• বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬
  • ||

আজ শুধু আবরার তোমার মা কাঁদছে না, আমরা সব মায়েরা কাঁদছি

প্রকাশ:  ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৩৬ | আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:০৪
নাসরীন রুমু

আমরা কতো অসহায় জাতি। একটা নির্দোষ ছাত্রকে পিটিয়ে অসহায় ভাবে হত্যা , এই হত্যার কোনো বড় কারণও ছিল না, ছিল না কোনো পূর্ব কোনো শত্রুতা । শুধু একটা পোষ্ট। অথচ এই ফেইসবুকের পোষ্টের মাধ্যমে কত পরিবার কতো কতো অসহায় মেয়েকে হয়রানি পেতে হয়েছে , কই কখনো তো দেখিনি এসবের ক্রিমিনাল গুলোকে বিচার করতে , দেখিনি কখনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতে , অথচ এই অসভ্যগুলোর অনেক ফেইসবুক আইডি?

কিন্তু আমার প্রশ্ন আমরা আর কতদিন এই গোলমেলে ধোঁকাবাজিতে থাকব?আমরা নাটকের সবকিছু বোঝার পরও কেনো ওদের তৈরি নাটকে নিজেকে মানিয়ে দিব? কেমন এই বিচার? সৃষ্টি কর্তাও যেনো নিরব, নির্বিকার!আজ বড্ড অসহায় লাগছে , পারছিনা সইতে ,না পারছি কইতে।

নিজের কাছেই নিজেকে লজ্জা লাগছে -এসব খুনিরাও নাকি আমাদের মতো কোনো মায়ের সন্তান । ঐসব মায়ের জন্য আজ করুনা হয় - এমন সন্তান জন্মের চেয়ে নিঃসন্তান থাকা অনেক শ্রেয়, এমন পিশাচ মেধাবীর চেয়ে সাধারন গো বেচারাও অনেকগুন ভালো, অন্তত সে হয়তো ডাক্তার কিংবা ইন্জিনিয়ার না হতে পারলেও খুনি তো হবে না।

আজকের এই মেধাবী খুনি গুলো আমাদের মা বাবার, শিক্ষকের তৈরি। কেনো বলছি -অবাক হচ্ছেন ?

মনে করে দেখুন সেই ছোট বেলা থেকে এখন পর্যন্ত আপনার সন্তানকে লেখাপড়ার জন্য যেভাবে আপনি আমি খেয়াল করি , তার একভাগের এক অংশটুকু তার মনুষত্বের জন্য কেয়ার করি না। আমার মনে আছে , খুব ছোট বেলায় যেসব ছাত্ররা লেখা পড়ায় ভাল তাদের প্রতি সবার আলাদা যত্ন , ওদের কোনো দোষ যেনো দোষও না। অথচ ব্যাকব্যান্চের সেই চুপচাপ ছেলেটি মেধা কম বলে সবসময় ক্লাসের উপহাসের পাত্র থাকত।অনেক সময় অন্যায় না করলেও ক্লাসের মেধাবী ছাত্রটির ক্যাপ্টন গিরি তে ফেঁসে যেতো কম মেধাবী ছাত্রটি, তখন শিক্ষকের বেত্রাঘাতের শিকার হতো সেই নিরহ ছাত্রটি , সে যতই বলুক সে নির্দোষ কিন্তু শিক্ষক বিশ্বাস করত সেই টপ হওয়া চতুর ছেলেটিকে। কারন , অন্ধ বিশ্বাস। ভাল ছাত্র মানেই -“ধোয়া তুলসি পাতা” এই মতবাদে বিশ্বাসী । কম মেধার ছেলেটি আজীবন ফেঁসে থাকে অন্ধ বিশ্বাসের বলিদান হয়ে। এভাবে শুরু হয় রেগিং এর অগ্র যাত্রা ,আর এই অন্ধত্ব বিশ্বাস ঐ মেধাবী ছাত্রের মনুষ্যত্বকে আস্তে আস্তে কুঁড়ে কুঁড়ে খুন করে গড়ে তুলে বিবেকহীন যান্ত্রিক মানুষ। এবার এই সব মেধাবী ছাত্রদের পরিবারের অবস্হান। লেখাপড়ায় ভাল ছাত্রটি বাবা মার আদরের টুকরো , সব ভাই বোনদের চেয়ে তার কেয়ার অনেক গুণ বেশি ,বাবা মা হতে শুরু করে আত্মীয় স্বজন ,পরিবার পরিজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সেই মেধাবী ছাত্রটি, সবার মধ্যমনি, ভাল ছাত্রের উদাহরণ হিসেবে থাকে সবার মুখে মুখে, অথচ এই ছাত্র পুঁথিগত বিদ্যার পারাদর্শী কিন্তু মনুষত্বের ক্ষেত্রে কতটা মানুষ হয়েছে সেটার খবর কেউ রাখে না। কতটা তার ভিতরে মানবতা বোধ আর কতটা পিশাচবোধ আছে সেটার খবর আমরা ভেবে দেখি না, শুধু দেখি -ছেলে আমার মস্ত বড় ডাক্তার , মস্ত বড় ইন্জিনিয়ার। এই ছেলে মেধার জোডে ডাক্তার কিংবা ইন্জিনিয়ার হয় ঠিকই কিন্তু হয় সে অমানবিক কোনো ডাক্তার কিংবা ঘুষখোর কোনো বড় ইন্জিনিয়ার বা অনেক বড় খুনি।

এদের কাছে দেশ কি আশা করতে পারে?

আবরারও মেধাবী ছিল , তবে সবার আগে সে ছিল মানবিক গুনাবলীতে একজন মানুষ। অনেক ভদ্র নম্র বিনয়ী একটা ছেলে। সৃষ্টি কর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল অনেক ,তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ত আর মা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় ,এই জন্য মায়ের আদরের পুরোটাই নিতে কার্পণ্যতা ছিল না কোনোভাবে , তাই তো ছুটিতে আসলে মায়ের হাতে ভাত খেয়ে পেট ভরত, খেয়াল ছিল পরিবারের অন্য সদস্যের প্রতি। বাবার ওষুধটির কথাও সে মাকে মনে করিয়ে দিত, ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার খবরও নিতেও ভুলত না সে, টিউশনি খরচ পাঠাত মাকে, আহারে কত দায়িত্ব তার।

আবার দেশের প্রতি ভালবাসাও ছিল অগাধ ,তাই তো নিজের পড়াশুনা , ক্লাস , টিউশনি সবকিছুর পরও দেশকে নিয়ে কিছু লিখতে বলতে ভাল লাগত, তার এই ভালবাসার প্রতিদানে পেল তার মর্মান্তিক কঠিন মৃত্যু।

কিভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে তার শুকনো নিষ্পাপ শরীরটি নিথর করে ফেলল,।

দেখো না আবরার ,তোমার নিষ্পাপ শরীরটাকে ওরা কাপড় দিয়ে মুডিয়ে ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে ইচ্ছে মতো মেরেছে, যাতে তোমার শরীর থেকে এক ফোঁটা নিষ্পাপ রক্ত ওদের অপবিত্র শরিরে স্পর্শ না করে, যদি এই দাগ না উঠে ওদের শরীর থেকে। তোমার মুখ ওরা সাদা টেপ দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল নিশ্চয়ই, যাতে কেউ শুনতে না পায় , তা না হলে তোমার এতো আকুতি, প্রতিটি ব্যাথার চিৎকার, তোমার মা ডাক কেনো কেউ শুনি নি, হল বিল্ডিং টা তো আরো অনেক ছাত্ররা ছিল তোমার মতো, নিচে ছিল সিকিউরিটি ওরা কেউ শুনলো না তোমার এই কান্নার আওয়াজ, কেউ শুনলো না পিশাচরা যখন মাতাল হয়ে তোমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে? জানো পিশাচ গুলোর এতো ভয়ানক সাহস ভিডিও ফুটেজের সামনে ওরা বুক ফুলিয়ে চলছিল, ভয় নেয় কোনো, ওরা যেনো আগে থেকে জানে ওদের কোনো বিচার হবে না।।

জানো আবরার যখন সিসি ফুটেজে তোমার নিথর শরীরটা আলগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আমি বার বার তোমাকে দেখছিলাম , তুমি আবার যদি জেগে উঠো ? না তুমি আর পারোনি উঠতে তোমার শরীর আর পেরে উঠেনি, তুমি একেবারে নিস্তব্দ্ধ হয়ে গেছ। আর নেই শক্তি, ভালবাসা বিলানোর।

কয়েকদিন আগেও আবরার তোমাকে আমরা চিনতাম না,আজ তুমি আমাদের মুখে মুখে , শোকের মাতমে ভাসছে বাংলাদেশ। শুধু চারপাশে হায় হায়।

আজ শুধু আবরার তোমার মা কাঁদছে না, আমরা সব মায়েরা কাঁদছি। প্রচন্ড রকম করে কাঁদছি। জানি না এই কান্না থামবে কখন?

এই মুহুর্তে তোমার দেয়া ফেইসবুকের একটা স্ট্যাটাস আমার খুব মনে পড়ছে - “একদিন আমিও ইতিহাস হবো”।

সত্যিই তুমি ইতিহাস হয়েছ এবং চিহ্নিত করে দিয়েছ সেই মেধাবী মুখোশধারী খুনিদের। আজ থেকে কোনো মায়ের আফসোস হবে না তার সন্তান যদি বুয়েটে না ঠিকে, তার সন্তান নিরাপদে আছে এটাই শান্তি।তবে আজ নই তো কাল এর বিচার হবে।

বিচার হতেই হবে।

(ফেসবুক স্ট্যাটাস)

পূর্বপশ্চিমবিডি-এনই/

আবরার হত্যা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close