• মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৪ মাঘ ১৪২৮
  • ||

ষড়যন্ত্র রাষ্ট্রের সর্বনাশ করে যেমন ওয়ান ইলেভেন করেছিল

প্রকাশ:  ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:১২
পীর হাবিবুর রহমান

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর উৎসবকালে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এসেছে। এসেছে আমাদের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্জন ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির মহত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে তাঁর ডাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবময় বিজয় অর্জন। আগামীকাল বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে।

এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যে বর্ণাঢ্য আয়োজন করেছে সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীরামনাথ কোবিন্দ উপস্থিত থাকছেন। আমাদের দৃষ্টিনন্দন জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা অপরূপ সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। আমাদের মহাবিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে অসীম সাহসিকতায় দুর্গম পথে যাত্রা করেছিলেন। সেই সময়টায় তাঁর যাত্রাপথ কতটা কঠিন ও দুর্বোধ্য ছিল তা আজকে চিন্তাও করা যায় না।

সম্পর্কিত খবর

    কিন্তু তিনি তাঁর মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা জনগণের প্রতি অগাধ আস্থা রেখে লড়াইয়ের পথে সংগঠন করেছেন, হাজার হাজার নেতা-কর্মী তৈরি করেছেন। জীবনের ১৩টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। দুবার ফাঁসির মুখে গেছেন। তিনি তাঁর অঙ্গীকার থেকে, বিশ্বাস থেকে লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

    বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহানায়ক হিসেবে জাতীয়তাবাদী চেতনায় গোটা জাতিকে তিনি এক মোহনায় মিলিত করেছিলেন। স্বাধিকার স্বাধীনতার পথ বেয়ে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সুমহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একজন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশ্ববাসীর দুয়ারে দুয়ারে ছুটে গিয়ে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বমানবতাকে জাগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কথা বলেছেন।

    বিশ্বরাজনীতিতে সেই দুই সুপার পাওয়ারের লড়াইকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেদিন সমাজতান্ত্রিক চীন ও সৌদি আরবসহ কিছু দেশ যেমন একই পথ নেয় তেমনি বিশ্বমানবতাসহ কিছু রাষ্ট্র বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এখানে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ১ কোটি শরণার্থীকে ভারতবাসী আশ্রয় দিয়েছিল। অর্থ, অস্ত্র ও ট্রেনিং সহযোগিতা দিতে আমাদের বীর যোদ্ধাদের কার্পণ্য করেনি। এমনকি ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের মাতাল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ভারত আক্রমণ করে বসলে শ্রীমতী গান্ধীও পাল্টা যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথবাহিনী মিলে মিত্রবাহিনী একযোগে যুদ্ধ চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। আমাদের এ মহান বিজয়ের পেছনে হিমালয়ের উচ্চতায় থাকা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন তাঁর প্রতি বাংলাদেশ জাতির সব আবেগ, অনুভূতি, বিশ্বাস ও চেতনা ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল। পাকিস্তানে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তিনি বন্দী থাকলেও রণাঙ্গনে তিনিই ছিলেন সব অনুপ্রেরণা, শক্তি ও সাহসের উৎস। বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সেদিন সেনাবাহিনীর বীর বাঙালি অফিসাররা ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মাতৃভূমির স্বাধীনতায় সেদিন গরিবের সন্তানরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই আবেগ-অনুভূতি তাদের বীরত্বের গৌরব আজ আমাদের কাজে-কর্মে আবেগ-অনুভূতিতে সেভাবে নেই। সেদিন মা তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে কার্পণ্য করেননি। সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে রেখে তরুণ স্বামী যুদ্ধে চলে গেছে। শ্রমজীবী মানুষ দেশের এ যুদ্ধে শরিক হতে ভুল করেনি। পাক হানাদার বাহিনীর হাতে আমাদের আড়াই লাখ মা-বোন কী বর্বরভাবে দিনের পর দিন ধর্ষিতা হয়েছে আমরা কি তা চিন্তা করে দেখি? আমাদের তরুণরা মুখোমুখি যুদ্ধে কীভাবে জীবন দিয়েছে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য কি কল্পনায় আনতে পারি? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার শিকার অগণিত বাঙালির লাশের স্তূপ কতটা ভয়াবহ ছিল তা কি আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনা দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করি? ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে। জাতির মেধাবী সন্তানদের বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসরদের সহযোগিতায় ধরে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে কী নির্মমভাবে একে একে হত্যা করেছে! সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো কি আমাদের আবেগ-অনুভূতি চিন্তা-চেতনাজুড়ে আছে? হিমালয়সম নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর পর যেসব জাতীয় নেতা মহান মুুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালনা করেছিলেন তাদের অবদান কি আমরা স্মরণে রেখেছি? দেশের অভ্যন্তরে বা ভারতে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে বীর সন্তানরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, বীরত্বের গৌরব অর্জন করেছেন তাদের অবদান কি আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে দৃশ্যমান করি? সেসব বীর যোদ্ধার কতজনের নামে কতটা প্রতিষ্ঠান আমরা গত ৫০ বছরে করেছি এ হিসাব কি কখনো করেছি? মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাদের নামে আমরা সারা দেশে কতটা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছি? মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা থেকে প্রতিটি সেক্টর কমান্ডার থেকে কতজন বেসামরিক বীর যোদ্ধার নামে আমরা নামকরণ করেছি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর? বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা ১৩ বছর ক্ষমতায়। সুমহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারত্ব তিনি বহন করছেন। এ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা তাঁর কাছেই বেশি প্রত্যাশার। বাংলাদেশের বিজয়ের প্রাক্কালে ’৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে সপ্তম নৌবহর ভিয়েতনামের টনকিন উপসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাদের লক্ষ্য পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে সহযোগিতা করা। ১০ ডিসেম্বর নৌবহরের আটটি জাহাজ মালাক্কা প্রণালিতে একত্রিত হয়ে ১২ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরের দিকে যখন চলছে, তখন ভারতের আন্দামান নিকোবর কমিউনিক সেন্টারের রাডারে তা ধরা পড়ে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত সরকারকে জানালে তারা ২০টি যুদ্ধজাহাজসংবলিত আরও বৃহৎ নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রেরণ করে। শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের নির্দেশে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর লেজ গুটিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব কোণে এসে নোঙর করে। এভাবে আমেরিকা নৌ-কূটনীতিতে সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পরাজয়বরণ করে। আর আমরা সুমহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দুটি আসন ছাড়া সব আসনে যখন গোটা জাতি বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে নৌকা প্রার্থীদের বিজয়ী করেছে, সেখানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তলপিবাহক সাম্প্রদায়িক শক্তিকে এ দেশের একটি অংশ ভোট দিয়েছে। ভোটে পরাজিত হলেও মুক্তিযুদ্ধকালে তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়ে যায়। এ শক্তি ও তার বংশধররা এখনো পাকিস্তানের গান গায়। চরম ভারতবিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাবিদ্বেষী জিকির করে। এরা কখনো শোধরাবে না। এটাই বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি। আমাদের সব থেকে বড় ট্র্যাজেডি বাঙালি জাতির মহাবিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে এবং ইতিহাসের নির্মোহ সত্যকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলো উপড়ে ফেলা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত ফসল আমরা এখনো আর ফিরে পাইনি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের বর্ণাঢ্য রূপ বহু আগেই ধূসর হয়ে গেছে। আমাদের সমাজের মূল্যবোধগুলো, সামাজিক রীতিনীতিগুলো নির্বাসিত হয়ে গেছে। একে একে নষ্টদের হাতে সবকিছু চলে যেতে যেতে সমাজটা দিন দিন বসবাস-অনুপযোগী হতে বসেছে। অসৎ দুর্নীতিবাজ নীতিহীন অসভ্য বর্বরদের দাপট ও দম্ভ এবং তাদের কদর্য কুৎসিত কর্মকান্ড সমাজকে সইতে হচ্ছে। অন্যদিকে সৎ নীতিমান আদর্শিক মানুষেরা নিরীহ হতে হতে একেবারে বিদ্রƒপ বা উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছে। তদবিরবাজ চাঁদাবাজ ঘুষখোরদের মতো নির্লজ্জ বেহায়ারা সমাজে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করে। আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলে ইউপি নির্বাচন ঘিরে প্রান্তিকজুড়ে নৌকার পরাজয় ঘটলেও একদল তৃণমূল নেতার কোটি কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য হয়ে গেছে। মানুষের মুখে মুখে এদের কুৎসিত রূপ দৃশ্যমান। দলের কর্মীদের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই জনগণের কাছে তাদের মুখ থাকে কী করে? অর্থের নেশায় সারা দেশে একদল বেপরোয়া হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শ এরা লালন ও ধারণ করে না। রাজনৈতিক চরিত্র বলে এদের কিছু নেই। তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ডা. মুরাদ হাসান তার যৌনবিকৃত উন্মাদ দাম্ভিক বেপরোয়া কুৎসিত কদর্য কথাবার্তা ও আচরণে কার্যত বরখাস্ত হওয়ার পর অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ক্ষমতার দম্ভে এমন মুরাদ সারা দেশে অনেক। আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তাই আওয়ামী লীগে বেশি। যখন বিএনপি ছিল ক্ষমতায় তখন হাওয়া ভবন ঘিরে কী দাপটই না দেখিয়ে বেড়িয়েছে অনেকে। একেকটি রাজনৈতিক দল এদের কীভাবে এমপি-মন্ত্রী বানায়? কীভাবে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রের নেতৃত্বে বসায়? বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম তাঁর লেখায় এ নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দলের সবার আমলনামা থাকলে আরও অনেকের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। মুজিবকন্যার সততা, সাহস ও নেতৃত্বের ক্যারিশমার ওপর আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দল ক্ষমতায়। দেশজুড়ে উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞ দৃশ্যমান। কিন্তু সারা দেশে দলের একটি অংশ নিজেদের লোভ-লালসা ও সীমাহীন ক্ষমতার দম্ভে জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করছে। এমনটি হতে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে জাতিকেই পরাজিত হতে হয়, আহমদ ছফার এ কথাই সত্য।

    এ বিজয় দিবসের বর্ণাঢ্য উৎসবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এ শপথ অনুষ্ঠান জাতির পিতার রক্ত ছুঁয়ে, লাখো শহীদের রক্তের ওপর হাত রেখে সেই শপথ হোক, যে শপথ হোক অন্যায় অপরাধ করতে গেলে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে। কলিজা কেঁদে উঠবে। একটি মানুষ যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিশ্বাস করে সে কখনো লোভ-লালসায় অন্যের সম্পদের ওপর নজর দিতে পারে না। একটি মানুষ যদি আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শহীদের রক্তের প্রতি আবেগ-অনুভূতি ও মর্যাদা রাখে তাহলে নাগরিককে তার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। ঘুষ দুর্নীতি অনিয়ম অনাচার জুলুম নির্যাতনে বেপরোয়া হওয়া দূরে থাক লিপ্ত হওয়ারই প্রশ্ন আসে না। শপথলগ্নে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীলদেরও একই সঙ্গে শপথ নিতে হবে কীভাবে একেকজন ব্যাংকের টাকা লুট করে নিয়ে পার পায়। ব্যাংকের টাকা ফিরিয়ে না দিয়ে আইনের প্রশ্রয় পায়? ঋণখেলাপি হওয়ার পরও বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। কেবল রাজনীতিবিদই নয়, প্রশাসনসহ বিভিন্ন পেশার একদল মানুষ কীভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করে বিদেশে সম্পদ গড়ে দেশে দেশে কুৎসিত কদর্য বেগমপাড়া গড়ে তোলে? আজ এ বিজয়ের ৫০ বছরে এসে ফিরে তাকালে দেখি মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়নি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়নি। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন এখনো চলছে। এর কোনো সন্তোষজনক সমাধানে যেতে পারছে না বাংলাদেশ। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনা হবে সার্চ কমিটি হবে নতুন নির্বাচন কমিশন হবে কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হবে নাকি ঘুরেফিরে চেনামুখের আজ্ঞাবহ মেরুদন্ডহীন দাসদের নিয়ে আরেকটি কমিশন গঠন হবে? সরকারি দল হলেই, দলের পদ-পদবি পেলেই, জনপ্রতিনিধি হলেই একদল রাতারাতি কীভাবে অঢেল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে যায়? কীভাবে ব্যাংক-শিল্প কারখানার মালিক হয়? এসব পদ-পদবি পাওয়ার আগে তাদের কী ছিল, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান বলেই প্রশ্ন ওঠে। এ শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা যদি বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনৈতিক সমাজব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শপথ নিয়ে আপসহীন হয়ে লড়তে পারেন তাহলে এ হবে বড় প্রাপ্তি। আরেকটি বিজয়। এ দেশে ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বারবার হয়েছে। সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে গিয়ে অনেক সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়ে গেছে। দেশ-বিদেশের কুশীলবরা সেসব ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন। এতে সর্বনাশ হয়েছে রাষ্ট্রের। রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে দগদগে ক্ষত। ফের যেন ষড়যন্ত্রের আলামত পাওয়া যাচ্ছে। এখন বিশ্বায়নের রাজনীতিতে সুপার পাওয়ারের লড়াই নেই। বিশ্বমোড়লরা যেসব অজুহাতে বিভিন্ন দেশে হানা দিয়েছিল সেসব দেশে কোনো সুখকর পরিণতি দেখাতে পারেনি। মানুষ হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে কেবল। শক্তিক্ষয় অর্থক্ষয়ও ঘটেছে প্রচুর। সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দয়া করে কূটনৈতিক তৎপরতাটা বাড়াতে হবে। দেশের মানমর্যাদাটা সবার আগে। বড় বড় কথা অনেক হয়েছে। দেশের ইজ্জতের ওপর আঘাত এলে বুকে বাজে। দায়িত্বশীলদেরও সংবিধান, আইন, বিধিবিধানের মধ্যে চলতে হবে। কর্মকান্ডে আরও বিনয়ী হতে হবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, কোনো ষড়যন্ত্র কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। দেশের ইজ্জত গেলেও যারা উল্লাস করে তারা একবারও ভাবছে না ওয়ান-ইলেভেন শেষ পর্যন্ত কারও জন্য সুখকর হয়নি। এটি ছিল বিদেশি ষড়যন্ত্র। সর্বনাশটা হয়েছে দেশের। দেশের রাজনৈতিক সমস্যা থাকলে রাজনৈতিকভাবেই তার সমাধান খোঁজা উচিত, ষড়যন্ত্রের পথে নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কুফল রাষ্ট্রকে ভোগ করতে হয়। যা আমরা আর চাই না।

    লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close