• সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
  • ||

চা-শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান

প্রকাশ:  ২১ আগস্ট ২০২২, ২০:৫১ | আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২২, ২০:৫৯
জিয়াউল হক মুক্তা

বাংলাদেশ ও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়ের অন্যতম হলো চা। চা চিনাদের উদ্ভাবন হলেও বাংলাদেশে ও পরে ভারত উপমহাদেশে এর প্রচলন হয়েছে বৃটিশ ঔপনিবেশিক বণিকদের নেতৃত্বে— প্রাথমিকভাবে নিজ দেশের চায়ের অভাব মেটানোর জন্য সূচনা করে। এ প্রচলনে অন্তর্গত ছিল উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত। পাশাপাশি চায়ের স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের জন্য এরা রেল স্টেশন ও পুরোনো শহরগুলোতে সাইনবোর্ড স্থাপনের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে জনগণকে বিনামূল্যেও চা পান করিয়েছে।

চা শ্রমঘন একটি খাত। উৎপাদন-বিতরণ-বিপণনসমেত এ খাত শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রির মর্যাদা ভোগ করে। শ্রমঘন এ শিল্পে চা পাতার কুঁড়ি সংগ্রহের কাজটি করে থাকেন নারী শ্রমিকগণ। আগে-পরে অপরাপর কাজে পুরুষ শ্রমিকগণ অংশগ্রহণ করে থাকেন।

ঔপনিবেশিক অভিঘাত নির্মমতম সম্ভবত জনমিতিতে। বাংলাদেশের সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখবো পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সক্রিয় হরিজন সম্প্রদায়— যার অন্তর্গত হলেন ধাঙর ও বাঁশফোঁড় ও আরও কতিপয় নৃগোষ্ঠি— এবং যারা চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন— উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদেরকে এ অঞ্চলে আনা হয়েছিল সোনালী ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়ে; আজীবন কাজ ও মজুরির আশ্বাস দিয়ে। বাংলাদেশে এসব পেশায় নিয়োজিত হবার আগে তারা মাতৃভূমিতে বিভিন্ন ধরনের কুটির শিল্প ও কৃষিতে যুক্ত ছিলেন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত নতুন সামন্ত সমাজের নগরায়ন ও ১৮৩৮ সালে সূচিত চা-শিল্প চালুর বেনিয়াপ্রয়াস আড়কাঠি নামে পরিচিত দালালদের মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠিকে এদেশে এনেছিল। শোষিত-নির্যাতিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত-প্রতারিত এ জনগোষ্ঠিগুলোর মধ্যে ১১৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠির চা-শ্রমিকগণ ১৯২১ সালে একবার মাতৃভূমিতে ফিরে যাবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।মুল্লুক চলো নামে পরিচিত এ স্বদেশ-প্রত্যাবর্তন-উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী চা-শ্রমিকদের ওপর চাঁদপুর জাহাজ ঘাটে জাহাজে ও রাতে সেখানে ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর বৃটিশ কোম্পানি নিয়োজিত গুর্খা সৈন্যরা গুলিবর্ষণ করে তাদের হাজার হাজার জনকে হত্যা করে। রেল শ্রমিক, জাহাজ শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের সমর্থনপুষ্ট সুদীর্ঘ মুল্লুক চলো আন্দোলন অংশত সাফল্যও অর্জন করে।

চা-শ্রমিকগণ এখন জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। শ্রমিক হিসেবে তারা শ্রম আইন হিরোধী নিকৃষ্টতম শ্রমশোষণের শিকার আর নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম মাত্রার ন্যূনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শ্রমিক হিসেবে ও নাগরিক হিসেবে তাদের সকল ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য থেকে তাদেরকে এমনভাবে বঞ্চিত করা হয় যেন কোনক্রমেই তারা চা-শ্রমিক থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে না পারেন— যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তারা কেবল চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন।

অন্ন-বস্ত্র-চিকিৎসা-শিক্ষা-বাসস্থান কোনো ক্ষেত্রেই তারা ন্যূনতম অধিকার পাচ্ছেন না। দৈনিক ১২০ টাকা মজুরিতে তারা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন; প্রতিবেশি দেশে এ মজুরির পরিমান দৈনিক ৬৫০ থেকে ১০০০ টাকা। ১২০ টাকায় একজন মানুষ কি সামান্য হলেও মানুষের জীবন যাপন করতে পারেন?

তাদের চিকিৎসা-শিক্ষা সেবা বাংলাদেশের দুর্গমতম অঞ্চলের জনগণের চেয়েও কম। তারা কোনোদিন ভূমির মালিক হতে পারেন না— কারণ তারা বাগানে থাকেন। এর মর্মান্তিক দিক হলো বসতভিটায় কোন গাছ লাগালে সে গাছেরও মালিকানা দাবি করে কোম্পানি। প্রয়োজন মনে করলেই চা কোম্পানি তা কেটে নিয়ে যায়।

পনের লক্ষাধিক চা-শ্রমিকের অবহেলার ও বঞ্চনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিকটি হলো— তারা স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার আন্দোলনের উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু অজানা বিস্ময়কর কারণে কখনো তারা বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর কনফেডারেশন শ্রমিক কর্মচারি ঐক্য পরিষদ বা স্কপ-এর আঞ্চলিক ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের কোনো সমর্থন পাননি। কোম্পানি স্কপ-এর স্থানীয় নেতৃত্বকে কিনে নিয়ে তাদের মাধ্যমে জাতীয় নেতৃত্বকে বাধ্য করে চা-শ্রমিকদের পক্ষে কোনো অবস্থান না নিতে। কোম্পানি এমনকি চা-শ্রমিকদের ইউনিয়ন নেতৃত্বকেও অর্থ দিয়ে ও অত্যাচার করে শ্রমিকদের ইস্যুতে কোনো আন্দোলন করতে দেয়নি দশকের পর দশক ধরে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রাযুক্তিক সুবিধা ব্যবহার করে সাধারণ জনগণ এবারে সূচিত আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় জাসদ ও আরও কিছু বামপন্থি সংগঠন আর সিলেটে জাসদ ও অপরাপর বামপন্থি প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। কিছু নাগরিক সংগঠনও তাদের সমর্থন দিচ্ছেন।

অন্যদিকে স্কপ ও অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দল এখনো তাদের সমর্থন দেয়নি। লজ্জাজনক হলো গণমাধ্যমের বেশ কিছু— বিশেষত কতিপয় টেলিভিশন চ্যানেল চা-কোম্পানির মালিকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বিষয়ে মালিকদের মিথ্যাচার ও অপপ্রচরকে গতি দিচ্ছে।

সারা বিশ্বে গত শতকের শেষ দশকে ন্যায্য বাণিজ্য আন্দোলন ও ভোক্তা আন্দোলনগুলো চা-ও কফি শ্রমিকদের জীবনমানের দিকে মনযোগ দেয়। এথিক্যাল টি ও এথিক্যাল কফির ধারণা বিকশিত হয়। প্রাগ্রসর অর্থনীতির দেশে জনগণ সে সমস্ত চা-কফিকেই গ্রহণ করেন যেগুলোতে শ্রমিকের রক্তের দাগ নেই।

বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ চা পান করেন; কিন্তু ভোক্তা হিসেবে তারা সংগঠিত নন। নাগরিক হিসেবে কেউ কেউ চা-শ্রমিকদের পক্ষে থাকলেও তারা সমগ্র চা-প্রেমীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও অরাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি ভোক্তাগণ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে চা-শ্রমিকদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেন তা হয়তো অন্তত মতামত গঠনে ভূমিকা রাখবে।

১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা নয়, এমনকি ৫০০ টাকাও নয়; চা-শ্রমিকদের মজুরি প্রতিদিন ১০০০ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানাতে হবে। মজুরি বৃদ্ধির চলমান আন্দোলনে সমর্থনের পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে মালিক ও সরকার পক্ষকে বিশেষ মনযোগ-উদ্যোগ-বরাদ্দ প্রদানে বাধ্য করতে হবে। সরকারের সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিশেষ প্যাকেজ সকল চা বাগানের সকল শ্রমিক ও তাদের পরিবার সদস্যদের জন্য সম্প্রসারণ করতে বলতে হবে।

এদেশের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবহেলা-শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার আর ন্যূনতম মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার, শিশু অধিকার থেকে বঞ্চিত এ ১৫ লক্ষাধিক মানুষকে পেছনে রেখে জাতি হিসেবে এগুনো সম্ভব নয়। সেজন্য সকল সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-মানবিক-নৈতিক সংগঠন-প্রতিষ্ঠানগুলোকে চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলোকে সমর্থন করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, লড়াই।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এআই

চা-শ্রমিক,খোলামত,জিয়াউল হক মুক্তা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close