• শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

ফেসবুক লাইভে যা বললেন মামুনুল হক

প্রকাশ:  ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৪৫ | আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৭:৫৫
নিজস্ব প্রতিবেদক

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ‘এই যে একটি অবস্থা তৈরি করা হয়েছে, আশু যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ অনিবার্যভাবেই একটি সংঘাতমূলক পরিস্থিতির দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে। কাজেই আমি সংশ্লিষ্ট মহলকে বলবো,আগুন নিয়ে বেশি খেলা করবেন না। এই আগুন নিয়ে খেলার পরিনাম কারও জন্য শুভ পরিণতি ডেকে আনবে বলে মনে হয় না।’

বৃহস্পতিবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে এসব কথা বলেন তিনি।

নিজের ব্যক্তিগত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে মামুনুল হক বলেন, ‘আমি সবার কাছে দোয়া চাই। আমার ব্যক্তিগত অসাবধানতার কারণে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে। আমার অসাবধানতা এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কারণে যে ক্ষতির সম্মুখীন ব্যক্তিগতভাবে হয়েছি, সেই জন্য আমি নিজেই মর্মাহত। আমার কারণে আজকে সেখানে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের কাছে আমি হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘বিশ্বের মুসলমান ভাইদেরও তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। একের পর এক মামলা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনেক মানুষকে হয়রানি করা হবে। অথচ প্রকৃত যারা দোষী, যারা গিয়ে হামলা করলো, সেই সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে রাষ্ট্র নীরব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ তাদের নামপরিচয় দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ইনশাআল্লাহ ইতোমধ্যে তাদের ব্যাপারে আমি এজাহার দায়ের করেছি। আরও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

মামুনুল হক বলেন, ‘আমার চরিত্র হরণ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যে বিষয়ে আমার চরিত্র হননের চেষ্টা চললে, সেই বিষয়ে আমি নিরাপদ। এ ধরনের চারিত্রিক কালিমা আমার ওপর নেই। এই বিষয়ে আমি এতোটাই নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসী, মুবাহালা করার মতো সৎ সাহস আমি রেখেছি। যারা আল্লাহর কোরআন জ্ঞান রাখেন তারা জানেন মুবাহালার বিষয়টি কেমন। কোরআনের আলোকে কোন একটি বিষয় যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে অমীমাংসিত হয়ে যায়, আর কোনও মীমাংসার সুযোগ না থাকে, তখন কোরআন বর্ণিত সর্বশেষ সমাধানের পথই হলো মুবাহালার। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছি, আমার মধ্যে কতটা ঈমানী ও নৈতিক দৃঢ়তা থাকলে এই কথা বললাম, যদি আমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকি, সেই নারী সঙ্গে আমার দুই বছর আগের বিবাহবন্ধন শরীয়ত সম্মত-ভাবে সম্পাদিত না হয়ে থাকে, জান্নাত আরা ঝরনা আমার দ্বিতীয় স্ত্রী, এ বিষয়ে মিথ্যাবাদী হয়ে থাকি তাহলে আমার ওপর আল্লাহর গজব নাযিল হোক। আর যারা আমার এ কথাকে অস্বীকার করতে চায়, কেউ যদি ঈমানদার মুসলিম হয়ে থাকে তাহলে তাকে আমার পক্ষ থেকে উদার আমন্ত্রণ থাকলো আপনিও এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। আপনিও এ কথা বলুন, আপনি যদি আমার ওপর মিথ্যা অপবাদ দানকারী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ওপর আল্লাহর গজব নাযিল হবে। দেখি বাংলাদেশে এমন সৎ সাহস কোনো মায়ের সন্তান রাখেন কিনা।’

চরিত্র হনন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে দাবি করে মামুনুল হক বলেন, এটা আমার নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত আলাপচারিতার কল রেকর্ড ফাঁস নয়। বরং এর চেয়েও আরও ভয়াবহ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে। সেটি হলো জান্নাত আরা ঝরনার প্রথম ঘরের সন্তান আব্দুর রহমানকে তুলে নিয়ে তাকে দিয়ে জোর করে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়ে সেই অনুযায়ী বক্তব্য পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পরে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। আপনার চিন্তা করতে পারেন যে একজন ব্যক্তির চরিত্র হনন করার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠলে এ ধরনের অশুভ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।’

প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘আপনারা জনগণের সেবক। রাষ্ট্রের সেবক। কোনো ব্যক্তি বা দলের সেবাদাস নয়। কাজেই পেশাগত দায়িত্ব আমানতের সঙ্গে পালন করবেন। কারও চাপের কাছে নত হয়ে তার ব্যক্তি অধিকার হরণ করেন তার জন্য হাশরের দিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ইসলামকে রক্ষা করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশবিরোধী যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।’

গতকালও তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, ‘আজকে রফিকুল ইসলাম মাদানীর চরিত্র হনন করার অচেষ্টা চলছে। আগামীকালকে কে টার্গেট হবেন, সেটা আল্লাহ ভালো জানেন। এইভাবে যদি একে-একে দেশের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গকে জাতির সামনে কলঙ্কিত করার এ অশুভ ধারা এখনই বন্ধ না করি, তাহলে আগুন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই পরিণাম বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে বলে মনে হয় না। কাজেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানাবো, আসুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে করোনা ভাইরাসের যে ভয়াবহতা বিরাজ করছে, তা দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ থেকে মোকাবিলা করি। আর এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে তাহলে দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে।

হেফাজত (আমরা) সব মহলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চায় উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, ‘কেউ কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবো না। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক মত পার্থক্য থাকলে সেটা রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করবেন। কিন্তু কারও চরিত্রগত হনন পদ্ধতি কাপুরুষিত। এ নিচু মানসিকতা পরিহার করে মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। অন্যের সম্মান যদি আপনি রক্ষা করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার সম্মান রক্ষা করবেন। আর আপনি যদি কারও সম্মানহানি করেন, তাহলে আল্লাহ যদি চান তাহলে পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।’

আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছে তাদের পাশে আছেন জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, ‘তাদের সাহায্য করা হচ্ছে। যারা আহত হয়েছে তাদের হাসপাতালে গিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি।’

এর আগে গত শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে র‌য়্যাল রিসোর্ট নামে একটি আবাসিক অবকাশ যাপন কেন্দ্রে জান্নাত আরা ঝর্ণা নামে এক নারীকে নিয়ে সময় কাটাতে যান হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদের অবরুদ্ধ করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।

মামুনুল ওই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করলেও সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও পরে পুলিশের জেরায় তিনি যেসব তথ্য দেন, তাতে অনেক গরমিল পাওয়া যায়। মামুনুল স্ত্রীর নাম আমেনা তাইয়্যেবা বললেও ওই নারী জান্নাত আরা ঝর্না বলে নিজের নাম উল্লেখ করেন। যদিও পরবর্তী সময়ে জানা যায়, মামুনুল হকের প্রথম স্ত্রীর নাম আমেনা তাইয়্যেবা। কিন্তু কবে, কীভাবে, কখন তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে এ বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো কথা এখনও বলেননি মামুনুল হক।

রিসোর্টের সঙ্গীর নাম, তার বাবার নাম ও বাড়ির ঠিকানা নিয়ে দুই ধরনের তথ্যের পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফেসবুকে ফাঁস হওয়া বেশ কিছু ফোনালাপ হেফাজত নেতার বিয়ের দাবির সত্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। ফোনালাপের একটিতে বোঝা যায়, ঘটনার পরপরই মামুনুল তার চার সন্তানের জননী স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, সেই নারী (ঝর্ণা) তার পরিচিত শহীদুল ইসলামের স্ত্রী। ঘটনার কারণে চাপে পড়ে ওই নারীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। এ নিয়ে যেন তার স্ত্রী ভুল না বোঝেন। পরে বাসায় এসে বুঝিয়ে বলবেন।

পরে আরেকটি কথোপকথন ফাঁস হয়, যা মামুনুলের সঙ্গে তার রিসোর্টের সঙ্গীনির মধ্যকার বলে প্রতীয়মান হয়। সেখানে ওই নারী জানান, তিনি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তার মায়ের একটি বন্ধ মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। আর অন্য একজন যখন তাকে কোথায় বিয়ে হয়েছে জিজ্ঞেস করেছেন, তখন তিনি বলেছেন, এটা জানেন না। মামুনুলের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।

আরও একটি কথোপকথনে বোঝা যায়, মামুনুলের বোন কথা বলেছেন হেফাজত নেতার চার সন্তানের জননী স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি তাকে বুঝিয়েছেন, কেউ যদি তাকে ফোন করে, তাহলে তিনি যেন বলেন, তিনি এই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন এবং তার শাশুড়ি এই বিয়ের আয়োজন করেছেন। এরই মধ্যে মামুনুলের রিসোর্টের সঙ্গীনির বড় ছেলে ফেসবুক লাইভে এসে মামুনুলের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি তার মায়ের সঙ্গে বাবার সংসার ভাঙার জন্য মামুনুলকে দায়ী করেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতে বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন মামুনুল হক। তিনি শিক্ষকতা করেন মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসায়। বুধবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে ওই মাদ্রাসায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগরীর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন মামুনুল হক।

রিসোর্ট-কাণ্ডের পর ৬ এপ্রিল রাতে পুলিশের কাজে বাধা, হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় সোনারগাঁ থানার উপ-পরিদর্শক ইয়াউর রহমান বাদী হয়ে মামুনুল হককে প্রধান আসামি করে ৪১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আরিফ হাওলাদার বাদী হয়ে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে অপর মামলাটি করেন।

দেশব্যাপী তাণ্ডবের পর হেফাজতে ইসলাম কঠোর হাতে দমনে হুশিয়ারি দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ফেসবুক লাইভ,মামুনুল হক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close