• সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯
  • ||

বিচারহীনতা আর বেহায়াপনা কাকে বলে?

প্রকাশ:  ২১ এপ্রিল ২০২২, ০৩:৪৬ | আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ০৩:৫০
মানিক মুনতাসির

কিছুদিন আগে ঢাকার শাহাজানপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যায় কলেজ ছাত্রী প্রীতি। তার বাবা ও মা আক্ষেপ করে বলেছিলেন কার কাছে বিচার চাইব। আমার তো টাকা নাই, তাই মামলাও করব না৷ সে কথা আমরা ভুলেই গিয়েছি।

তার কয়েকদিন পর নারায়নগঞ্জে একজন যুবককে তার স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে ও পিটিয়ে মারা হয়। পরে ঐ হতাভাগার চোখগুলো পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়। ঘাতক খোদ ঐ এলাকার কাউন্সিলর। যিনি রাতের আঁধারে ঐ যুবককে লোক মারফত ডেকে নিয়ে সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশ নেন সপরিবারে। নিহতের স্ত্রী কেঁদে কেঁদে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়েছিলেন। এরপর উপযুক্ত মামলা পর্যন্ত হয়নি। বিচার তো অনেক পরের বিষয়৷ এমন কি এ ঘটনার নিউজও হয়নি ঠিকমত।

তার কয়েকদিন আগে শ্যাওড়াপাড়ায় ডা. বুলবুলকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত বুলবুলকে আলহেলাল হাসপাতালের ডাক্তাররা জরুরি চিকিৎসা পর্যন্ত দেননি। বুলবুলের হত্যায় নেতৃত্বদানকারী ঘাতকও এখনো গ্রেফতার হয়নি।আমরাও বুলবুলকে বেমালুম ভুলে গেছি। উপযুক্ত বিচার হবে সে আশাও করেননা তার স্ত্রী।

সবশেষ নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যকার মারামারিতে নিহত হয়েছেন নাহিদ নামের এক নিরীহ অনলাইন ডেলিভারি কর্মী৷ ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় আহত নাহিদকে হেলমেট পরিহিত ঘাতক কুপিয়ে মারছে। ঐ ঘাতক ব্যবসায়ী নামক নরপিশাচ নাকি দোকানকর্মী নাকি ছাত্র নামের হায়েনা। ঠিক বুঝতে পারছি না৷ নাহিদের বাবা ও মা একইভাবে বলেছেন কার কাছে বিচার চাইবো?

এর কয়েকদিন আগে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিও ফুটেজে দেখলাম কোন এক গ্রামে পুলিশের সামনে ঐ গ্রামের জনৈক ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে রাম দা দিয়ে কোপানো হচ্ছে।

বেচারা কাউন্সিলর অবশ্য জানে বেঁচে গেছেন।

এদিকে নাহিদ এবং ডা. বুলবুলরা মরে বেঁচে গেছেন। এখন মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণা ভোগ করছে নাহিদের নববধু। একই যন্ত্রনায় রয়েছে বুলবুলের অবুঝ সন্তানেরা। একইভাবে বুলবুলের স্ত্রী জীবন বাঁচাতে ইতিমধ্যে এই নারকীয় শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছেন।

উল্টোচিত্রও আছে, তেজগাঁও কলেজের নারী প্রভাষককে উত্যক্ত করার অপরাধে একজন পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে৷ ঐ টিপকান্ডে বহু রথি মহারথি ঘটনার প্রতিবাদও জানান। তড়িৎ গতিতে ঘটনার তদন্ত করে অপরাধীকে গ্রেফতারও করা হয়।

আবার কয়েকদিন আগে ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন এমন ঠুনকো অভিযোগে শিক্ষক হ্দয় মন্ডলকে জেলে পুরা হয়। তীব্র প্রতিবাদের মুখে হৃদয় মন্ডল জামিনে ছাড়া পেয়ে ক্লাসে ফিরেছেন৷

অথচ, আমরা ব্যস্ত রয়েছি উন্নয়নের খেলায়। এক পদ্মাসপতু, মেট্রোরেলের চটকদার বিজ্ঞাপনে জনগনকে সব ভোলাতে বেশ পারদর্শীতা দেখাচ্ছি। ছোট ছোট অপরাধকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করতে না করতে খুন, গুম, হত্যা এখন খুবই হালকা মনে হয়। হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়াকে দক্ষতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর বিচার চাওয়া কিংবা কোন অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়াকেই যেন অপরাধ হিসেবে গণ্য করছি।

পুনশ্চ:

এতে কি প্রমাণ হয় না যে আমরা একটা ছিচকে চোর কিংবা আত্মঘাতী জাতিতে পরিণত হয়েছি। আমাদের শাসকেরা বধির, একরোখা, একচোখা, বড্ড বেহায়া, নির্লজ্জ, গলাবাজ। যে জাতি নিজেকে ধংস করতে বদ্ধ পরিকর। মানুষকে জানে মেরে ফেলা হয় তার কোন প্রতিবাদ হয় না৷ অথচ পায়ুপথে নির্গত বায়ুর মাধ্যমে দূষণ ছড়ানোর অপরাধে মানুষকে হত্যা করা হয়। আবার জেলেও পুরা হয়। কিন্তু সারাদেশের বাতাস, শব্দ, পরিবেশ দূষণের দায়ে কাউকে সামান্য জরিমানাও করা হয় না৷ এমন কি হত্যার মত অপরাধকেও পাত্তা দেয়া হয় না শুধুমাত্র দলীয় কারণে। নতুন নতুন আইন করে গণমাধ্যমকে ঠেকানোর পথ খোজা হয় অথচ অপরাধ বন্ধের কোন উদ্যোগ নেই। এক অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া কিংবা ঘাতককে বাঁচাতে হাজারটা অপরাধ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। সেলুকাস, সেলুকাস সত্যিই সেলুকাস।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

পূর্বপশ্চিম- এনই

মানিক মুনতাসির,বিচারহীনতা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close