• সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
  • ||

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাবে বাংলাদেশ ও ভারত

প্রকাশ:  ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:০৫ | আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:৩৮
মো. খসরু চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতিতে তৃতীয় যেকোনো দেশে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশকে নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারের ট্রানজিট দেওয়ার কথা জানিয়েছে ভারত। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে একমত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে তিস্তা চুক্তির জন্য আবারও অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে ভারত আগ্রহ দেখিয়েছে ফেনী নদীর বিষয়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ এবং চলতি বছরই দুই দেশ সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (সেপা) সইয়ের জন্য আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে।

মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর উপলক্ষে ঢাকা ও নয়াদিল্লি থেকে একযোগে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়। বাংলাদেশকে ট্রানজিট সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ভারতের স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে নেওয়া যাবে। এ পরিবহনের জন্য বাংলাদেশকে কোনো শুল্ক ফি দিতে হবে না ভারতকে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়- উভয় নেতা দ্বিপক্ষীয় সব বিষয় আলোচনা করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও কানেকটিভিটি, পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, সংস্কৃতি এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়। পাশাপাশি তাঁরা ভবিষ্যতে নতুন নতুন ক্ষেত্র যেমন পরিবেশ, জলবায়ু, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশবিজ্ঞান, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও সমুদ্র অর্থনীতিতে সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। দুই নেতা চলমান রেল সহযোগিতা ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রেল সংযোগ উন্নয়ন বিষয়ে বেশ কিছু নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অনুরোধে অনুদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০টি ব্রডগেজ ডিজেল লোকোমোটিভ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।

এছাড়া নতুনভাবে কাউনিয়া-লালমনিরহাট-মোগলঘাট-নিউ গীতালদহ রেল সংযোগ স্থাপন, হিলি ও বিরামপুরের মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপন, বেনাপোল-যশোর রেলপথ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং রেল স্টেশনের মানোন্নয়ন, বুড়িমারী ও চ্যাংড়াবান্ধার মধ্যে রেল সংযোগ পুনঃস্থাপন, সিরাজগঞ্জে একটি কনটেইনার ডিপো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি ইতোমধ্যেই চলতে থাকা রেল সংযোগের কয়েকটি প্রকল্পের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- টঙ্গী-আখাউড়া লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, বাংলাদেশ রেলওয়েতে রেলওয়ে রোলিং স্টক সরবরাহ, ভারতীয় রেলওয়ের স্বনামধন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার উন্নতি নিশ্চিতে আইটি-সংক্রান্ত সহযোগিতা প্রদান।

সিদ্ধান্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে রক্ষা পেতে ভারত থেকে বাংলাদেশে চাল, গম, চিনি, পিঁয়াজ, আদা এবং রসুনের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের আনুমানিক সরবরাহ নিশ্চিতে উভয় দেশের মাঝে বিশেষ ব্যবস্থায় পণ্য সরবরাহের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার।

সীমান্ত সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ-ভারত। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা। ত্রিপুরা সেক্টর থেকে শুরু করে সমগ্র সীমান্তের কাঁটা তারবিহীন অংশগুলোতে কাঁটাতার নির্মাণের কাজ শেষ করার বিষয়ে উভয় নেতা একমত হয়েছেন।

অন্যদিকে, এর মধ্যে মানুষ এবং পণ্যের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সম্পর্কিত অবকাঠামো নির্মাণ।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াইয়ের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে তারা এই অঞ্চল ও এই অঞ্চলের বাইরে সন্ত্রাসবাদ, সহিংস চরমপন্থা এবং মৌলবাদের বিস্তার প্রতিরোধে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য যানবাহন সংগ্রহের পরিকল্পনাসহ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা লাইন অব ক্রেডিটের অধীনে প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক চূড়ান্তকরণে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়াতে ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত উপকূলীয় রাডার সিস্টেম সমঝোতা স্মারকের প্রাথমিক কার্যকারিতা চূড়ান্ত করেছে দুই দেশ।

নদীর পানি-সংক্রান্ত সহযোগিতার মধ্যে কুশিয়ারা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আসাম রাজ্য সরকারসহ ভারতের সব অংশীদারকে সহযোগিতায় এই সমঝোতা হয়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের জমিতে সেচ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কৃষকরা উপকৃত হবে। উপকৃত হবে দক্ষিণ আসামও। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ফেনী নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ত্রিপুরার জনগণের জন্য শিগগিরই ফেনী নদী থেকে ভারত ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন করতে পারবে।

২০১১ সালে চূড়ান্ত হওয়া তিস্তা চুক্তি শেষ করার জন্য বাংলাদেশ পুনরায় অনুরোধ জানায়। গঙ্গার জলের সর্বোচ্চ ব্যবহারে একটি সমীক্ষা করতে যৌথ কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন পানি বণ্টন চুক্তির কাঠামো তৈরির জন্য অন্য নদীগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করার। দুই দেশের নদী দূষণ মোকাবিলা, নদীর পরিবেশ ও নাব্যতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার জন্য সিঙ্ক্রোনাস গ্রিড কানেকটিভিটির মাধ্যমে কাটিহার (বিহার) থেকে পার্বতীপুর (বাংলাদেশ) হয়ে বোরনগর (আসাম) পর্যন্ত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৭৬৫ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনে ‘স্পেশাল পারপাজ ভেহিকল’ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সংযোগের মাধ্যমে শীত-গ্রীষ্ম মৌসুমের চাহিদা অনুসারে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানি উভয়ই সহজ হবে বলে মনে করছে দুই দেশ। অন্যদিকে নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশকে নিয়ে প্রস্তাবিত উপ-আঞ্চলিক পাওয়ার গ্রিড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ সম্মতি পাওয়া গেছে।

জ্বালানি খাতে ভারত থেকে সরাসরি বাংলাদেশে উচ্চ গতির ডিজেল পরিবহনের জন্য ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হবে বলে আশা করছে দুই দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা মেটাতে দুই দেশের অনুমোদিত সংস্থার মধ্যে প্রাথমিক আলোচনায় সম্মতি দিয়েছে ভারত। ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড বাংলাদেশে জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকারে) ভিত্তিতে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করার অনুমোদন লাভ করেছে।

উপ-আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে মহেন্দ্রগঞ্জ (মেঘালয়) থেকে হিলিকে (পশ্চিমবঙ্গ) সংযুক্তকারী একটি নতুন হাইওয়ে নির্মাণের জন্য বিশদ প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তাব করেছে ভারত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কেও যুক্ত হতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ভারতকে।

ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে বিনামূল্যের ট্রানজিট ব্যবহার করার জন্য বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এতে তৃতীয় কোনো দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির সুযোগ করে দিয়েছে ভারত। এই সুযোগে নেপাল এবং ভুটানে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রানজিটের বাইরে।

পারস্পরিক লাভজনক দ্বিমুখী বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির বিষয়ে উভয় পক্ষের বাণিজ্য বিষয়ক কর্মকর্তাদের ২০২২ সালের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে এবং ২০২৬ সালের আগে এই চুক্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দরে একটি দ্বিতীয় মালবাহী গেট নির্মাণের জন্য অর্থায়নে ভারতের দেওয়া প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।

সহযোগিতার ভবিষ্যৎ ক্ষেত্রও নির্ধারণ হয়েছে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরে। এর মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ, ভারতে বাংলাদেশি স্টার্ট-আপ প্রতিনিধি দলের প্রথম সফর, মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, গ্রিন এনার্জি, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং অর্থ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত পরিষেবাগুলোতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেছে ভারত। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এসব লোককে নিরাপদ, টেকসই এবং দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে সবসময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপরই আবার জোর দিয়েছে ভারত।

গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারত বেশ কটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চেতনায় দুদেশ অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান করেছে। যদি বাংলাদেশ এবং ভারত অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তবে তা শুধু দুদেশের জন্যই নয়, সমগ্র অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।

ভারত-বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়েছে ৫৪টি নদী। এই নদীগুলো শত শত বছর ধরে দুদেশের মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। এসব নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকগাথা ও লোকসংগীত আমাদের একীভূত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। আশা করি, দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতার মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তার পানিবণ্টনের সফলতাও ঘরে তুলবেন। একই সঙ্গে অতীতের মতো ভারত বন্ধুদেশ হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী

বাংলাদেশ,ভারত
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close