• শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

একজন খন্দকার মুনীরুজ্জামান ও কিছু কথা

প্রকাশ:  ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:৫৬
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

দেশের সাংবাদিকতার জগতে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র খন্দকার মুনীরুজ্জামান। তিনি যখন বুকে সাহস নিয়ে হাত খুলে লেখা লেখি করেছেন, তখন ছিল বৈরী সময়।বৈরী সময় বলতে এটাই বুঝাচ্ছি, তিনি যখন লেখালেখি করেছেন তখন তার এবং তার মতো প্রগতিশীল সাংবাদিকদের পক্ষে ছিল না তখন সময়ের সকল কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রন করত দক্ষিনপন্থী রাজণৈতি ধারক-বাহকরা প্রগতিশীল লেখরাই বৈরী সময়ের মধ্যে সে সময় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি লোকজনে মনে আশার আলো জাগাতেন তাদের লেখনীর মাধ্যমে। তার মধ্যে খন্দকার মুনীরুজ্জামান একজন। তাদের মতো সাহসী ব্যক্তিরা এগিয়ে এসেছিলেন বলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জনতার রায় নিয়ে থাকতে পারছে।

একটা সময় ছিল, যখন মনে হতো দেশেটা যেন স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির লোকজনেরা একেবারেই গিলে ফেলেছে যারা আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে ভাই বোন হারিয়েছে, সম্পদ হারিয়েছে কিংবা যে নারী তার ইজ্জত হারিয়েছে, তারা মনে করেছে আর কোনো দিন মনে হয় সরকারি রেডিও টেলিভিশনে একাত্তরের রনাঙ্গনের গান আর কোনোদিন শুনতে পাবেনা। আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তির লোকজন যেমন ইতিহাস বিক্ষেতির মাধ্যমে আমাদের বিজয়ের ইতিহাসকে পিছনমুখী করার জন্য অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছিল, তখন মানুষ ধরে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর গৌরবের ইতিহাস কোনোদিন আর মানুষ শুনতে পাবেনা । মানুষ ধরে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর গৌরবময় রাজনীতির ইতিহাস বিরুদ্ধ শক্তির লোকজন দেশের মানুষকে ভুলিয়ে দিবে। কোনো দিন বোধ হয় আর সরকারি টিলিভিশনে কিংবা রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখতে পাবেনা। তখন খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মত সাহসী সাংবাদিকরা জীবন মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে লেখালেখি করেছেন, সাহস করে টেলিভিশনের টকশোতে সাহসীকতার সংঙ্গে সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে কখোনো পিছপা হননি। অনেক হুমকি-ধমকী খন্দকার মুনীরুজ্জামানকে তার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাদের সামনে অনেক হুমকি-ধমকী এসেছে। কিন্তু খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো লোকজন কখনো ভয় পেয়ে পিছনমুখী না হয়ে সত্যকেই সবার সামনে তুলে ধরেছেন।

সম্পর্কিত খবর

    দৈনিক সংবাদ পত্রিকা বর্তমানের মতো সকল সময় ছিল প্রগতিশীল লেখক-লেখিকাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আমার যখন বুঝার বয়স হয়, তখন থেকেই সংবাদ পত্রিকার সাথে আমার আত্মিক যোগাযোগ ঘটে। যেসময় শহরের হাতে গুনা কয়েকটা বাসায় পত্র-পত্রিকা রাখা হতো, সে সময় আমাদের বাসায়ও দুটি দৈনিক পত্রিকা রাখা হতো। তার মধ্যে একটি ছিল দৈনিক সংবাদ এর অন্যটি ছিল ইংরেজী পত্রিকা দৈনিক অবজারভার। আমি তখনই নিউজগুলো না পড়ে সংবাদের উপসম্পাদকীয় বিভাগের লেখা মন দিয়ে পড়তাম। আমি তখন সংবাদে প্রকাশিত গাছ-পাথরের লেখা, দরবারই জহুর, বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা এবং সন্তোষ গুপ্ত এবং রনেশ দাস গুপ্তের মতো অনেক বড় বড় লেখকের লেখা আমি মেট্রিক পাশ করার আগেই সংবাদ পত্রিকায় পড়েছি। তখন থেকেই সংবাদের মতো পত্রিকায় লেখার জন্য আমার মনে একটা সুপ্ত বাসনা ছিল। কিন্তু পথ খোঁজে পাচ্ছিলাম না কিভাবে সংবাদের উপসম্পাদকীয় বিভাগে লেখা ছাপাবার ব্যবস্থা করা যায়।

    একদিন হঠাৎ জানলাম আমার শহর হবিগঞ্জের এক পাড়ায় এক সাথে বড় হওয়া প্রাণের বাংলার সম্পাদক আবিদা নাসরিন কলি সংবাদ পত্রিকায় কাজ করে। তখন আমি আবিদা নাসরিন কলির সাথে যোগাযোগ করলে, সে আমাকে খন্দকার মুনীরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তখন থেকে উনার সাথে অর্থাৎ খন্দকার মুনীরুজ্জামানের সাথে আমার পরিচয়। যদিও কোনোদিন উনার সাথে আমার সামনা সামনি কোনো দিন কথা হয়নি। তবে প্রায়ই আলাপ হতো ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে অনেক সময় ব্যস্ততার জন্য হয়তো তিনি ফোনে খুব বেশি সময় দিতে পারতেন না। কিন্তু আমার লেখা ছাপাতেন।

    সংবাদের উপসম্পাদকীয় বিভাগে প্রকাশিত আমার প্রথম লেখার শিরোনাম এখন আমার মনে না থাকলেও, তবে একটা কথা মনে আছে। উনি আমার লেখার শিরোনামের উপরে একটা লাইন লেখতেন আর তা হলো “ঢাকার বাইরে থেকে”। প্রথম প্রথম মনে হতো আমার বসবাস হবিগঞ্জের মতো একটি ছোট্ট শহরে তাই বলেই হয়তো আমার লেখার শিরোনামের উপরে লেখা হতো “ঢাকার বাইরে থেকে”। পরে জেনেছিলাম আমার লেখা শিরোনামের উপরে ঢাকার বাইরে থেকে লিখে আমার লেখার গ্রহন যোগ্যতা পাঠকদের কাছে শতগুনে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। একথা আমি বুঝেছিলাম পাঠক/পাঠিকাদের কথাবার্তা থেকে। আবিদা নাসরিন কলি এক সময় আমাকে বলেছিল তুমি এখন সরাসরি মুনীর ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করবে, আমার সাথে আর যোগাযোগ করতে হবে না। তাতে মুনীর ভাইয়ের সাথে তোমার একটা সর্ম্পক হবে এবং তোমার হৃদ্যতাও বাড়বে।

    আগেই বলেছি খন্দকার মুনীরুজ্জামানের সাথে কোনোদিন আমার একান্তে বসে কথাবার্তা হয়নি। উনাকে কোনোদিন কোনো সভা কিংবা মিটিংয়ে আমি দেখিও নি। সব আলাপ হতো ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে। আজ আমদের খন্দকার মুনীরুজ্জামান ভাই নেই। ভাবতেই যেমন কেমন লাগে। মনপ্রাণ অন্তরআত্মা তার শুন্যতায় যেন কেঁদে উঠে। বুকের মধ্যে যেন কিসের একটা শুন্যতা বোধ হয়। উনারত এত তাড়াতাড়ি না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার বয়স হয়নি। উনিত আরো কমপক্ষে ১৫-২০ বছর বাঁচতে পারতেন। তিনি স্বাচ্ছন্দে আমাদেরকে সুন্দর সুন্দর লেখা যেমন উপহার দিতে পারতেন, তেমনি করে আমাদের সমাজ জীবনের সকল অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে নতুন কলম যোদ্ধাদের প্রেরনা দিয়ে সাহস যোগাতে পারতেন। কিন্তু পৃথিবী জুড়ে বিরাজ করা কোভিড-১৯ ভাইরাস আমাদের কাছ থেকে খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো অনেক সাহসী, বিরামহীন প্রগতিশীল লেখকদেরকে নিয়ে গেছে। যা আমাদের প্রগতিশীল মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিরাট ক্ষতির ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো লেখকরা জন্মগ্রহন করেন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তারা টাকা পয়সা ঘর-বাড়ীর জন্য লেখালেখি করেননি। কোনো বাধা কিংবা কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি তাদেরকে অর্থাৎ খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো প্রগতিশীল লেখদেরকে তাদের দায়িত্বশীল কর্ম থেকে হটাতে পারেনি। মুনীর ভাইদের মতো সাংবাদিকরা প্রগতিশীলতার পতাকাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে। এই শ্রেণীর লেখকরা অর্থাৎ খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো লোকরা হলেন এক দিকে দক্ষিনপন্থীদের চরম আতংক, আর অন্যদিকে দক্ষিণপন্থীরা কোনো সময়ই তার মতো প্রগতিশীল সাংবাদিকদের ভালো চোখে দেখতো না। দক্ষিণপন্থী স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির লোকজনরা সকল সময় খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো লোকদের অমঙ্গল কামনা করে যেত, দেশের যেসব প্রগতিশীল লেখক লেখিকারা প্রগতির মশাল বয়ে বেরিয়েছেন খন্দকার মুনীরুজ্জামান তাদের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যাক্তি সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে তিনি সংবাদ পত্রিকাকে তার সঠিক জায়গায় রাখার জন্য কখোনো সংবাদের প্রকাশ্যিত খবরের মানের ব্যাপারে কিংবা সংবাদ পত্রিকার প্রগতিশীলতার মান দন্ডের ক্ষেত্রে কোনো কালে কোনো সময় কোনো ধরনের আপসকামীতার আশ্রয় গ্রহন করেননি।

    আমাদের ছেড়ে বড়ো অসময়ে সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মতো একজন বড় মানের লেখক। তার মতো বিরাট হৃদয়ের অধিকারী একজন লোক পাওয়া আর সহজে হবে না। তিনি বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই খন্দকার মুনীরুজ্জামান কখোনো বামপন্থা থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি ছিলেন সত্য সুন্দরের সাধক। সততা ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান-প্রেম। তিনি বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন বলে আজীবন ছিলেন অসাম্পদায়িক একজন মানুষ।

    টকশোতে খন্দকার মুনীরুজ্জামানের কথার্বাতা শুনে মনে হতো এই লোকের হৃদপিণ্ড কি পিঠে থাকে। হৃদপিণ্ড যদি পিঠে না থাকে। তাহলে সাহস করে টিভিতে বসে কেউ সত্য সুন্দরের কথা এমন সুন্দর করে বলতে পারবে না। খন্দকার মুনীরুজ্জামানের অসম্পাপ্ত কাজকে তার ভাব শিষ্যরাই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার ভাব শিষ্যদের কখোনো সাহস হারালে চলবে না। তাদেরকে অর্থাৎ খন্দকার মুনীরুজ্জামানের ভাব শিষ্যদেরকে সাহস করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই হবে। তাদেরকে থামলে চলবে না।

    শেষে এই প্রার্থণা করি খন্দকার মুনীরুজ্জামানের পরিবার যেন তার কর্মকাণ্ডকে জাগ্রত রাখার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যান। উনার আত্মা যেন শান্তিতে থাকে ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাও করি।

    লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার (হবিগঞ্জ)।

    পূর্বপশ্চিম-এনই

    খন্দকার মুনীরুজ্জামান
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close