• শনিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২২, ৮ মাঘ ১৪২৮
  • ||

শেখ হাসিনা এবং সৈয়দ আশরাফের একটি গল্প

প্রকাশ:  ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ২৩:৪৮
সৈয়দ বোরহান কবীর

গল্পটা বলেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মন্ত্রিপাড়ায় এক বিকালে আমরা কজন দেখা করতে গেলাম আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের বাসায়। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, হুইপ মির্জা আজম, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং আমি। একটা বিষয়ে তাঁর মতামত জানার জন্যই ওই বৈঠকের আয়োজনটা করেছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। সৈয়দ আশরাফকে সে সময় পাওয়া আর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া একই ব্যাপার। এমনকি আমরা যখন তাঁর বাসভবনের গেট দিয়ে ঢুকছিলাম তখনো নিশ্চিত ছিলাম না শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে দেখা হবে কি না। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তখন তিনি। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। কিন্তু সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মন্ত্রণালয়ে যান কালেভদ্রে। হঠাৎ হঠাৎ নেতা-কর্মীদের সাক্ষাৎ দেন। গণমাধ্যমে কথা বলেন কদাচিৎ। যখন কথা বলেন তখন মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন।

আমরা যে সময় গিয়েছি তখন পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে সরকারের। তাঁর বাসভবনে ঢুকতেই আমাদের বলা হলো দোতলায় যেতে। লুঙ্গি আর একটা ফতুয়া পরা একবারে সাদামাটা একজন মানুষ আমাদের স্বাগত জানালেন। পুরো ঘর এলোমেলো। কিছু বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে। একটা টেলিভিশন পরিত্যক্তের মতো অনাদরে পড়ে আছে। ঘরটাতে রাজত্ব করছে সিগারেটের ধোঁয়া আর ছাই। আমরা কথা বলছি। সৈয়দ আশরাফ শুনছেন। দু-এক বার তাঁর মতও দিচ্ছেন ছোট করে। একসময় জিজ্ঞেস করলাম ‘আচ্ছা! আপনার কী মনে হয়- পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত হবে?’ সৈয়দ আশরাফ হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আপনার সন্দেহ আছে? শেখ হাসিনা যখন আছেন তখন পদ্মা সেতু হবেই। এটা জাতির প্রতি শেখ হাসিনার কমিটমেন্ট।’ মিতভাষী সৈয়দ আশরাফ এরপর বললেন, একটা গল্প কই শোনেন। এরপর কিশোরগঞ্জের ভাষায় যে গল্পটা বললেন তা এ রকম-

‘গরিবের এক ছেলে প্রচ- মেধাবী। এর-ওর বই নিয়ে লেখাপড়া করে। পাড়ায় লোকজন বলে, হ, টুকটাক পড়লে ভালো, স্বাক্ষরটা তো করতে পারব। এরপর ছেলেটা স্কুলে গেল। লোকজন বলা শুরু করল, স্কুলে গেছে ঠিকই কিন্তু পাস করবে না। ছেলেটা একের পর এক ক্লাসে প্রথম হয়ে পাস করল। এবার সে ম্যাট্রিক দেবে। গ্রামের লোকজন বলল, স্কুল আর ম্যাট্রিক কি এক হলো! ও ম্যাট্রিক পাস করুক আমি নাম পাল্টায় ফেলব। ওমা! ওই ছেলে ম্যাট্রিকেও দারুণ রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হলো। এবার প্রতিবেশীরা বলা শুরু করল, ম্যাট্রিকই শেষ কলেজ পাস করা কি এত সোজা। কলেজে ফেল করবে নির্ঘাত। কিন্তু ছেলেটা ইন্টারমিডিয়েটেও (এইচএসসি) দারুণ রেজাল্ট করল। এবার সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। এবার ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশীর সংখ্যা আরও বাড়ল। তারা বলল, গরিবের পোলার ঘোড়ারোগ। কই একটা পিয়নের চাকরি নেবে, না বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শখ পোলার! ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হলো, ভালোমতো পাস করল। এবার প্রতিবেশীরা যেন রীতিমতো ক্ষুব্ধ ছেলেটির ওপর। তারা যেন অভিশাপের ভঙ্গিতে বলল, পাস করছে ঠিকই কিন্তু চাকরি পাবে না। ছেলেটা আবার প্রতিবেশীদের অভিশাপে ছাই দিয়ে ভালো একটা চাকরিও পেল। হতাশ প্রতিপক্ষরা এবার সান্ত¡না খুঁজতে ঘোষণা করল, চাকরি পাইছে ঠিক আছে, বেতন পাবে না।’

নাগাড়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গল্পটা এ পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। একটা সিগারেট আবার ধরালেন। তারপর বললেন, ‘শেখ হাসিনার জীবনটা ওই পোলার মতো, বুঝছেন।’ সেদিন এই অসম্ভব প্রজ্ঞাবান মানুষটির গল্পের পুরো তাৎপর্য বুঝিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারি।

শেখ হাসিনা টানা প্রধানমন্ত্রিত্বের ১৩ বছর পূর্ণ করলেন ৬ জানুয়ারি। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তৃতীয় মেয়াদে তাঁর তিন বছর পূর্ণ হলো। ১৩ বছরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এবং উন্নয়ন এখন সমার্থক। বাংলাদেশ যে কীভাবে বদলে গেছে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড়, গবেষণা। কিন্তু এ দেশেরই কিছু মানুষের যেন কত হতাশা এ নিয়ে। বাংলাদেশের সব অর্জন, সব উন্নয়ন নিয়ে কিছু মানুষ যদি, কিন্তু, কবে লাগিয়ে দেন সারাক্ষণ। সৈয়দ আশরাফের সেই ছেলেটির গল্পের মতো। শেখ হাসিনা যখন ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেন তখন মুখ টিপে হাসা মানুষের সংখ্যা কি কম ছিল। একজন বিশাল পন্ডিত কলাম লিখলেন, ‘শিক্ষার মান উন্নত না করে ডিজিটাল বাংলাদেশ অবান্তর।’ কিন্তু আজ অনেক গৃহকর্মীও বিকাশে তার মায়ের কাছে মাসের শুরুতে টাকা পাঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় গড়ে উঠেছে বিরাট এক আর্থ-কর্মসংস্থানে মুখর জনগোষ্ঠী। শেখ হাসিনা যখন ২০০৮ সালে ঘোষণা করেছিলেন তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন। তখন তা বিশ্বাস করার মতো পন্ডিত কজন ছিলেন। যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলো তখন বলা হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, কিন্তু এদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ইত্যাদি কত বাধা আসবে তার ফিরিস্তি শুনলাম। কিন্তু হাসিনা আদালতের রায় কার্যকরে এতটুকু পিছপা হলেন না।

২০১৩ সাল থেকেই শুনলাম শেখ হাসিনা শেষ। আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। পাঁচ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের পর তো আওয়ামী লীগেই মাতম উঠেছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন, শেখ হাসিনা কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটা মানছেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন যখন ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তির চরম প্রকাশ ঘটিয়ে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিলেন, তখন অনেকে বলেছেন, ম্যাডাম আবার আসছেন। রাতের অন্ধকারে কতজন সে সময় বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তার হিসাব কে নিয়েছিল। এখন মন্ত্রী হয়ে নাদুসনুদুস হওয়া অনেককে বলতে শুনেছি, ‘আমাদের অবস্থা বিএনপির চেয়েও ভয়াবহ হবে।’ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির চেয়েও খারাপ হবে। সাত দিনও সরকার টিকবে না। শেখ হাসিনা নির্বাচন করলেন। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জন করল। চরম দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাম দলগুলোও নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটল। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়েও ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারত। ওই নির্বাচন বর্জন করে তারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের প্রতিই সমর্থন জানিয়েছিল। জাতীয় পার্টিও আংশিক রঙিন চলচ্চিত্রের মতো ২০১৪-এর নির্বাচন আংশিক বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগে যারা মনোনয়ন পেলেন তাদেরও মুখ ভার। একজন মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তির মন খারাপ দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী ভাই! মনোনয়ন পেলেন তা-ও মন খারাপ কেন? উত্তর দিলেন, ভাই ডাবল খরচ এজন্য? একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মানে? উত্তরে বললেন, এই যে কদিন পর আবার নির্বাচন করতে হবে। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী যে যেভাবে পারলেন প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। কেউ টাকা দিয়ে, কেউ ভয় দেখিয়ে। বিনা ভোটে এমপি হলেন ১৫৩ জন। বিনা ভোটে এবং নির্বাচনে জয়ী সবাই আরেকটি নির্বাচনের অপেক্ষায়। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে পিঠা উৎসবের আয়োজন করলেন। সেখানে কয়েকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, নতুন নির্বাচন কবে হচ্ছে। শেখ হাসিনা উত্তর দিলেন কেবল তো একটা নির্বাচন হলো। এত তাড়াহুড়া কেন? সবাই বলল, নির্বাচন হয়েছে, সরকারও গঠন হয়েছে, তবে এ সরকার টিকবে না। ছয় মাস, বড়জোর এক বছর। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা প্রায় জ্যোতিষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু সরকার ঠিকই পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করল। ২০১৮-তে নতুন নির্বাচন। কেউ কেউ বলাবলি করল এবার আওয়ামী লীগ শেষ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ভোটবিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর কেউ কেউ। কী আশ্চর্য, ওই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলো তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনে। অভিযোগ উঠল, ৩০ ডিসেম্বরে ভোট হয়নি, মহাজালিয়াতি হয়েছে। রাতের বেলা ভোট কাটা হয়েছে। বেশ ভালো কথা, কিন্তু প্রমাণ কই? কেউ প্রমাণ দিতে পারে না। কিছু মানুষ বলতেই থাকে। ২০১৯-এর ৭ জানুয়ারি গঠিত হলো মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় তোফায়েল আহমেদ নেই, আমীর হোসেন আমু নেই এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে শেখ হাসিনার সব থেকে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠা বেগম মতিয়া চৌধুরীও নেই। এরা কী করবেন? চারদিকে শুনলাম নানা কথাবার্তা। এবার শেষ। কিন্তু শেখ হাসিনা একাই সব সামলে এগিয়ে নিচ্ছেন দেশকে। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলো গোটা বিশ্বে। বাংলাদেশেও। এবার শুরু হলো করোনা নিয়ে শঙ্কার বাক্যবাণ। বাংলাদেশ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে, অর্থনীতি ধ্বংস হবে ইত্যাদি কত কথা। আঁতকে উঠলাম আমরা সবাই। এখন দেখছি করোনায় ল-ভ- ইউরোপ, আমেরিকা। সে তুলনায় ভালো আছি আমরা। করোনায় আবার পুরো বিশ্বের অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড। বাংলাদেশ তার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে। সব দেখেশুনে সৈয়দ আশরাফের গল্পের ভাবার্থ অনুধাবন শুরু করলাম নতুন করে। শেখ হাসিনা গল্পের সেই মানুষটির মতো। একের পর এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছেন আর সমালোচকরা তাঁর পরবর্তী ব্যর্থতার ভবিষ্যদ্বাণী করছেন।

পদ্মা সেতুর কথাই ধরা যাক। যখন শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিলেন তখন কেউ কেউ ভ্রু কোঁচকাল। এত টাকা কে দেবে? বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা অর্থায়নে এগিয়ে এলো। একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়াল, সঙ্গে অন্য দাতারাও। অনেকের উল্লাস চাপা থাকেনি সে সময়। টকশো আর বিবৃতিতে তারা কত কথা যে বললেন, যেগুলো এখন শুনলে নিশ্চিত তারা লজ্জা পাবেন। এরপর শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করবেন। কিছু কিছু মানুষ সে সময় মনে করল শেখ হাসিনা কী যে বলেন! সত্যি সত্যি নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু হয়ে গেল। এখন কী বলবেন তারা? সেতু হয়েছে ঠিকই এখানে যান চলাচল করবে না- এ-জাতীয় কিছু! আমাদের কতিপয় বুদ্ধিজীবী যদি এ ধরনের মন্তব্যও করেন আমি অবাক হব না।

এ সবই হলো প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বলা গল্পের খন্ডরূপ। কিন্তু পুরো গল্পটার অদ্ভুত মিল পাওয়া যায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের মূল অধ্যায়ে। শেখ হাসিনা যখন ’৭৫-এর রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এলেন, তখন অনেকে বলেছেন, রাজনীতিতে আসছেন, কিছু কিন্তু করতে পারবেন বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনা যখন বিধ্বস্ত, পথহারা আওয়ামী লীগকে দাঁড় করালেন, তখনো অনেক সমালোচক বললেন, দলের নেতা ঠিক আছে কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো দিন ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। শত্রু ও সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে ’৯৬ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আনলেন। তখনো সমালোচনা। ঠিক আছে, ক্ষমতায় এসেছেন, কিন্তু দেশ চালাতে পারবেন না। দেশ যখন ঠিকমতো চালালেন তখন বলা হলো, আপস, আপস। আওয়ামী লীগ কি সেই আওয়ামী লীগ আছে? যুদ্ধাপরাধীরা সংসদে বসে। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেন। এখন বুদ্ধিজীবীদের মুখে অন্য হতাশা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে। অর্থনীতিই হলো আসল কথা। সেদিকে তো অগ্রগতি নেই। শেখ হাসিনা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেন। মানুষের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গেল। গড় প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বের সেরা দেশগুলোর তালিকায় স্থান পেল বাংলাদেশ। তার পরও কিছু মানুষের মুখে কালো মেঘের ঘনঘটা। তারা খুশি নন। যে অর্থনীতিবিদরা আগে গড় মাথাপিছু আয়, জিডিপি ইত্যাদি পরিসংখ্যান দিয়ে বলতেন লক্ষণ ভালো না। বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। তারাই এবার বললেন এসব তথ্য-উপাত্ত ফালতু। এসব দিয়ে অর্থনীতির আসল চেহারা বোঝা যাবে না। এবার আওয়াজ উঠল বৈষম্য। ৫০ বছরে দেশ এগিয়েছে ঠিকই, তবে বৈষম্য বেড়েছে। ভালো কথা। শেখ হাসিনা যখন গৃহহীনদের ঘর দিলেন তখন কি বৈষম্য কমল না? আশ্রয়ণ, কমিউনিটি ক্লিনিক, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার মতো উদ্যোগগুলো কি বৈষম্য কমাতে নেওয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। শেখ হাসিনা যা করবেন তার সমালোচনা করার জন্য কিছু মানুষ যেন সারাক্ষণ বসে থাকে। শেখ হাসিনা কাজ দিয়েই এসব সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন।

আমার কাছে শেখ হাসিনাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউর মতো মনে হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সিঙ্গাপুরকে পাল্টে দিয়েছিলেন লি কুয়ান ইউ। সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন, কঠোর। তাঁর একটা বক্তৃতা শুনছিলাম। তিনি বলেছিলেন ‘এটা কোনো খেলা নয়। এটা আমার-আপনার জীবন-মরণ। আমি আমার গোটা জীবন উৎসর্গ করেছি সিঙ্গাপুর বিনির্মাণে। যত দিন বেঁচে আছি, এটা কেউ নষ্ট করতে পারবে না।’ জীবনসায়াহ্নে লি কুয়ানের একটি বক্তৃতা শুনে চমকে উঠি। শেখ হাসিনার প্রতিচ্ছবি দেখি ওই কথাগুলোর মধ্যে। লি কুয়ান বলছিলেন ‘আমি অসুস্থ হয়ে যদি বিছানায় পড়ে থাকি, তখনো যদি জানি ভুল কিছু হচ্ছে, আমি জেগে উঠব।’ লি কুয়ান ২৫ বছরে সিঙ্গাপুরকে পাল্টে দিয়েছেন। শেখ হাসিনাও ১৭ বছরে বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। পার্থক্য হলো, লি কুয়ান ছোট একটি দেশের ভাগ্য বদলেছেন কঠোর হাতে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশের ভাগ্য শেখ হাসিনা বদলেছেন প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

পূর্বপশ্চিম- এনই

সৈয়দ বোরহান কবীর
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close