• রোববার, ১৪ আগস্ট ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

পদ্মা সেতু নিয়ে ফান হচ্ছে, গান হচ্ছে না

প্রকাশ:  ২৫ জুন ২০২২, ১১:১২ | আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১৬:২০
সোহেল অটল

ঠিক এই মুহূর্তে একটা বিখ্যাত মুভির নাম মনে পড়ছে-- ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই‘। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া এই মুভির পরিচালক ডেভিড লিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হাতে ধরা পড়া ব্রিটিশ সৈন্যদের শ্রমে থাইল্যান্ডের কাওয়াই নদীর ওপর নির্মিত ওই ব্রিজ জাপান সেনাবাহিনীর কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গোটা কয়েক পিলারের ওপর মূল ব্রিজের কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল জরুরী সামরিক প্রয়োজনে। জঙ্গলের ভেতর নির্মিত ওই ব্রিজ সাধারণের বিশেষ কোনো কাজে আসেনি। তবে ওই ব্রিজ ফরাসি ঔপন্যাসিক পিয়ের বুলের এতটাই মনোযোগ কেড়েছিল যে তিনি আস্ত একটা উপন্যাস লিখে ফেলেন। ‘দ্য ব্রিজ ওভার দ্য রিভার কাওয়াই‘ নামে সে উপন্যাস ১৯৫২ সালে প্রকাশ পায়। পরিচালক ডেভিড লিনের নজরে পড়ামাত্র তিনি এটার ওপর চলচ্চিত্র বানানো শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া মুভিটি ‘ক্লাসিক মুভি‘র মর্যাদা পায়।

একটা সাধারণ ব্রিজকে দুজন সৃষ্টিশীল মানুষ কিভাবে অসাধারণ করে তুললেন, ইতিহাসে অমরত্বের জায়গা করে দিলেন-- এটা তার প্রমাণ।

সেই তুলনায় আমাদের পদ্মা সেতু মোটেই সাধারণ ব্রিজ নয়। ইঞ্জিনিয়ারিং মারপ্যাঁচের হিসাবে এটাকে জটিলতম ব্রিজের তকমা পেতে হয়েছে ইতোমধ্যেই। বিশ্বের সবচেয়ে পাগলা নদীগুলোর একটা-- পদ্মা। তার বুকের ওপর ব্রিজ তৈরির চ্যালেঞ্জ শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংয়েই ছিল না, চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের টানাটানির অর্থনীতি নিয়েও। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় আমাদের সংসারে, সেখানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ব্রিজ নির্মাণ করে ফেলা তো স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার।

আসলেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জয় করেছি, কোনো বিদেশী দাতা সংস্থার লোন ছাড়াই ব্রিজটি করে ফেলেছি।

একটা মাত্র ব্রিজ পুরো একটা দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক উঠতে পারে, পদ্মা সেতু সেই সম্ভাবনার কথাই বলে। অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদদের কথা বিশ্বাস না করেও আমরা বলতে পারি, পদ্মা সেতু আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে।

এমন একটা উপলক্ষে গান তৈরি হবে না, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে তো ব্যাপারটা যায় না। এ দেশে সুন্নতে খৎনা উপলক্ষে গান তৈরি হয়, আর পদ্মা সেতু নিয়ে গান হবে না?

হচ্ছেও তাই। অসংখ্য গান ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। রাম-রহিম তো আছেই, এই লাইনে আছে বাঘা বাঘা শিল্পী-কুশলীর নামও। বিটিভি, চ্যানেল আই এর মতো টিভি স্টেশনের নিজস্ব প্রযোজনাও রয়েছে।

বলা বাহুল্য, পাতে তোলার মতো গান একটাও কানে বাজেনি এখনো।

কোন বিচারে পাতে তোলার অযোগ্য বলছি এসব গানকে, সেটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

প্রথমেই ধরি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভির কথা। অতি সম্প্রতি পদ্মা সেতু নিয়ে দুটো গান তারা নির্মাণ ও প্রচার করেছে।

একটা গানের কথা এমন-- দম্ভ করে বলতো যারা পদ্মা সেতু হবে না/ জোড়াতালির পিলার নাকি স্রোতের টানে রবে না/ আজকে তারা মুখ লকোবার জায়গা পাবে কই/ আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু দেখো ওই।

আরেকটা গানের কথা এমন-- বিশ্বের কাছে আমরা যেদিন বাড়িয়েছিলাম হাত/ ওরাই সেদিন দেখিয়েছিল নানান অজুহাত/ দেশের অর্থে সেতু নির্মাণে আমরা এনেছি বিজয়/ শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিলেন, কেমন করে এগিয়ে যেতে হয়।

দুটো গানেরই গীতিকার এবং সুরকার মিল্টন খন্দকার। প্রথমটির প্রযোজক আবু তৌহিদ, দ্বিতীয়টির মাহবুবা ফেরদৌস।

কতটা দরিদ্র মানসিকতার হলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারের জন্য এমন কথা দিয়ে গান লেখা যায়, তা মাথায় ধরে না। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার চলে সাধারণ জনগণের করের টাকায়। সাধারণ মানুষের জানতে চাওয়ার অধিকার আছে-- তাদের টাকা খরচ করে এমন প্রতিহিংসা পরায়ণ কথা দিয়ে কেন গান বানানো হল? কেন সামগ্রীক অর্থে এই গানগুলো আমাদের শৌর্য, আমাদের গর্ব প্রকাশ করতে পারল না? শুধু চাটুকারিতা এবং হিংসার মধ্যেই কেন গানগুলো সীমাবদ্ধ থাকলো?

আরেকটা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ বেতারও পদ্মা সেতু নিয়ে গান নির্মাণ ও প্রকাশ করেছে। ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু‘ শিরোনামের সেই গানটিও চাটুকারিতার দোষে দুষ্ট। ক্ষমতাসীনদের স্তুতিতে ভরপুর গানের কথামালায়।

বুঝলাম, রাষ্ট্র তার জনগণের তোয়াক্কা করে না। সে কারণেই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই কী করল? ফরিদুর রেজা সাগরের পরিকল্পনায় তারা ‘আমরাও পারি‘ শিরোনামে একটি গান প্রকাশ করেছে যার কথা এমন-- দাও বলে দাও দেখে যাক ওরা/ এই পদ্মা সেতু নিজ হাতে গড়া/ কারো ভাগ নেই, শুধু আমারই/ দেখো পৃথিবী, আমরাও পারি।

ইবরার টিপুর সঙ্গীতে এই গানে সামিনা চৌধুরি, ফাহমিদা নবীসহ তারকা শিল্পীদের অংশগ্রহণ রয়েছে।

জুলফিকার রাসেলের লেখা এই গানে কাদেরকে এই ব্রিজ দেখার আহবান জানানো হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। ‘কারো ভাগ নেই, শুধু আমারই‘ পরের এই লাইন শুনে মনে হয় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে-- এই দ্যাখো, তোমরা তো বিনিয়োগ ফিরিয়ে নিয়ে গেলে, এখন আমরা নিজেরাই করে ফেললাম।

আকাশে চাঁদ উঠে কখনো বলে না-- এই দ্যাখো আমি উঠেছি, তোমরা আমার দিকে তাকাও। চাঁদের অসাধারণত্ব এবং অপরিহার্যতা তার দিকে তাকাতে সবাইকে বাধ্য করে। চ্যানেল আইয়ের ‘আমরাও পারি‘ শিরোনামের গান পুরো শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশের এই সাফল্যের একটা প্রতিপক্ষ আছে, তাদের জন্য এই গান। বলা বাহুল্য, সুক্ষ্ম চাটুকারিতাও আছে এই গানে। এটা অবশ্য স্বাভাবিক। পদ্মা সেতু নিয়ে গান হচ্ছে সেখানে চাটুকারিতা না থাকাটাই বেমানান। অন্তত আমাদের দেশের সংস্কৃতি তাই বলে। এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী নেতৃত্বের স্তুতি গাওয়া হচ্ছে, যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় থাকতো, তখন তার স্তুতি গাওয়া হতো। জাতী হিসেবে আমরা এমনই।

এই চারটি গানের বাইরেও যত গান শুনলাম, মোটা দাগে বলতে গেলে তার সবই সরকারকে তোষামোদ করে তৈরি করা হয়েছে। কোথাও বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করে, কোথাও আরো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে এসব কোনো গান হয়নি। এগুলোকে ‘তোষামোদী সং‘ কিংবা ‘চাটুকারি সং‘ বললে অত্যুক্তি হবে না। আর এই চাটুকারিতা করতে গিয়ে পদ্মা সেতুর যে বিশালতা, তার বহুমুখী অপরিহার্যতা, আমাদের অনন্য অর্জন-- তা চাপা পড়ে গেছে।

পদ্মা সেতুর অফিসিয়াল থিম সংটি অবশ্য এখনো শোনা হয়নি। কবির বকুলের লেখা ও কিশোর দাশের সুরে এই গানেও দেশের তারকা শিল্পীদের সমারোহ দেখা যাবে। অবশ্য অতি সন্নাসীতে গাজন নষ্ট বলে প্রবাদ আছে। গানটি এখনো উন্মুক্ত নয় বলেই শুনতে পাইনি। তবে আগে-পরের পদ্মা সেতু নিয়ে গানের যে চিত্র দেখছি, তাতে থিম সং নিয়ে কতটা আশাবাদী হবো, বুঝতে পারছি না।

গত শতকের সত্তর এর দশকে ঈগলস ব্যান্ডের একটি গান সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। গানটির শিরোনাম-- হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া। পৃথিবীর জনপ্রিয়তম গানগুলোর একটা। অস্তিত্বহীন একটা স্থাপনার নামে গান গেয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মনে হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ার অস্তিত্ব তৈরি করেছিল ঈগলস।

ধরা যাক, দুই পাশে মরুময় একটি অন্ধকার হাইওয়ে ধরে যাচ্ছেন। চুলে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে শীতল হাওয়া। বহু দূরে একটা হোটেলের আবছা আলোর দেখা পেলেন। মাথা গোঁজার জন্য সেই হোটেলে থামতে হবে আপনাকে। হোটেলে ঢোকার পথে বাতি ধরে আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে এক রহস্যমানবী। সেই পথ স্বর্গেরও হতে পারে, হতে পারে নরকেরও।

গানে এই গল্পটাই বলা হয়েছিল। অথচ কী দারুণ শব্দে-সুরে তা অলীক অবয়ব তৈরি করে শ্রোতাদের মনে। গান শোনার সময় সত্যি সত্যি এক ভূতুড়ে ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া‘ ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

গান প্রকাশের বহু পরে ব্যান্ডের সদস্যরা বলেছিলেন-- যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্ষয়িষ্ণু সঙ্গীতশিল্পের কথা ভেবেই এই গান লেখা হয়েছিল। ঈগলস এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ডন হেনলি এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন-- আমাদের চিরচেনা আমেরিকার দূর্বলতাগুলো নিয়েই এই গান।

পদ্মা সেতু নিয়ে যে গানগুলো তৈরি হয়েছে কিংবা এখনো হচ্ছে সে প্রসেঙ্গ দুটো কথা বলে শেষ করি।

এক. সৃজনশীলতার সঙ্গে সততার মিশ্রণে কত অসাধারণ সৃষ্টি হতে পারে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ-- ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই‘। শত শত গানের দারকার নেই, একটা সলিড গান হওয়া দরকার। যে গানে আঠারো কোটি মানুষের প্রাণের কথা একসুরে বেজে উঠবে। কোনো হিংসা থাকবে না, চাটুকারিতা থাকবে না। আমাদের অনন্য এই অর্জনকে প্রতিনিধিত্ব করবে চমৎকার সব ইতিবাচক কথামালায়। পদ্মা সেতু আঠারো কোটি মানুষের কষ্টের টাকায় তৈরি হয়েছে। যে গানই তৈরি হোক, সে গানকে যেন সবাই নিজের মনে করতে পারেন। কেউ যেন পদ্মা সেতুর মতো অর্জন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন, তেমন গান হওয়া দরকার।

দুই. একটা ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া‘ তৈরি হওয়া দরকার। এই বাংলায়। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা এবং ক্ষয়িষ্ণু সঙ্গীতশিল্পের আঁতে ঘা দেয়ার জন্য, চিরচেনা বাংলাদেশের দূর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার জন্য।

সোহেল অটল: সাংবাদিক ও লেখক [email protected]

পূর্বপশ্চিম- এনই

পদ্মা সেতু,সোহেল অটল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close