• সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

পাপুলের মতো হাজী সেলিমও কি এমপি পদ হারাবেন?

প্রকাশ:  ২৩ মে ২০২২, ২২:১৫
নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম এখন কারাগারে। আদালতে আত্মসমর্পণের পর গতকাল রোববার (২২ মে) তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত। যদিও এক রাত কারাগারে কাটিয়েই কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তিনি এখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার সংসদ সদস্য পদে থাকা না থাকার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কেউ বলছেন তিনি এমপি পদে বহাল থাকবেন, আবার অনেকেই বলছেন থাকবেন না। আলোচনার টেবিলে অনেকেই টেনে আনছেন কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের পদ হারানোর বিষয়টি। কেননা, কুয়েতের আদালতে দণ্ডিত হলে তার সদস্যপদ বাতিল করেছিলেন স্পিকার।

আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হলে সংসদ সদস্য পদের যোগ্যতা আর থাকে না। হাইকোর্টের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘আইন কী বলছে সেটি দেখেন আগে।’ এখানে কোন দলের সংসদ সদস্য, কত বড়মাপের নেতা সেটি বিবেচ্য হবে নাকি আইন সেই প্রশ্ন রেখে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী বলেন, ‘আইনে স্পষ্টই বলা আছে, এখানে করণীয় কী।’

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না। কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ-সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি- (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি না পেয়ে থাকেন (গ) তিনি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।

কোনো সংসদ সদস্য গ্রেফতার, আটক বা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে বা মুক্তি পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী তা স্পিকারকে জানাতে হয়। স্পিকার জানার পর তা সংসদকে জানান।

তবে রোববার পর্যন্ত হাজী সেলিমের রায়ের বিষয়ে সংসদকে আনুষ্ঠানিক কোনো কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি বলে জানা যায়। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা রায়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানি না। সেটা জানা গেলে তখন পরের আলোচনার বিষয় উঠবে।

সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, হাজী সেলিমের বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলার সময় এখনও আসেনি। তিনি আপিল করতে পারেন। উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে পারেন। সেগুলোর নিষ্পত্তি হওয়ার আগে সদস্যপদ নিয়ে কিছু বলার সময় আসেনি।

হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান এর আগে বলেছেন, সংবিধানের ৬৬(২-এর ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে, যদি কেউ নৈতিক স্খলনের দায়ে দুই বছর বা তার বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্য হবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি যেহেতু দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, তাই এটা তার নৈতিক স্খলন। সে কারণে সাংবিধানিকভাবে তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তার সংসদ সদস্য পদ বাদ হয়ে যাবে। তবে বিষয়টি স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। তাই হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর দুদকের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এদিকে, হাজী সেলিমের এই ঘটনায় আবার আলোচনায় এসেছে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলর নামও। কেননা, কুয়েতের আদালতে দণ্ডিত হলে তার সদস্যপদ বাতিল করেছিল সংসদ। অর্থ ও মানবপাচার এবং ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেফতার হন পাপুল। ওই মামলার বিচার শেষে গত বছরের ২৮ জানুয়ারি তাকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় কুয়েতের একটি আদালত। পরে সেদিন থেকেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়েছিল।

সোমবার (২৩ মে) বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকায় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা চা পান করতে করতে বর্তমান রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে আসছেন হাজী সেলিম প্রসঙ্গ। মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা বাকি সহকর্মীদের বলছিলেন, পাপলু গেল, হাজী সাহেবও যাবে নাকি। পাশের আরেক নেতা বলেন, বোঝা যাচ্ছে না বল কোন দিকে...। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে উপস্থিত নেতারা বলেন, রাজনীতির উত্থান-পতন থাকে। এখানে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করবো না ভাই। সরকার দেশের আইন কানুন আছে। দলীয় পদের বিষয়ে দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, আদালতের বিষয়ে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কিছু বলবো না। পরে আলোচনার আসর ভেঙে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হন নেতাকর্মীরা।

এদিকে, আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি যৌথভাবে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে প্রেসক্লাবের ভেতরে একপাশে কিছু নেতাকর্মী আড্ডা দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে একজন জানতে চান, হাজী সেলিমের বিষয়টা কোন দিকে যাচ্ছে। উপস্থিত আরেক নেতা বলেন, বোঝা যাচ্ছে না, ভেতরের ঘটনাটা কী পরিষ্কার হচ্ছে না।

ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মী জানতে চান, সে তো ভিআইপিতে আছে শুনলাম। উত্তরে উপস্থিত নেতা বলেন, কারাগার আর বাসা উনাদের একই বিষয়। এমপিগিরি করতে পারবে কি না সেটা এখন বোঝার বিষয়।

ঢাকা-৭ আসনে হাজি সেলিম এ নিয়ে তৃতীয়বার সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও তিনি। ১৯৯৬ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচন করেই বিজয়ী হন। পরের বার হারেন বিএনপির নাসিরউদ্দিন পিন্টুর কাছে।

এরপর ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পুনরায় এমপি হলেও সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডের কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। সেই মামলাটি হাইকোর্টে বাতিলের ফলে পরের দুটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারলেও আপিল বিভাগ পুনর্বিচারের আদেশ দেওয়ার পর রায় বদলে যাওয়া হাজী সেলিমকে সংকটে পড়তে হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন মামলাটি দায়ের করেছিল ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে জরুরি অবস্থার মধ্যেই পরের বছরের ২৭ এপ্রিল বিচারিক আদালত রায় দেয়। রায়ে দুটি ধারায় মোট ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় হাজি সেলিমকে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড, আর সম্পদের তথ্য গোপন করায় তিন বছর। তাকে সহযোগিতা করায় স্ত্রী গুলশান আরা বেগমকেও তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাজী সেলিম এবং তার স্ত্রী ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি উচ্চ আদালত তাদের সাজা বাতিল করে রায় দেন। দুদক তখন সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে। ওই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাই কোর্টের রায় বাতিল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে হাজী সেলিমের আপিল পুনরায় হাইকোর্টে শুনানির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। সেই শুনানি শেষে গত বছরের ৯ মার্চ হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি ধারায় হাজী সেলিমের ১০ বছরের সাজা বহাল রাখেন, তবে অন্য ধারায় তিন বছরের সাজা থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। গুলশান আরা মারা যাওয়ায় তার আপিলটি বাতিল করা হয়।

ওই বেঞ্চের দুই বিচারক মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের স্বাক্ষরের পর ৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হাজী সেলিমকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। হাজি সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ থাকবে।

পূর্ব পশ্চিম/জেআর

সেলিম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close