Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬
  • ||

একটি নিল চাদর ও মুক্তা মনোয়ার

প্রকাশ:  ০৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:১৪ | আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:২৯
মুক্তা মনোয়ার
প্রিন্ট icon
মুক্তা মনোয়ার। ছবি: সংগৃহীত

সময়টা ২০১৪ সাল ঢাকায় বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলায় ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলাম। তখন আমি অন্য একটি টিভিতে কাজ করি। ঢাকায় এসে প্রায় এক সপ্তাহের মতো ভাইয়ের বাসায় থাকা পড়ে। এরপর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে সায়দাবাদ গ্রীনলাইন বাস কাউন্টারে হাজির হই। কাউন্টারে আমার সঙ্গে ছিল সজল ও রন্টি, গাড়ি ছাড়ার সময় রাত বারোটা । যখন সেখানে পৌঁছায় তখন গাড়ী ছাড়ার সময় বাকি ছিল মাত্র ১০ মিনিট। সজল আমাকে কিছু ফল ও পানি কিনে দিলো, ততক্ষণে গাড়ি চলে এসেছে। যথারীতি যাত্রীদের ওঠার জন্য বলা হলো ।

গাড়িতে উঠবো বলে কাউন্টার থেকে বের হতেই আমার চোখ আটকে গেলো! এক মুহূর্তেই ভুলে গেলাম কে আমি কোথায় আছি অপলক তাকিয়ে রইলাম আমার উপন্যাসে পড়া সেই মেঘ বালকের দিকে। এতো মুগ্ধতা যে নিজেকেই ভুলে গেলাম! সেও আমাকে দেখলো আর পাশকেটে বেরিয়ে গেলো। সজলদের বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম কিন্তু চোখ যেন কাকে দেখার অপেক্ষায়। জানালা দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম তাকে আর দেখতে পেলাম না। মনে মনে ভাবলাম আজ তাকে পেয়েও হারালাম!

গাড়িতে বসে রইলাম। এদিকে গাড়ীর হর্ন বারবার কানে বাজছে। তখন শুনলাম একজন যাত্রী মিসিং,সবাই চিল্লা পাল্লা শুরু করলো। তবুও মিসিং যত্রী আসেছে না, অবশেষে তিনি এলেন গাড়িও ছাড়লো। আমি মহা বিরক্ত কারণ আমার পাশের সিটটা তার। ভাবলাম এই লোকটা আমার পাশে না জানি কি ঝামেলা পোহাতে হয়। ধুর রাতের জার্নি তাও আবার এই ফালতু লোকটার পাশে। অসহ্য, অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক ডাকছেন হ্যালো ম্যাডাম আমি বসাতে আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? আমি বললাম যদি বলি হা তবে কি আপনি গাড়ি থেকে নেমে যাবেন? বলে তাকিয়েই আমি নির্বাক.....একি আমি কাকে দেখছি, চোখ যাকে খুজছে সে আমার পাশের যাত্রী! আরে ব্যাস মুহূর্তেই ভাব নিলাম । সে একটু হেসে বললো না নামবো কেন অসুবিধা না থাকলে আমরা গল্প করবো। আমার ভাবটা আরও বেড়ে গেলো বললাম আমি গল্প জানিনা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। মন বলছে তাকে দেখতে কিন্তু লজ্জায় তাকাতে পারছি না। সে একটু কেশে আমাকে বললো চকলেট খাবেন? না মানে আমি খাচ্ছি তো, তাই ভাবলাম আপনাকে না দিয়ে খেলে কেমন দেখায় না?

আমি ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে বললাম সরে বসেন আর ঘুমিয়ে গেলে আপনার সিটেই থাকার চেষ্টা করবেন বায়। এই যে শুনুন আমরা তো পরিচিত হতে পারি তাই না, কোন জবাব না দিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে রইলাম আর কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে গেলাম। খুব শীত লাগছে গাড়িতে, যে কম্বল দিয়েছে ওটা গায়ে দিতে চাইনা ওটার গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে কি যে করি ওড়না পেচিয়ে নিলাম।

গভীর ঘুমে কে যেন আমাকে ডাকছে। একটা অপুর্ব সু ঘ্রাণ পাচ্ছি, উঠে দেখি আমি কারও কাঁধে মাথা রেখে আছি। আর আমার গায়ে একটা নীল রংয়ের চাদর কি শান্তির ঘুম ছিল ওটা, আমি তরিঘরি করে জেগে উঠলাম। তিনি বললেন এই যে ম্যাডাম আমি কিন্তু আমার সিটেই ছিলাম কারও কাঁধে ঘুমাই নি হু... আমি খুব লজ্জা পেলাম, কিছু বলার ভাষা ছিলো না।

গাড়ী চলতে চলতে কুমিল্লা শহরে। যাত্রা বিরতি এই শহরে। তখন তিনি বললেন এবার চলেন, নুরজাহান হোটেল কিছু খেতে হবে। বললাম হু চলেন। আর আমি সরি হা অন্যদিক তাকিয়ে বললাম সে হেসে ফেললো । গাড়ি থেকে নেমে ফ্রেশ হলাম এসে দেখি সে একটা টেবিলে বসে আছে দু’জনার খাবার অর্ডার দিয়ে,, সে কি আপনি ফ্রেশ হননি? হুম আপনার মত আমার এতো দেরি হয় না, এবার দয়াকরে খান। খেয়ে কাউন্টারে টাকা দিতে গেলাম পারলাম না সে পে করে বসে আছে । আবার গাড়িতে" জানতে চাইলো আমি কি করি, বললাম একটা বেসরকারি টেলিভিশনে চাকরি করি" আপনি? একটা সরকারি ব্যাংকের চাকর, ও আচ্ছা । আর কিছুই জানতে চাওয়া হলো না। কেন যেনো নামটাও জানতে ভুলে গেলাম লজ্জায়। আমি আর তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ওনাকে বলে আমিই তার কাঁধে ঘুমালাম ছি ছি অথচ উনি করলে কত্তো বকা দিতাম এগুলো ভেবে আরও অনুশোচনায় ভুগলাম।

এরই মধ্যে তিনি আমার দিকে চিপসের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন, ম্যাডাম এটা আপনার, খান। দুজনে খেলাম সে ফোনে কথা বলছে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন আমি দামপাড়া জিইসি মোড়, উঠে দেখি সে আর পাশে নেই গাড়িতেও নেই! পথে কোথাও নেমে গেছে কিন্তু চাদরটা আর নেয়নি, হয়তো আমার ঘুম ভাঙ্গাতে চায়নি। কেন যেন একটা অচেনা কষ্ট পেলাম সেকি নামটাও যানা হলো না। কোথায় থাকে ফোন নং কিছুই জানিনা ধুর এটা আমি কি করলাম। বাসায় এলাম চাদর টা ভাজ করে নিজের আলমারি তে রাখলাম । পরের দিন অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছাতে গিয়ে দেখি ব্যাক পকেটে এক প্যাকেট চকলেট আর একটা চিরকুট। তাতে একটা ফোন নাম্বার দিয়ে লেখা ছিলো Hay beautiful plz call me... আমি সস্থি অনুভব করলাম। বাহ তাহলে এই ব্যাপার আমি চিরকুট আর চকলেট ড্রেসিং টেবিলের উপরে রেখে তড়িঘড়ি করে অফিসে চলে গেলাম। ভাবলাম রাতে ফ্রী হয়ে কল দিব, বাসায় এসে কোথাও কাগজটা খুজে পেলাম না! কে যে রুম পরিস্কার করতে গিয়ে ফেলেছে কেউ জানেনা। মেজাজ খুব খারাপ কি আর করা চাদরটা ফেরত দেয়া হলোনা।...

মঙ্গলবার ৩০ জুলাই ২০১৯ আমি একজন রোগীকে দেখতে স্কয়ার হাসপাতালে যাই। সেখানে রোগীর কেবিন থেকে বের হবার পর দেখি কেউ একজন বসে আছে। ঝাপসা দেখলাম আর সামনে এগিয়ে গেলাম, চমকে উঠলাম কিছুটা ধরা গলায় বললাম আপনি! উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে এমন ভাবে দেখছে যেন কোন আসামি দেখছে। আমি জানতে চাইলাম এখানে কী করছেন? সে রাগান্বিত স্বরে বললো আপনি একজন অকৃতজ্ঞ একটাও ফোন করতে ইচ্ছা হয়নি ? আমি হুম হয়েছে কিন্তু কাগজটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। যানতাম এটাই বলবেন মেয়েরা এমনই হয়, কত্তো খুঁজেছি আপনাকে কোথাও পাইনি। একদিন এটিএন বাংলার নিউজে আপনাকে দেখলাম। খুঁজতে খুঁজতে অফিস বের করলাম গিয়ে শুনি ঢাকায় পোস্টিং হয়েছে আপনার। তারপর ঢাকা এসে আপনার অফিসে রিসিপশনে জানতে চাইলাম, বললো ম্যাডাম অ্যাসাইনমেন্টে গেছে। সকাল থেকে বসে ছিলাম। তারপর ওদেরকে একটা নাম্বার দিয়ে বলে এসেছিলাম আপনাকে দিতে । অপেক্ষা করেছি আপনি ফোন করবেন, কিন্তু করেন নি। আমি চুপ করে থেকে বললাম ওরা আমাকে কিছুই বলেনি।

অন্যদিকে তাকিয়ে বললো বিয়ে করেছেন? আমি বললাম না। আপনি? হঠাৎ দুজন বয়স্ক মহিলা এসে বললো আবির তোর মেয়ে হয়েছে দেখবি চল। আমি একটু থমকে গেলও মুচকি হেসে কংগ্রেচুলেট করলাম। বিনয়ী গলায় বললো গত বছর বিয়ে করেছি পরিবারের চাপে। আচ্ছা আপনার নাম টা অজানাই থেকে গেলো, আমি হাসলাম। আমার নাম মুক্তা মনোয়ার । ওহ আমার টা ' আমি বলালাম আবির। আমি মাত্রই জানলাম, আবির বললো আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমার মেয়ের নাম রাখতে চাই মুক্তা । কারণ আমি মুক্তাকে ভালোবাসি তাই পাওয়াটা না হয় এভাবেই থাক! কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম অবশ্যই। আমি কি আপনার মুক্তাকে দেখতে পারি? আবির বললো হুম চলেন...

চাদরটা দিতে পারিনি" নিজের আঙ্গুলের রিংটা খুলে কন্যার মুখ দেখলাম । দেখে এলাম - আবিরের মুক্তাকে শুধু বড় নয়,বড় মানুষ হও কন্যা ।

আর তুমিও ভালো থেকো মুক্তা মনোয়ার... । শুধু রয়ে গেল আবিরের নীল চাদর

অনুলিখন : মুক্তা মনোয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক (ক্রাইম)

এটিএন বাংলা


পূর্বপশ্চিমবিডি/এমএইচ

মুক্তা মনোয়ার
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত