• মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬
  • ||

কমিশনার পদে শতাধিক প্রার্থীই ঠিকাদার

প্রকাশ:  ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ০২:৫২
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীতে নির্বাচনী প্রচারণায় চলছে ভোট উৎসব। আসন্ন ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন।ঢাকার দুই সিটির ১২৯টি সাধারণ ওয়ার্ডের শতাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী হলফনামায় পেশা হিসেবে ঠিকাদার উল্লেখ করেছেন। এই শতাধিক প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ২০ জন বর্তমান কাউন্সিলর, যারা আইনি জটিলতা এড়াতে কৌশলে ‘ঘনিষ্ঠদের’ দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ঠিকাদারি পেশায় যুক্ত ওই শতাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে বেশিরভাগই আগামী ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হবেন এবং কৌশলে তাদের ঠিকাদারি চালিয়ে যাবেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে আরও জানা গেছে, এসব কাউন্সিলর অতীতে ‘ঘনিষ্ঠদের দিয়ে’ উন্নয়ন কাজ করানোয় কাজের মান ঠিক ছিল না; কিন্তু ব্যয় হয় অনেক বেশি।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এ কাউন্সিলরদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা বিষয়ে বলা আছে, ‘কাউন্সিলর পদে থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি তার পরিবারের কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কার্য সম্পাদনের বা মালামাল সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন বা এর জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সিটি করপোরেশনের কোনো বিষয়ে তার কোনো প্রকার আর্থিক স্বার্থ থাকে বা তিনি সরকার কর্র্তৃক নিযুক্ত অত্যাবশ্যক কোনো দ্রব্যের ডিলার হন।’ তাই কোনো ঠিকাদার কাউন্সিলর হওয়ার পর সিটি করপোরেশনের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত হন না। কৌশলে ‘ঘনিষ্ঠদের’ দিয়ে কাজ করান। এমন অভিযোগ আছে দুই সিটির অন্তত ২০ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। যদিও তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

হলফনামা ঘেঁটে দেখা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাধারণ ওয়ার্ডের প্রার্থীদের ৮৬ ভাগই পেশায় ব্যবসায়ী। ডিএসসিসিতে পেশায় ব্যবসা লিখেছেন ২৫৮ জন আর ডিএনসিসিতে ২০৮ জন। এর মধ্যে নিজ পেশা ঠিকাদারিÑ সরাসরি এমন তথ্য দিয়েছেন শতাধিক প্রার্থী।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কাউন্সিলর পদপ্রার্থী যদি ওই সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারি করেন তাহলে তার নমিনেশন পেপার বাতিল হয়ে

যাওয়ার কথা। সেটা যদি এখন নির্বাচন কমিশন না করে এটা আইনের দোষ না। আইন আছে তবে প্রয়োগের অভাব আছে।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আইনের মধ্যেই আছে সে ঠিকাদারি করতে পারবে না। আইন ফাঁকি দেওয়ার জন্য চাচার নামে, চাচতো ভাইয়ের নামে করে, দাদার নামে করে। আইন থাকলেও তার ইমপ্লিমেন্টেশন (বাস্তবায়ন) হচ্ছে না। আমাদের দেশে কোনো আইনই ইমপ্লিমেন্টেশন হয় না। সবই ইগনোর করে। যখন বড় ধরনের সমস্যা হয় তখন একজন একজন হয়তো ধরা পড়ে। নির্বাচনের আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ না করা হলে আইন থাকলেই কি আর না থাকলেই কি।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন আহমেদ রতন আসলে ঠিকাদার। কাউন্সিলর হওয়ার আগে থেকেই সিটি করপোরেশনসহ সরকারি কয়েকটি দপ্তরে ঠিকাদারি করতেন তিনি। অভিযোগ আছে, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর কৌশলে তার ঠিকাদারিতে অংশগ্রহণ বেড়ে যায়। নির্বাচিত হয়ে নিজ এলাকার বন্ধু ‘দি বিল্ডার্স লিমিটেড’র মালিক ফজলুল করিম চৌধুরী ওরফে স্বপন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ শুরু করান। অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া কাজে এ কাউন্সিলর প্রভাব বিস্তার করে কাজের অতিরিক্ত বিলও তুলে নেন। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ৩০ ভাগ কাজও শেষ হয়নি এসব প্রকল্পের। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ডিএসসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে। বলা হয়, পেছনে থেকে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজ আসলে তিনিই করান। নিজ এলাকার রাস্তা নির্মাণের কাজটিও তিনি শুরু করান। কাজের মান ভালো না হলেও স্থানীয় কাউন্সিলর হওয়ায় করপোরেশনের পক্ষ থেকেও তাকে কেউ কিছু বলতে পারেন না। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোস্তবা জামান পপিও ঠিকাদারিতে জড়িত। ক্যাসিনোকা-ে ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বহিষ্কৃত কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ সরাসরি নিজ প্রতিষ্ঠান বৈশাখী এন্টারপ্রাইজের নামে প্রতি বছর কোরবানির পশুর হাট ইজারা নিতেন, যিনি এবারও প্রার্থী হয়েছেন। গত বছর হাট নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ার পর পশুর হাটের ইজারা বাতিল করেছিল ডিএসসিসি। অভিযোগ আছে, ডিএনসিসি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফাও নিজ এলাকার উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি নিজেই করেন। একই অভিযোগ আছে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুর রউফ নান্নু, ৭ নম্বরের মোবাশ্বের চৌধুরী, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাকির হোসেন বাবুল, ২৪ নম্বরের মো. শফিউল্লা, ২৮ নম্বরের ফোরকান হোসেন, ৩০ নম্বরের আবুল হাসেম হাসুর নামেও।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদউদ্দিন আহমেদ রতন বলেন, আমি সিটি করপোরেশনের কোনো ঠিকাদারি করি না। দি বিল্ডার্সের স্বপন আমার নিজ এলাকার (ফেনী) বন্ধু। তার সঙ্গে আমার ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।’ ডিএনসিসির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল মোস্তফাও দাবি করেন, তিনি কোনো ঠিকাদারি করেন না।

আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা ঘেঁটে আরও দেখা গেছে, ঠিকাদারিতে জড়িত এমন তথ্য দিয়েছেন ডিএসসিসির ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাদাত, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. ইদি আমিন, ৬ নম্বরের শামসুল হুদা, ৯ নম্বরের আনোয়ার হোসেন ও এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, ১০ নম্বরের জুবের আলম খান, মারুফ আহমেদ মনসুর ও মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ, ১১ নম্বরের মির্জা আসলাম আসিফ ও হামিদুল হক, ১৬ নম্বরের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ২১ নম্বরের এসএম এনামুল হক, ২৫ নম্বরের আনোয়ার ইকবাল, ২৬ নম্বরের বদিউল আলম সুইট ও দ্বীন ইসলাম, ৩২ নম্বরের আব্দুস সালাম, ৩৪ নম্বরের আবুল হাসনাত, ৪৫ নম্বরের সাদেক আলী স্বপন, ৫২ নম্বরের রুহুল আমিন, ৬১ নম্বরের শাহ আলম, ৬৩ নম্বরের সোহেল আহম্মদ, ৬৫ নম্বরের সামসুদ্দিন ভূঁইয়া, ৬৬ নম্বরের নুর উদ্দিন মিয়া, ৬৮ নম্বরের সহিদুল ইসলাম এবং ৭১ নম্বরের প্রার্থী মো. খাইরুজ্জামান। একই তথ্য দিয়েছেন ডিএনসিসির ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, ৪ নম্বরের সাব্বির দেওয়ান, ৭ নম্বরের মো. তফাজ্জল, ৮ নম্বরের নজরুল ইসলাম (খাঁন পাখি) ও ফেরদৌসী আহমেদ, ৯ নম্বরের মুজিব সারোয়ার মাসুম, ১২ নম্বরের হারুনুর রশিদ ও মুরাদ হোসেন, ১৪ নম্বরের রেজাউল হক ভূঁইয়া, ১৫ নম্বরের জহির আহমেদ ও জাহিদুর রহমান, ১৭ নম্বরের শাহিনুর আলম, ১৮ নম্বরের শরিফ উদ্দিন, ১৯ নম্বরের সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন, ২০ নম্বরের মো. নাসির ও জাহিদুর রহমান, ২৩ নম্বরের শাখাওয়াত হোসেন, ২৪ নম্বরের হুমায়ুন কবির আহম্মেদ ও তালুকদার সারওয়ার হোসেন, ২৫ নম্বরের আশরাফ উদ্দিন খান ও হাসেম মিয়া, ২৮ নম্বরের আফতাব উদ্দিন ও ফোরকান হোসেন, ২৯ নম্বরের সামিউল আলিম চৌধুরী, ৩১ নম্বরের খোন্দকার মো. এমরান ও শফিকুল ইসলাম, ৩৩ নম্বরের এসএম আহমাদ আলী, ৩৫ নম্বরের ফয়জুল মুনির চৌধুরী, ৪১ নম্বরের নবী হোসেন, ৪৩ নম্বরের আক্তার হোসেন, ৪৫ নম্বরের জয়নাল আবেদীন, ৪৯ নম্বরের শাহাব উদ্দিন, শফিউদ্দিন মোল্লা, আনিছুর রহমান নাঈম ও হারুন অর রশিদ, ৫১ নম্বরের আফাজ উদ্দিন এবং ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ফরিদ আহম্মেদ।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও পূজার জন্য তারিখ পরিবর্তন করে ১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এবার ঢাকার দুই সিটির প্রতিটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ঢাকার দুই সিটি,নির্বাচন,কাউন্সিলর প্রার্থী,হলফনামা,ইসি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close