধর শুরু করে। কিন্তু নিরাপত্তায় থাকা অন্য পোশাক পরা পুলিশ সদস্যরা রেফারিকে না রক্ষা করে উল্টো এসপি হারুনকে রক্ষা করে মাঠ থেকে নিয়ে যান। আর অন্য দিকে মারধর থেকে বাঁচতে রেফারি দৌড়ে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উপস্থিত দর্শকেরা মাঠে নেমে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে দর্শকদেরও বাকবিতণ্ডা হয়।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়! এসব পরিস্থিতির সময় মাঠেই উপস্থিত ছিলেন এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার সরকার, সোনারগাঁও থানার ওসি মনিরুজ্জামান সহ উর্ধ্বতন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে তাদের সকালের সহযোগিতায় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আবারও খেলা শুরু হয়। ওই ঘটনার পর খেলা চলাকালীন এমপি একাদশের এক খেলোয়ার খুব ভালোভাবে খেলছিলেন। একের পর এক এসপি একাদশের গোল পোস্টকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন। যখন উভয় পক্ষই ছিল গোল শূন্য। তখন এসপি একাদশের এক সদস্য পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখায় যাতে সে ভালো না খেলে। অন্যথায় তাকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয়। এতে ভয় পেয়ে মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায় ওই খেলোয়ার। পরে দশজনের দলের সঙ্গে এসপি একাদশের খেলোয়ার দুই গোল দেন। তবে ততক্ষণে দর্শকেরাও মাঠের খেলা ছেড়ে চলে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে রেফারিকে মারধর করে এসপি একদশের সদস্যরা সে রেফারি হলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের নিয়োগভুক্ত রেফারি। ফলে বিষয়টি চাপা দিতে তোড়জোড় শুরু করেছিলেন স্থানীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা।

সে সময় উপস্থিত দর্শকদের হুমকি দেওয়া হয় এসব ঘটনা প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে। গণমাধ্যমের কর্মীদেরও ভিডিও দৃশ্য ধারণের মেমোরি কার্ড রেখে দেয়া হয়। যার ফলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

গত ৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে বদলি করা হয়। আর গত ৭ নভেম্বর জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিদায় জানানো হয়। এরপর থেকে থেকে এসপি হারুনের কর্মকাণ্ড নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

নারায়ণগঞ্জ,পুলিশ সুপার,হারুন অর রশিদ,খেলার মাঠ,ম্যাচ রেফারি,ভিডিও ভাইরাল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত