• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

চাই পরমতসহিষ্ণু মানবিক সমাজ

প্রকাশ:  ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৩ | আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩০
পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ

বেলগ্রেডের সাবা সেন্টারে যাব আইপিইউ এসেম্বলির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেশনে যোগ দিতে। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দেই। রোদ ঝলমলে আকাশ। হাল্কা ঠান্ডা। সুন্দর সকাল। রুম থেকে তৈরি হয়ে কাগজপত্র নিয়ে বের হই। নাস্তা শেষে হোটেল লবিতে বসে ফেসবুক খুলেই ভীষণ ধাক্কা। ভাইরাল হয়েছে একটি ছবি। চরম নৃশংসতায় খুন করা হয়েছে একটি শিশুকে। আমার জেলা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশুটিকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। খুন করেছে তার পরিবারের লোকজন। মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। মানুষ এত নির্মম? কয়েকদিন আগে এক মুক্তিযোদ্ধাকে তার স্ত্রী আর সন্তান মিলে হত্যা করেছে।একই কারণ। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য। মানুষ দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। সমাজ, ব্যক্তি, পরিবার সর্বত্র।

প্রতিশোধ পরায়ণ চরম অসহিষ্ণু সমাজে বসবাস করছি মনে হচ্ছে। অস্থিরতা, প্রতিহিংসা। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চরম অসহিষ্ণু। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে, মতের বিরুদ্ধে গেলেই চরম প্রতিশোধের নেশা। একজনের মত আরেক জনের বিরুদ্ধে গেলেই চরম আঘাত।নিষ্ঠুরতা, কুৎসা, মিথ্যা দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেয়।এর ফলে সমাজে সৃস্টি হচ্ছে অস্থিরতা। মানবিকতা পরাজিত হচ্ছে।

সহিষ্ণুতাকে লালন করতে রাজী নয় কেউ। অথচ একটি প্রতিযোগিতামূলক সুস্থ সমাজে সহিষ্ণুতা থাকা দরকার। পরমত সহিষ্ণু সমাজ বড় বেশি প্রয়োজন। বলা হয়ে থাকে পরমত সহিষ্ণুতা (Toleration) হচ্ছে সুচিন্তিত বিবেচনা প্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্নমত বা ভিন্ন চিন্তাধারাকে সহনীয় পর্যায়ে স্থান দেয়া। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও ধর্মের মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকবে। সহিষ্ণু সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন "আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশ করতে দেওয়ার জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি।"

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রক্তাক্ত দলিল আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারে অনুচ্ছেদ ৩৯ এ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। আবার আইনস্টাইন বলেছেন, শুধু আইন দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না, দরকার সহনশীলতা।

ধর্মীয় ভাবেও মত প্রকাশের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।তবে কিছু ক্ষেত্রে অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে মত প্রকাশ করতে গিয়ে ধর্মকে কুৎসিত ভাবে আক্রমণ করে থাকেন। মত প্রকাশের নামে কারো ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি এরূপ আঘাত মত প্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। ইসলাম ধর্মে পবিত্র আল কোরআনে সহিষ্ণুতার কথা বলা হয়েছে। সুরা বাকারার ২৫৬তম আয়াতে বলা হয়েছে "ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মেও পরমত সহিষ্ণুতা মুলনীতি। যার মূল বাক্য অহিংসা পরম ধর্ম।

অসহিষ্ণুতা মানুষকে বিজয় দেয় না। সহিষ্ণুতা মানুষকে সার্থক ও বিজয়ী করে।ক্ষমতা ও অহংকার দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা যায়না।বিনয় এবং সৌজন্য দিয়ে মোকাবিলা করেই বিজয়ী হতে হয়। গালাগালি করে মিথ্যা কুৎসিত আক্রমণে বিজয়ী হওয়া যায় না।পরাজয়কেই তরান্বিত করে। হেলেন কিলার বলেছেন, "শিক্ষার চূড়ান্ত ফল হচ্ছে সহনশীলতা।” যে কোনো পরিস্থিতিতে সহনশীল এবং স্থির সিদ্বান্ত নিতে হয়।

ইমাম গাজ্জালি বলেছেন, নিজের চিন্তা, মতামত এবং কাজকর্মকে সর্বাপেক্ষা উত্তম মনে করা এবং অন্যের সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করার নামই আত্মপ্রশস্থি এবং ইহা একটি মারাত্মক দোষ। মানুষের জীবনে দুঃখ, অপমান আছে। এসব প্রতিকুল শক্তির বিরুদ্ধে সহিষ্ণুতা দিয়ে লড়াই করতে হয়।

তবে সহিষ্ণুতা কখনও দুর্বলতা নয়। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া সহিষ্ণুতা নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ,সংসদ সদস্য,সুনামগঞ্জ,ফেসবুক পোস্ট
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত