• বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

মক্ষীরানী পাপিয়া আসলে কার, নাজমা-অপুর নাকি অন্য কারও?

প্রকাশ:  ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৩:৪৮
নিজস্ব প্রতিবেদক

মেঘমুক্ত আকাশে বিজলির মতো হঠাৎ করেই আলোচনায় গর্জে ওঠা একটি নাম শামীমা নূর পাপিয়া। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে স্বল্প সময়ে হয়ে যান বিত্ত-বৈভবের মালিক। নানা কৌশলে বড় বড় কাজ বাগিয়ে নিতেন। বড় নেতাদের খুশি করতে পাপিয়ার কাছ থেকে সুন্দরী তরুণী সংগ্রহ করতো নেতারা।

প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠা পাপিয়া ধরা পরার পর তার পৃষ্ঠপোষকরা যুব মহিলা লীগের এই নেত্রীর দায় নিতে নারাজ। গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাপিয়ার নানা অপকীর্তি প্রকাশ হওয়ার পর এখন আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে যুব মহিলা লীগের নেতা-নেত্রীরা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন।

পাপিয়ার কেলেঙ্কারি বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে আওয়ামী যুব মহিলা লীগে একচ্ছত্র আধিপত্য করে চলা দুই নেত্রী নাজমা আখতার ও অপু উকিলকে। নরসিংদীর শামীমা নুর পাপিয়া এই দুই নেত্রীর অন্ধ অনুরাগী। ২০০২ সালে নাজমা-অপু যুগলের হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে যুব মহিলা লীগ। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ দলটির প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে নাজমাকে সভাপতি ও অপুকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরই নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে জেলা কমিটির দিতে পারেননি নাজমা-অপু।পরে ঢাকায় ফিরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নরসিংদী জেলা কমিটি ঘোষণা করেন, তাতে পাপিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। নাজমা-অপুর বদন্যতায় জেলা যুব মহিলা লীগের নেত্রী হওয়ার পর শুরু হয় পাপিয়ার উত্থান। নরসিংদীর এই যুব মহিলা লীগ নেত্রীর বিভিন্ন কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ায় এখন নাজমা-অপুর নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠেছে।

পাপিয়ার পাপকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কেবল নাজমা-অপু নয়, যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনের নামটিও ওঠে এসেছি। দুজনের ঘণিষ্ঠতা বেশ আলোচিত সংগঠনের মধ্যে। পাপিয়ার নানা কাজে সংরক্ষিত আসনের সাবেক এ সংসদ সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের বেশ কজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে পাপিয়ার ছবিও নিয়েই চলছে মুখরোচক নাান আলোচনা।

পাপিয়া ওরফে পিউ একদিনে মক্ষীরানী হয়ে ওঠেননি। তার অগাধ বিত্ত-বৈভব-প্রতিপত্তির নেপথ্য কাহিনী উন্মোচনের কাজ চলছে।সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে একাধিক তদন্ত সংস্থার তৎপরতায় বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে থলের বিড়াল। কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বিভিন্ন কমিটিতে বড় পদ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন এবং কারাই বা তার কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন- সব তথ্যই এখন তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে।

প্রাথমিকভাবে এসব তথ্য ফাঁস করেছেন সদ্য বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়া নিজেই। রিমান্ডে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিন থেকেই তিনি মুখ খুলেছেন। রিমান্ডের জেরায় পাপিয়া আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম বলেছেন, যাদের সঙ্গে তার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে। মূলত এসব নেতাই পাপিয়ার উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেছেন। যুব মহিলা লীগের দুই নেত্রীর সঙ্গে ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ক্ষমতাসীন দলের সাবেক একজন এমপির সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়েও মুখ খুলেছেন পাপিয়া।

সূত্র বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম ফাঁস করে দিয়েছেন। আর এতেই অনেক রাজনৈতিক নেতার ঘুম হারাম হয়ে গেছে জানা গেছে। পাপিয়ার কাছ থেকে কোন কোন নেতা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন, তাদের নিয়ে দলেও কানাঘুষা চলছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, আইনগত বাধা এড়াতে মামলাটির তদন্ত হাতে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদ করে পাপিয়ার কাছ থেকে আমরা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছি।

পাপিয়ার উত্থানের পেছনে কাদের ভূমিকা ছিল, কারা পাপিয়া গংদের কাছ থেকে নিয়মিত সুবিধা নিতেন, তাদের প্রত্যেকের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। আমরা প্রতিটি তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক রিপোর্ট করছি। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, পাপিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো। ঢাকার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে কম বয়সী মেয়েদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন তিনি। যাদের অধিকাংশকে নরসিংদী এলাকা থেকে চাকরির প্রলোভনে ঢাকায় আনা হয়েছিল। অনৈতিক কাজে বাধ্য না হলে তাদের নানাভাবে নির্যাতন করা হতো।

তিনি বলেন, রাজনীতিতে উত্থানের নিয়ামক হিসেবে দুজন প্রভাবশালী নেত্রীর নাম বলেছেন পাপিয়া। পরে তারাও নিয়মিত পাপিয়ার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিতেন। তাদের একজন আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক এমপি। পাপিয়ার সঙ্গে তার গাড়ির ব্যবসাও রয়েছে। পাপিয়া বলেছেন, বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের জন্য অনেক নেতাই তরুণীর জোগান দিতে পাপিয়ার সহায়তা চাইতেন। ওই নেতাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের অনেক ছবিই পাপিয়া কৌশলে তুলে রেখেছেন। ওইসব ছবি দিয়েই ব্ল্যাকমেইল করতেন পাপিয়া। রাজনীতির আড়ালে এটি ছিল তার মূল ব্যবসা। ওইসব ছবি ব্যবহার করে সমাজের উঁচু স্তরের লোকদের ব্ল্যাকমেইল করা ছাড়াও বিভিন্ন দফতরে নিয়োগ বাণিজ্য করতেন পাপিয়া। এছাড়াও জাল নোট তৈরির সঙ্গে জড়িত চক্রের মূল হোতা শামীমা নুর পাপিয়া। তার তত্ত্বাবধানেই দেশে বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রা আনা হতো। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও দেহ ব্যবসার সাথে পাপিয়া জড়িত।

র‌্যাব বলছে, পাপিয়ার সব কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশীদার তার স্বামী সুমন। একসময় নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন সুমন। পরে নরসিংদীর প্রয়াত পৌর মেয়র লোকমানের বডিগার্ড হন। ২০১২ সালের অক্টোবরে নরসিংদীর বাসাইলে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন এবং এতে তার স্ত্রী পাপিয়া গুলিবিদ্ধ হন। এরপর দারা ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকায় যুব মহিলা লীগের শীর্ষ এক নেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন পাপিয়া। ওই নেত্রীর মাধ্যমেই বিস্তৃত হতে থাকে তার বলয়। অনেকের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ান, গড়ে তোলেন এক বিশাল সিন্ডিকেট।

যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতার এবং সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল দুজনেরই দাবি, পাপিয়ার অপকীর্তির বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না । সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনও পাপিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবেই তার সঙ্গে কিছু ছবি তোলে পাপিয়া। ফেসবুকে ওই ছবিগুলোই ভাইরাল হয়েছে।

যুব মহিলা লীগের তিন নেত্রীরই দাবি, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই পাপিয়ার সঙ্গে তাদের নাম জড়ানো হচ্ছে।

পূর্বপশ্চিম / এনই

পাপিয়া,নাজমা-অপু,যুব মহিলা লীগ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close